শিক্ষাখাতের সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন ফ্রান্সের শিক্ষার্থীরা © সংগৃহীত
শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থী ও কর্মীদের নজিরবিহীন বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলমান এই আন্দোলনে আজ সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ দেখা গেছে। যেখানে শিক্ষার্থীরা শত শত স্কুল ব্লকেড করেন। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দেশটির মার্সেই, নঁত ও লিয়ঁসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। খবর আল জাজিরার
শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কারসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করছেন বিক্ষোভকারীরা। দেশটির উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, চলমান আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে প্রায় ২ হাজার স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই মার্সেই, নঁত ও লিয়ঁতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় তাদের হাতে বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। এর মধ্যে ছিল ‘তারা আসলে আমাদের নিয়ে চিন্তিত নয়’ এবং ‘বেঁচে থাকব নাকি পড়াশোনা করব’। অন্যদিকে স্ট্রাসবুর্গ, লিয়ঁ ও রেন শহরে বিক্ষোভগুলো একপর্যায়ে সহিংস হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় আগুন জ্বালানোর পাশাপাশি পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করেন।
দুই সপ্তাহ আগে প্যারিসের সুবিধাবঞ্চিত শহরতলির কয়েকটি এলাকায় শুরু হওয়া এ বিক্ষোভ ধীরে ধীরে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ফরাসি সরকার বলছে, আন্দোলনটি এখন অনেক জায়গায় নগর সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। এ কারণে কয়েকটি বিক্ষোভস্থলে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে সোমবার উত্তর ফ্রান্সে পুলিশের সঙ্গে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের সময় ১৫ বছর বয়সি এক কিশোর গুরুতর আহত হয়। ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘লা ভোয়া দ্য নর’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভের সময় ওই কিশোর একটি পুলিশ গ্রেনেড তুলে নেওয়ার পর বিস্ফোরণে তার একটি হাত ও বাহুর একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ফরাসি সরকার জানিয়েছে, ওই সংঘর্ষে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়েছিলেন। স্ট্রাসবুর্গে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সদ্য উচ্চবিদ্যালয় শেষ করা হুগো ভেটজেল বলেন, ‘যখন উত্তর আসে সহিংসতা দিয়ে, তখন এর অর্থ হলো গণতন্ত্র আর কাজ করছে না। অভিজাতদের সঙ্গে আমাদের মধ্যে অনেক বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।’
আল জাজিরার প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, বিক্ষোভে এখন আরও বিভিন্ন সংগঠন যুক্ত হচ্ছে। কৃষক ইউনিয়ন, জ্বালানি খাতের কর্মী ও শিক্ষক সংগঠনের সদস্যরাও শিক্ষার্থীদের সমর্থনে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। অভিভাবক ও শিক্ষকরা শুধু সন্তানদের সমর্থন করতেই বিক্ষোভে আসছেন না, তাদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন। বিক্ষোভে বহিরাগত ‘উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিদের’ প্রবেশ এবং পুলিশের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ নিয়েও তাদের আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে ফরাসি সরকার। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো পর্যালোচনা করতে মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে কম দক্ষ শিক্ষকদের পরিবর্তে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, দুপুরের খাবারের বিরতি বাড়ানো এবং স্কুলের দৈনিক সময়সূচিতে পরিবর্তনের বিষয় রয়েছে।
পুরোনো ও জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কারের বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছেন লেকর্নু। অক্টোবরের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে প্রস্তাব জমা দিতে মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তবে দ্রুত এসব দাবি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অধিকাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে ১ হাজার ৮০০ জনের বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা বা বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হবে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৮৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ২১৫ জন কিশোর আহত হয়েছে। আহত হয়েছেন ৭১৫ জন পুলিশ সদস্যও।