ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ © সংগৃহীত
শিক্ষা খাতের সংকটের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়া হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠেছে। শুক্রবার (২ অক্টোবর) দেশটির ৭৩৫টি স্কুল কোনো না কোনোভাবে বিক্ষোভে আক্রান্ত বা বিঘ্নিত হয়েছে। এদিন বিক্ষোভ ঘিরে ১ হাজার ৭৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ জানিয়েছেন, সোমবার থেকে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়েছে।
বিক্ষোভে শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থীপূর্ণ শ্রেণিকক্ষ, দীর্ঘ ক্লাসের সময়, অতিরিক্ত গরম শ্রেণিকক্ষ এবং জরাজীর্ণ স্কুল ভবনের মতো সমস্যাগুলো তুলে ধরছেন শিক্ষার্থীরা। রাজধানী প্যারিসের আশপাশে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে মঁপেলিয়ে, নঁত, মার্সেই, স্ট্রাসবুর্গ, রেন ও তোলুজসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও স্কুলের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও আগুন জ্বালানো ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
শুক্রবার ৩ হাজার ৭০০ স্কুলের মধ্যে ৭৩৫টি কোনো না কোনোভাবে বিক্ষোভের প্রভাবের মধ্যে ছিল বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জেফ্রে। আগের দিনের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ কম। তবে ১৫৮টি স্কুলের আশপাশে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ শুক্রবার রাতে টিএফ১ টেলিভিশনকে বলেন, ‘আমরা দাঙ্গা ও শহুরে সহিংসতার দিকে ধাবিত হচ্ছি এবং এটি বন্ধ করতে আমরা সব ধরনের মধ্যবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করছি।’
বিক্ষোভের সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশটির বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিনও। তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি এখন শুধু হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্দোলনের সময় পুলিশ, শিক্ষক, সাংবাদিক ও পথচারীদের লক্ষ্য করে হামলা এবং বিভিন্ন বস্তু ছোড়ার ঘটনাও ঘটেছে।
এদিকে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জেফ্রে অভিযোগ করেছেন, আন্দোলনটি অ-শিক্ষার্থীদের দ্বারা কব্জা করে নেওয়া হয়েছে। তিনি বিএফএমটিভিকে বলেন, ‘শিক্ষকরা জানিয়েছেন, আমার সামনে যারা ছিল, তারা আমার ছাত্রছাত্রী ছিল না।’
শুক্রবার উত্তর-পূর্ব ফ্রান্সের বেলফোর্ট শহরে বিক্ষোভের সময় এক পুলিশ কর্মকর্তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ভিডিওতে একদল তরুণকে ওই কর্মকর্তাকে ধাওয়া করে মাটিতে ফেলে মারধর করতে দেখা গেছে। পুলিশ কর্মকর্তাকে লাথি ও ঘুষি মারার ওই ঘটনায় ১৭ বছর বয়সী এক তরুণকে হত্যাচেষ্টার সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিক্ষোভে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অন্তত ৬৫ জন কর্মী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪০ জন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। একই সময়ে প্রায় ১৭০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছে বলে সরকারি তথ্য জানিয়েছে।
প্যারিসের শহরতলি পান্তিনে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়লে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে পুলিশ সেখানে হস্তক্ষেপ করে। স্ট্রাসবুর্গ, ব্রেস্ট ও তোলুজেও পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে। রেন ও প্যারিসে আবর্জনার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশ বিক্ষোভকারীদের কাছ থেকে পেট্রোল বোমা, কুঠার ও শক্তিশালী আতশবাজি উদ্ধারের কথা জানিয়েছে। বিভিন্ন স্কুলের প্রবেশপথ, গেট ও বেষ্টনীতে হামলার কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথাও জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
আঞ্চলিক সরকারের তথ্য অনুযায়ী, নঁতের নেলসন ম্যান্ডেলা হাইস্কুলে ২০ লাখ ইউরোর বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডে স্কুলটির কাচের প্রবেশপথ ও ভেতরের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদের স্কুলের সময়সূচি অনেক দীর্ঘ। শ্রেণিকক্ষগুলো অনেক সময় অতিরিক্ত গরম থাকে। এ ছাড়া শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মীর ঘাটতির কারণে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষায় বরাদ্দ অর্থের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন বাজেট কমানোর পরিকল্পনাও তাদের ক্ষুব্ধ করেছে।
১৬ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী লোলা এএফপিকে বলেন, ‘আমাদের দিক থেকে আমরা জিতে গেছি—আজ সকালে আমাদের স্কুল বন্ধ রয়েছে।’
পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে সে আরও বলে, ‘এতে আমাদের ক্ষোভ আরও বাড়ছে—আমাদের মারধর করার বা আমাদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করার কোনো অধিকার পুলিশের নেই।’
তবে আন্দোলনকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। দেশটির সরকার বলছে, শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানোর অধিকার থাকলেও স্কুল, পুলিশ বা অন্যদের ওপর হামলা ও ভাঙচুর গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার আন্দোলনের সহিংস অংশের পেছনে উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীর ভূমিকার অভিযোগ তুলেছে। তবে সংশ্লিষ্ট বামপন্থী দল ও নেতারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অভিভাবকরাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। দক্ষিণ প্যারিসের ক্লদ মনে স্কুলের সামনে ৫৩ বছর বয়সী আনিয়া তার ছেলেকে খুঁজছিলেন। তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আমরা তাকে এখানে আসতে নিষেধ করেছিলাম। আশা করি সে এখানে নেই, তবে সে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।’
বিক্ষোভে সন্তানদের কারণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য অভিভাবকদের দায়ী করার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন বিচারমন্ত্রী দারমানিন। তিনি সরকারি কৌঁসুলিদের ক্ষয়ক্ষতির অর্থ অভিভাবকদের কাছ থেকে আদায়ের বিষয়টি বিবেচনা করতে বলেছেন।
এদিকে ফ্রান্সের কয়েকটি শ্রমিক ও শিক্ষা খাতের ইউনিয়ন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তারা শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে আগামী মঙ্গলবার নতুন কর্মসূচির আহ্বান জানিয়েছে।
সলিডেয়ারস ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমাদের সন্তানদের ওপর গুলি চালাতে দেওয়া যাবে না।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমাবেশ, সংগঠন ও বিক্ষোভ করার স্বাধীনতা রয়েছে।’
আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এই আন্দোলন ফ্রান্সের সরকারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। একই সময়ে শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দ, শিক্ষক সংকট ও স্কুলের অবকাঠামো নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে।