ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা

মোবাইল ফোনের বাংলা অর্থ কী

মোবাইল ফোনের বাংলা অর্থ কী
প্রতীকী ছবি ও লেখক  © টিডিসি ফটো

কলকাতার এক অধ্যাপক Mobile phone-এর বাংলা লিখেছেন ‘চলদ্ভাষ’। জানি না, এটা সেখানকার বহুমান্য পরিভাষা কিনা! তবে, শব্দটি জোরে উচ্চারণ করা মাত্র এই সেদিন আমার পাশের ভদ্রলোক তড়িতাহতের মতো চমকে উঠে বলেছিলেন: ‘কী!’ আমি আর দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করিনি।

বেশি কড়া পাকের ভাজাপোড়া খেলে পেটে যেমন সহ্য হয় না, কড়াশব্দ বাংলা ভাষাও ঠিকঠাক নেয় না, বেশি কড়াতো নয়ই। এটাই বাংলা ভাষার বৈশিষ্ট্য। এর আগে Telephone শব্দের বাংলা করার চেষ্টা হয়েছে। বাংলাদেশে দেখেছি ‘দূরালাপনী’ লিখেছেন অনেকে, পশ্চিমবঙ্গে ‘দূরভাষ’। লিখেছেন বটে কিন্তু কাউকে বলতে শুনিনি। আপনি শুনেছেন কিনা জানি না। শেষে ওটা ‘ফোন’ হয়েই রইল।

Mobile phone যখন এলো তখন বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গ দু-জায়গাতেই এর বাংলা পরিভাষা খোঁজার চেষ্টা করেছেন শব্দতৃষ্ণার্ত বাঙালিরা। এঁদের মধ্যে সাহিত্যিক আর অধ্যাপকগণ ছিলেন এগিয়ে। তাঁরা যে যাঁর মতো শব্দ তৈরি করেছেন; নিজের লেখাতে লিখেওছেন। কিন্তু পরিভাষার জন্য বড়ো যে প্রয়োজনটি তাহলো, এটি শুধু সৃষ্টি করলে হয় না, জনপ্রিয়ও করতে হয়। আর জনপ্রিয়তার জন্য চাই বহুল ব্যবহার। একার পক্ষে সেটা সম্ভবপর নয়। ব্যক্তি সাহিত্যিক আর অধ্যাপকদের বাইরে যাদের পরিভাষা সৃষ্টি করা দরকার এবং কর্তব্য, তারা সেটি করেনি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান। দু-জায়গাতেই বাংলা নিয়ে গবেষণা করার সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে। সেগুলো যথারীতি থাকে এবং আছে চোখ বুজে।

Mobile phone-এর বাংলা ‘চলভাষ’ হতে দেখেছি। কিন্তু সেটিও চলেনি। নতুন শব্দ প্রচলনের জন্য যে অভিভাবকত্ব করা প্রয়োজন, তেমন অভিভাবকও বাঙালির নেই। কবি নির্মলেন্দু গুণতো সবসময়ই সমকালীন বিষয়কে তরুণের মতো গ্রহণ করেন! তিনি সেসময় পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে লেখেন ‘মুঠোফোনের কাব্য’। খুব জনপ্রিয় হয় ছোটো ছোটো কবিতাগুলো। বিষয় থাকে প্রেম, পাওয়া না-পাওয়া, হতাশা, দ্রোহ, ক্ষোভ--- এই আর কী! একটি কবিতা তুলে দিই: ‘পাগলামো ইচ্ছার গতি কি? / বেনো জলে ভেসে গেলে ক্ষতি কি?’ কবিতাটি শেষ। কিন্তু অশেষ তার ব্যঞ্জনা। কবিতাগুলোর সাথে সাথে ‘মুঠোফোন’ কথাটিও বেশ জনপ্রিয় হয় তখন থেকেই। জনপ্রিয় হওয়ার কারণ, এর ধ্বনিসাম্য-- বলতে জিহ্বার কসরত লাগে না, অল্পপ্রাণ থেকে মহাপ্রাণে যেতে হয় না। আর শব্দ দুটোও অতি পরিচিত এবং চিত্রময়। হ্যাঁ, ‘ফোন’ বিদেশি শব্দ। বিদেশি হলেও সেটি গ্রিক। আর গ্রিক শব্দ সারা পৃথিবীর ভাষাই নানাভাবে আত্তীকরণ করেছে। ফলে, Mobile phone-এর চমৎকার বাংলা পরিভাষা হয়ে উঠেছে ‘মুঠোফোন’। ‘মুঠোফোন’ কথাটি শুধু লেখাতে ব্যবহার নয়, অনেককে বলতেও শুনেছি, শুনিও। তবে ঠিক, সর্বব্যাপকতা পায়নি শব্দটি। বাংলাদেশে কথ্যভাষায় এখনও ‘মোবাইলে ফোন দিও’ (‘ফোন কোরো’ নয়), ‘মোবাইল কোরো’ ইত্যাদির প্রচলনই বেশি। পশ্চিমবঙ্গে কী, জানি না।

Mobile phone-এর বাংলা হিসেবে ‘মুঠোফোন’ চৌকশ (‘smart’ লিখলাম না) পরিভাষা। আশাকরি, চৌকশ বাঙালিরাতো বটেই, অন্যরাও এটাই লিখবেন আর বলবেনও। জনান্তিকে বলে রাখি, শব্দটি কিন্তু ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’ গ্রহণ করেছে।

লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য

এ বিভাগের আরো সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ