করোনায় ফুসফুসে প্রদাহ থেকে দেহে প্রাণঘাতী রক্ত জমাটের সম্ভাবনা

২৪ এপ্রিল ২০২০, ০৫:৪৭ PM

© টিডিসি ফটো

যখন কেউ কোভিড-১৯ (নভেল করোনাভাইরাস) আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি/ কাশি/থুতুর মাধ্যমে সার্স-কোভ-২ ভাইরাস সমৃদ্ধ তরল ড্রপলেট নির্গত করে, অনাক্রান্ত ব্যক্তিরা তা শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করে বা কোন পৃষ্টের উপরে থাকা ভাইরাস যুক্ত শুস্ক/আদ্র ড্রপলেটগুলো হাতের মাধ্যমে স্পর্শ করে মুখমন্ডলে পরিবাহিত করে। এইভাবে ভাইরাস নাকে ও গলায় প্রবেশ করে। যুক্তরাজ্যের ওয়েলকাম স্যাঙ্গার ইন্সটিউটের বিজ্ঞানীদের গবেষণা প্রকাশনার প্রিপ্রিন্ট অনুযায়ী, কোভিড-১৯ রোগের ভাইরাস নাকের অভ্যন্তরের আবরণে বসবাসের আদৃত জায়গা খুঁজে পায়।

যুক্তরাজ্যের ওয়েলকাম স্যাঙ্গার ইন্সটিউটের বিজ্ঞানীদের মতে, নাকের অভ্যন্তরের আবরণের কোষগুলো এনজিওটেনসিন-কনভার্টিং এনজাইম ২/এসিই২ নামক এক ধরণের সেল-সারফেস রিসেপটর দ্বারা সমৃদ্ধ। এসিই২ রিসেপটর, কোষগুলোকে সুরক্ষিত না রেখে সংক্রমণ সূচিত করে কারণ ভাইরাস কোষে প্রবেশ করতে এই রিসেপটরের সাথে যুক্ত হয় (সূত্রঃ যুক্তরাস্ট্রের বিজ্ঞান ভিত্তিক ওয়েব সাইট "সায়েন্স")। ১ এপ্রিল, ২০২০ তারিখের ন্যাচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ অনুযায়ী, ২০০২-২০০৩ সালের মহামারির জন্য দায়ী সার্স-কোভ-১ ভাইরাস মানুষের গলায় সংক্রমণ না করলেও, নভেল সার্স-কোভ-২ ভাইরাস গলার কোষের এনজিওটেনসিন-কনভার্টিং এনজাইম ২ (এসিই২) রিসেপটর ব্যবহার করে কোষে প্রবেশের মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটায়। ভাইরাস কোষে প্রবেশ করেই, তাদের অসংখ্য কপি তৈরি করে এবং নতুন কোষগুলোকে আক্রমণ করে ।

যদি দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রাথমিক অবস্থায় নভেল করোনাভাইরাসকে (SARS-CoV-2) প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়, তখন ভাইরাস বলিষ্ঠভাবে ফুসফুসকে আক্রমণ করতে শ্বাসনালী দিয়ে নিম্নমুখে অগ্রসর হয়। ভাইরাস ফুসফুসের বায়ুথলিগুলোর বাহিরের আবরণে এক স্তরের "এপিথেলিয়াল কোষে" সমৃদ্ধ এনজিওটেনসিন-কনভার্টিং এনজাইম ২ (এসিই২) রিসেপটরে নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়ে ফুসফুস আক্রমণ করে (তথ্য সূত্রঃ ২০২০ তারিখের ন্যাচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ)। ভাইরাস প্রবেশের পর ফুসফুসের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দূর্বল করে কোষগুলোকে তীব্রভাবে আক্রমণ করে। শ্বাসনালির শাখা-প্রশাখা নিয়েই গড়ে ওঠে ফুসফুস। ফুসফুসের শাখা-প্রশাখার সর্বশেষ বিভাজন থেকে তৈরি হয় ক্ষুদ্র বায়ুথলিগুলো, যাকে এলভিওলি (alveoli) বলা হয়।

বায়ুথলি পাতলা আবরণ দ্বারা আবৃত এবং প্রতিটি বায়ুথলি সরু রক্তের কৈশিক নালিকা (capillaries) দ্বারা পরিবেষ্টিত। বায়ুথলি ও রক্তের কৈশিক নালিকার গাত্র এত পাতলা যে এর ভেতর দিয়ে গ্যাসীয় আদান-প্রদান ঘটে। সাধারণত, অক্সিজেন নাসাপথ (নাক) দিয়ে বায়ুথলিগুলোর মাধ্যমে রক্তের কৈশিক নালিকায় যায়; তারপর অক্সিজেন সমস্ত দেহে পৌঁছায়। দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসের সাথে লড়াই করার ফলে, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে অক্সিজেন পরিবহন বাধাগ্রস্থ হয়। ফুসফুস করোনাভাইরাস দ্বারা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হওয়ার সময় দেহের শ্বেত রক্ত কণিকা (white blood cells) কেমোকাইন (Chemokine) নামক জৈব পদার্থকে উন্মুক্ত করে (সূত্রঃ যুক্তরাস্ট্রের বিজ্ঞান ভিত্তিক ওয়েব সাইট "সায়েন্স")। কেমোকাইন হচ্ছে সিগন্যালিং প্রোটিন যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ও ক্ষতের নিরাময়ে বিভিন্ন ধরণের কোষ থেকে নিঃসৃত হয়।

নতুন কেমোকাইন আরোও অধিক পরিমানে দেহের রোগ প্রতিরোধী কোষকে জড়ো করে যা ভাইরাস আক্রান্ত ফুসফুসের কোষগুলোকে মেরে ফেলে (তথ্য সূত্রঃ যুক্তরাস্ট্রের বিজ্ঞান ভিত্তিক ওয়েব সাইট "সায়েন্স")। এ কারণে সৃষ্ট তরল ও মৃত কোষগুলি পুঁজে পরিণত হয়। এটি হচ্ছে কোভিড-১৯ রোগের ফলে নিউমোনিয়া (ফুসফুসে প্রদাহ)। মাঝে মাঝে, আক্রান্তদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া হঠাৎ করেই অধিকতর খারাপ পর্যায়ে যায়, যাকে বলা হয় অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম (এআরডিএস)।

নিউমোনিয়ার মারাত্মক পর্যায়ে ভাইরাসের তীব্র সংক্রমণের কারণে ফুসফুসের বায়ুথলিগুলো শ্লেষ্মা, রক্তের শ্বেত কণিকা, তরল পদার্থ ও ফুসফুসের ধ্বংসপ্রাপ্ত কোষের রাবিশ দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায়। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায় এবং চরম শ্বাসকষ্ট হয়। এক্সরে এবং কম্পিউটেড টমোগ্রাফি স্ক্যানে দুটি কালো ফুসফুসেই সমভাবে, ছড়ানো ছিটানো বিভিন্ন আকারের সাদা সাদা দাগ দেখা যায়। এই ধরনের মারাত্মক ক্ষেত্রে, ভাইরাস কোভিড-১৯ রোগীর ফুসফুস অকেজো করে দেয়। এই ধরণের ক্রিটিকাল সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য রোগীকে হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে যান্ত্রিক ভেন্টিলেটর দেওয়া হয়। ভেন্টিলেটর চাপ দিয়ে ফুসফুসে অক্সিজেন প্রবেশ করানোর মাধ্যমে দেহে অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়। এই জটিল অবস্থায় অনেক কোভিড-১৯ রোগী মারা যায়।

সাম্প্রতিক ১০ এপ্রিল ২০২০ তারিখের 'থ্রম্বোসিস রিসার্চ' জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধ অনুযায়ী, ডাচ ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ১৮৪ জন নিশ্চিত নিউমোনিয়াসহ কোভিড-১৯ রোগীর মধ্যে ৩১% রোগীর রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাঁধার (thrombosis) রিপোর্ট পাওয়া গেছে (তথ্য সূত্রঃ যুক্তরাস্ট্রের বিজ্ঞান ভিত্তিক ওয়েব সাইট "সায়েন্স") । দেহের অন্য জায়গার রক্ত জমাটগুলো ফুসফুসের মূল ধমনিগুলোতে (রক্তনালী) জমা হয়ে ধমনিগুলো ব্লক করে; যাকে পালমোনারি এমবোলিজম (Pulmonary embolism) বলা হয়। পালমোনারি এমবোলিজম এর সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হচ্ছে তীব্র শ্বাসকষ্ট (তথ্য সূত্রঃ যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিষয়ক ওয়েব সাইট "হেলথলাইন")।

স্পেনের হাসপাতালে অনেক কোভিড-১৯ রোগীর দেহে জমাট রক্ত (ব্লাড ক্লট) পাওয়া গেছে ((তথ্য সূত্রঃ যুক্তরাষ্ট্রের নিউজ সাইট এবিসি সেভেন)। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টারের কার্ডিওভাসকুলার মেডিসিন ফেলো বেহনুড বিকডেলি বলেন, অনেক কোভিড-১৯ রোগীর দেহে উচ্চ মাত্রায় ব্লাড ক্লটের (রক্ত জমাট) উপজাত ডি-ডাইমার (D-dimer) পাওয়া গেছে। প্রাণঘাতীকর হচ্ছে কারণ ব্লাডক্লটগুলো ফুসফুসের রক্তনালী ও হৃদপিন্ডে ঘটছে (তথ্য সূত্রঃ যুক্তরাস্ট্রের বিজ্ঞান ভিত্তিক ওয়েব সাইট "সায়েন্স" ও যুক্তরাষ্ট্রের নিউজ সাইট এবিসি সেভেন)।

ফুসফুসে নভেল করোনাভাইরাস আক্রমণের পর দেহের শ্বেত রক্ত কণিকা "কেমোকাইন" নামক সিগন্যালিং প্রোটিনের সংখ্যা বাড়াতে থাকে (তথ্য সূত্রঃ যুক্তরাস্ট্রের বিজ্ঞান ভিত্তিক ওয়েব সাইট "সায়েন্স")। কেমোকাইন আরোও অধিক পরিমানে রোগ প্রতিরোধী কোষকে জড়ো করে যা ভাইরাস আক্রান্ত ফুসফুসের কোষগুলোকে মেরে ফেলে। ফলে ফুসফুসের আরো ক্ষতি হয়।

কেমোকাইনিন মানবদেহে রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা পালন ছাড়াও, ক্ষতের সময় হেমোস্ট্যাসিস (Hemostasis) পর্যায়ে রক্ত জমাটে (ব্লাড ক্লট) গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে (তথ্য সূত্রঃ ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ মোলিকুলার সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধ)। নিউইয়র্কের আপস্টেট মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ও ক্রাউস হেলথের ফুসফুস জটিল রোগ বিশেষজ্ঞ ড. ভিরেন কাউর বলেন, ভাইরাস কোভিড-১৯ রোগীর ফুসফুসে চাপ ও মারাত্মক প্রদাহের সৃষ্টি করে-- যা রোগীর দেহে রক্ত জমাটে (ব্লাড ক্লট) প্ররোচিত করে (তথ্য সূত্রঃ যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম এবিসি নিউজ)। চিকিৎসকগণ সকল কোভিড রোগীকে রক্ত জমাট আক্রমণ এড়াইবার জন্য চিকিৎসা হিসেবে উচ্চমাত্রার ড্রাগ (high-prophylactic doses) সুপারিশ করেছেন (তথ্য সূত্রঃ যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান ভিত্তিক ওয়েব সাইট "সায়েন্স")।

লেখক: প্রফেসর, ক্রপ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
মেইল: drmaasgar@gmail.com 

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যাশনাল ইয়াং হেলথ কনফারেন্…
  • ১১ মে ২০২৬
ঋতুপর্ণার বাড়ি নির্মাণে জট খোলার উদ্যোগ ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর
  • ১১ মে ২০২৬
ওসমান হাদি হত্যার বিচার না হওয়া মানে জুলাইয়ের পরাজয়: মাসুমা…
  • ১১ মে ২০২৬
শেষ দিনের রোমাঞ্চের অপেক্ষায় ঢাকা টেস্ট
  • ১১ মে ২০২৬
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীদের গোপনে ছবি তোলার অভিযোগে যুবক আটক
  • ১১ মে ২০২৬
যখন-তখন ওষুধের দাম বাড়িয়ে সরকার ও জনগণকে বিপদে ফেলা যাবে না
  • ১১ মে ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SUMMER 2026
Application Deadline Wednesday, May 13, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9