মতামত

‘না’ ভোট দেয়া ২ কোটি ২৫ লাখ নাগরিকের চাওয়া আসলে কী

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৪৯ AM
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি © ফাইল ফটো

বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) আয়োজিত গণভোটে সংস্কারমূলক দাবির পক্ষে ‘হ্যাঁ’ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি। বিপরীতে ‘না’ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি। এই সংখ্যা কমপক্ষে ২০০ নির্বাচিত সংসদ সদস্য বা এমপির প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে কম নয়। সংখ্যার বিচারে ‘হ্যাঁ’দ্বিগুণ ব্যবধানে জয়ী হয়েছে। কিন্তু সোয়া দুই কোটির বেশি নাগরিকের ‘না’ভোটকে কি শুধু পরাজিত মত হিসেবে দেখলেই যথেষ্ট হবে? এই ‘না’গোটা দেশের বড় একটি অংশের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক মনোভাবের প্রকাশ নয় কী?

গণভোটে ‘না’ভোট সবসময় পরিবর্তনের বিরোধিতা করে না। বরং এটি প্রায়শই তিনটি প্রধান মানসিক প্রবণতার প্রতিফলন।

প্রথমত, স্থিতিশীলতার পক্ষে মানসিকতা। দেশের একটি অংশ মনে করে-বিদ্যমান আইন ও কাঠামোই যথেষ্ট; সমস্যা থাকলে তা প্রয়োগে, কাঠামোয় নয়। পরিবর্তন মানেই অনিশ্চয়তা-এই মনস্তত্ত্ব থেকে তারা ‘না’বেছে নিতে পারেন। তাদের কাছে ‘না’হলো ঝুঁকি এড়ানোর কৌশল।

দ্বিতীয়ত, সতর্ক সম্মতি বা সংশয়। অনেক নাগরিক সংস্কারের ধারণাকে নীতিগতভাবে সমর্থন করলেও প্রস্তাবিত পদ্ধতি, সময় বা বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে সন্দেহ থাকতে পারে। এমন বিশ্লেষণে ‘না’মানে পুরো ধারণা প্রত্যাখ্যান নয়; বরং বার্তা হতে পারে- ‘এভাবে নয়’,‘আরও স্পষ্টতা চাই’, ‘বিকল্প প্রস্তাব দরকার।’

গণভোট সবসময় শুধু একটি নীতি বা প্রস্তাবের পক্ষে–বিপক্ষে মত নয়। অনেক সময় মানুষ প্রস্তাবটি কে এনেছে, কীভাবে এনেছে, বা পুরো প্রক্রিয়ার ওপর তাদের আস্থা আছে কি না-সেটিও বিবেচনায় নেয়। তাই ‘না’ ভোট কখনও শুধু প্রস্তাবের বিরোধিতা নয়; এটি প্রক্রিয়া বা নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষের প্রকাশও হতে পারে।

এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে-‘না’ ভোটাররা কি শুধু ‘হ্যাঁ’কে হারানোর জন্য ভোট দিয়েছেন?

বাস্তবতায় অধিকাংশ ভোটার কৌশলগত কারণে ভোট দেন না। তারা সাধারণত নিজেদের বিশ্বাস, অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা থেকে সিদ্ধান্ত নেন। কেউ মনে করেন প্রস্তাবটি এখন দরকার নেই, কেউ ভাবেন আরও পরিষ্কার ব্যাখ্যা দরকার, কেউ আবার মনে করেন আগে বিদ্যমান আইন সঠিকভাবে প্রয়োগ হোক। অর্থাৎ ‘না’ ভোট অনেক ক্ষেত্রে একটি চিন্তাপ্রসূত অবস্থান।

এই নির্বাচনে একটি লক্ষণীয় বিষয় ছিল- কয়েকটি আসনে দেখা গেছে যেখানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী জয়ী হয়েছেন, সেখানে গণভোটে ‘না’ বিপুল ভোটে এগিয়ে ছিল। এই ফলাফল ইঙ্গিত দিতে পারে যে ওইসব এলাকায় ভোটাররা প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে একটি রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন এবং একই সঙ্গে গণভোটের প্রশ্নে ভিন্নমতও প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ প্রার্থী নির্বাচন ও গণভোট- দুই ক্ষেত্রেই তারা আলাদা আলাদা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এটি দেখায়, ভোটাররা একমাত্রিক নন। তারা একই সঙ্গে দুই ব্যালটে দুই ধরনের বার্তা দিতে পারেন-একটি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে, আরেকটি নীতিগত বা প্রক্রিয়াগত প্রশ্নে।

তাই ‘না’ভোটকে কেবল বাধা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। অনেক সময় এটি একটি জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ- যেখানে সমর্থন, সংশয় এবং বার্তা- সবকিছু মিলেমিশে থাকে।

গণভোটে জাতীয় পর্যায়ের মোট ফল প্রকাশিত হলেও আসনভিত্তিক ফল প্রকাশ না হওয়ায় স্থানীয় মনস্তত্ত্ব বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথায় ‘না’ শক্তিশালী? কোন সামাজিক বা আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে এই ভোট বেশি? এসব প্রশ্ন কেবল রাজনৈতিক নয়; এগুলো সামাজিক গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্ব পাবে। গণতন্ত্রে আস্থা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে তথ্যের উন্মুক্ততা অপরিহার্য।

সবচেয়ে বড় কথা, ‘না’ ভোট গণতন্ত্র বিকাশের জন্য হুমকি নয়; বরং নির্ভয়ে ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা। গণতন্ত্রের শক্তি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নয়, সংখ্যালঘু মতের মর্যাদা নিশ্চিতের ওপর লুকিয়ে থাকে। দুই কোটির বেশি নাগরিকের এই অবস্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- সমাজ একরৈখিক নয়। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে কিন্তু ‘না’ একটি প্রশ্ন রেখে গেছে। সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার লক্ষণ।

লেখক: সাংবাদিক

জবি ছাত্রদল কর্তৃক হল সংসদ নেত্রীকে ‘হেনস্তার’ ঘটনায় নিন্দা…
  • ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
‘না’ ভোট দেয়া ২ কোটি ২৫ লাখ নাগরিকের চাওয়া আসলে কী
  • ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নোবিপ্রবি ভিসির বিরুদ্ধে নিয়োগে দুর্নীতি–অনিয়মের অভিযোগ বিএ…
  • ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রমজানে ঢাবিতে খাদ্যের মান বাড়িয়ে মূল্য হ্রাসের দাবি ছাত্রদল…
  • ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের জন্য একটি কালো দিন আজ: সাদিক কায়েম
  • ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ইফতারি নিয়ে ফেরার পথে প্রাণ গেল এক যুবকের, আহত আরও ১
  • ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬