তিতাসের পাড়ে একদিন © টিডিসি ফটো
মানুষের জীবনের মতো নদীর স্রোতও প্রবহমান। সেই আদিকাল থেকেই নদীর সাথে মানবসভ্যতার ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিলো অধিকাংশ সভ্যতা। ‘জীবন গাঙে নাও ভাসাইয়াছে যে একবার, ফিরিয়া আসিবার পথ তাহার থাকে নাকো আর’— গ্রামের মানুষেরা জীবন নিয়ে তাদের ফিলোসোফিকে এভাবেই প্রতিফলিত করেছে।
আজকে বলছি এমন এক নদীর কথা যেটি সারাজীবন ধরে মানুষ ও প্রকৃতির জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে। স্নিগ্ধ নারীর মতো শান্ত সেই নদীর নাম — তিতাস। বাংলা সাহিত্যে অনেকেই বলে থাকেন এটি অদ্বৈত মল্লবর্মণের নদী। তবে একটি রিভার্সিবল কথা হচ্ছে এই নদীকে নিয়ে উপন্যাস লিখেই বাংলা সাহিত্যে নিজের নামকে অমর করেছেন এই কবি। তিতাসের গুণেই গুণান্বিত হয়েছেন তিনি।
’তিতাস একটি নদীর নাম’ — এই নামেই একটি উপন্যাস লিখেছিলেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। এই উপন্যাসটি সর্বপ্রথম ’মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে এই উপন্যাসের উপর বেইজ করে বাংলা ভাষায় ফিল্মও তৈরি করা হয়েছে।
আমরা গিয়েছিলাম সেদিন এই তিতাসের পাড়ে। বহুক্ষণ হেঁটেছি এর তীর ধরে। দেখেছি নদীর পাড়ের মানুষের জীবন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করছে, সারাদিন কাজ করা ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে শ্রমিকরা আপন লয়ে নিজেকে ছেড়ে দিচ্ছে নদীতে, গ্রামের সহজ-সরল বউটি তিতাসের প্রবহমান জলে গা-ধুয়ে কাঁকে করে কলসিতে পানি নিচ্ছে।
সুজন গল্প করছিলো তিতাসের ভরা যৌবন নিয়ে। একটা সময় ছিলো যখন প্রবল উদ্দমতায় বয়ে চলতো এই নদীটি কিন্তু অবহেলা আর অনাদরের ফলে এটি হারিয়েছে তার গৌরবমণ্ডিত ঐতিহ্য।
তবে এত এত খ্যাতি থাকা সত্ত্বেও নদীটি আজ মরতে বসেছে। আমরা দেখলাম নদীর পাড়ে বানানো হচ্ছে ময়লার ভাগাড়, নিঃসরণ করা হচ্ছে কারখানার বর্জ্য পদার্থ, বাতাসের সাথে দুর্গন্ধ মিশে যেন প্রাণহীন এক দেহে পরিণত হচ্ছে। প্রাণ না থাকলে মানুষের দেহ যেভাবে পচে যায়, তেমনি এই নদীটিও হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির এক অতল গহ্বরে।
এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে কত-শত জীবন; অথচ বুক ভরে ভালোবাসা তারাই দিয়ে গেছে জনম জনম ধরে। বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ, কিন্তু সেই নদীগুলোই আজ বিলীন হয়ে যাচ্ছে মানুষের স্বার্থের কারণে।
মানবজীবন আর নদী পরস্পর পরিপূরক। শুধু নদীকে রক্ষা করতে না পারার কারণেই হারিয়ে গেছে সিন্ধু’র মতো সমৃদ্ধ কত সভ্যতা। নদীগুলো যদি এভাবেই ক্রমাগত ধ্বংস হতে থাকে তাহলে মানবসভ্যতাও হয়তো একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। কোলাপস করবে বর্তমান যুগের অনেক দাপুটে জাতির শৌর্য।
‘দিয়াছিনু মোর সমস্ত উজাড় করে, তব স্বার্থ করিতে হাসিল মোরে মারিলে অকালে’— হয়তো এভাবে আর্তনাদ করছে তিতাস।