গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ © সংগৃহীত ও সম্পাদিত
চরম আবাসন সংকটে ভুগছেন গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। গণরুমে থাকতে হচ্ছে ঠাসাঠাসি করে। এরই মধ্যে নষ্ট বেশিরভাগ কক্ষের বৈদ্যুতিক ফ্যান। চরম অব্যবস্থাপনা ওয়াশরুমেও। সমস্যা সমাধানে দীর্ঘদিন দাবি জানিয়ে আসলেও মেলেনি সাড়া। অবশেষে অনির্দিষ্টকালের জন্য একাডেমিক শাটডাউন ঘোষণা করে বাড়ি চলে গেছেন প্রতিষ্ঠানটির ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী।
জানা গেছে, ২০১১-২০১২ শিক্ষাবর্ষে ৫১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজের। ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ৬৫ করা হয়েছিল, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১২৫ জনে। এসব শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিষ্ঠানটিতে ৬ তলা বিশিষ্ট দুটি শিক্ষার্থী হোস্টেল নির্মাণ করা হয়। এর একটি ছাত্র, অপরটি ছাত্রীদের জন্য। একই ভাবে ৬ তলাবিশিষ্ট দুটি ইন্টার্ন হোস্টেলও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হোস্টেল নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত আবাসনের পরিকল্পনা করা হয়নি। এ ছাড়া পরবর্তীতে আসন সংখ্যা বাড়ানো হলেও সেখানে নতুন কোনো ব্যবস্থা করেনি সরকার। ফলে হোস্টেলগুলোর সিট সংখ্যার তুলনায় এখন প্রায় দেড় গুণ শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এই সংকট তীব্র। যেখানে ২৩০ থেকে ২৪০ জনের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে হোস্টেলটিতে অবস্থান করছেন ৩৫০ জন ছাত্রী।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছেলেদের হোস্টেলে বর্তমানে আবাসন সমস্যা তীব্র না হলেও কিছুদিন আগে এমনটিই ছিল। সম্প্রতি একটি অংশ ইন্টার্ন হোস্টেলে চলে যাওয়ায় এই সংকট কিছুটা কেটেছে। তবে ছাত্রী হোস্টেলে গাদাগাদি করেই থাকতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। তারা বলছেন, হোস্টেলে সিনিয়র শিক্ষার্থীরা তিনজনের জন্য বানানো একটি রুমে চারজন করে থাকছেন। আর ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রীদের বড় একটি অংশ থাকছেন গণরুমে, যেখানে প্রতি রুমে ২৫ থেকে ২৬ জন করে শিক্ষার্থী একসঙ্গে গাদাগাদি করে থাকছেন।
লেডিস হোস্টেলে একটা। ওখানে সিট হচ্ছে ২৪০, কিন্তু আমাদের প্রায় এখন ৩৫০-এর উপরে মেয়ে আছে। মেডিকেলগুলোতে মেয়েরা বেশি চান্স পায়। এজন্য সংকটটা তৈরি হয়েছে। আপাতত ওই হোস্টেলের কমনরুমগুলোকে গণরুম হিসেবে সিট বরাদ্দ দিয়েছি। এ ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে একটি নতুন হোস্টেল ভবন নির্মাণের জন্য আবেদন করেছি। এই সংকটটার সমাধান হলে খুব ভালো হয়— অধ্যাপক ডা. গোলাম মোর্শেদ মোল্লা, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ
এদিকে দুটি হোস্টেলের অধিকাংশ কক্ষের ফ্যান ও বৈদ্যুতিক বাল্প নষ্ট বলেও অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। তারা বলছেন, কিছু রুমে ফ্যান থাকলেও সেগুলো অচল। এই পরিস্থিতিতে দিন কাটাতে হচ্ছে। এ ছাড়া ৬ তলা বিশিষ্ট এই হোস্টেল ভবনগুলোর প্রতিটি ফ্লোরে দুটি করে মোট ১২টি ওয়াশরুম রয়েছে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পাইপ ফেটে পানি এবং মল-মূত্র চুইয়ে পড়ছে, যার ফলে ওয়াশরুমগুলো সম্পূর্ণ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থার দাবি নিয়ে গত সপ্তাহে কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি জমা দেন তারা। এরপর টানা ৪-৫ দিন ধরে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে গেলেও কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ বা আশ্বাস পাওয়া যায়নি। দাবি আদায়ে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তারা বাড়ি চলে গেছেন।
এদিকে আন্দোলনের প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া নিয়ে গত ৩০ জুন একাডেমিক ভবনে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অধ্যক্ষ, হল সুপার এবং ছাত্রদের সম্মিলিত এই বৈঠকে এক দিনের মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সমাধান এবং এবং অন্যান্য সমস্যার দ্রুত সমাধানের জন্য আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে এর কোনো অগ্রগতি দেখেননি শিক্ষার্থীরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার একাডেমিক শাটডাউনের ঘোষণা দিয়ে অধ্যক্ষ বরাবর দেওয়া এক চিঠিতে শিক্ষার্থীরা লিখেছেন, আশ্বাস দেয়ার পরেও দুই হোস্টেলেরই সমস্যা সমাধানে কলেজ কতৃপক্ষ অপারগ হওয়ায় আগামী সপ্তাহে ক্লাস ও ওয়ার্ড পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দুই হোস্টেলের যাবতীয় সব সমস্যার সমাধান করতে হবে। সব সমস্যার সমাধান আগামী সপ্তাহের মধ্যে না হলে ১১ জুলাই থেকে একাডেমিক সেকশন ব্লক করা হবে এবং ক্লাস ও ওয়ার্ডের বয়কট কার্যক্রমও চলমান থাকবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মেডিকেল কলেজটির তৃতীয় বর্ষের একজন শিক্ষার্থী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের জুনিয়রদের একটা রুমে ২৫-২৬ জন করে থাকতে হচ্ছে। এই ভ্যাপসা গরমে রুমে ফ্যান চলে না, তাপমাত্রা থাকে ৩৭-৩৮ ডিগ্রির ওপরে। তার ওপর ওয়াশরুমের যে অবস্থা, সেখান দিয়ে মল-মূত্র চুইয়ে পড়ছে। সুস্থ মানুষ এখানে থাকলে অসুস্থ হয়ে যাবে।
অপর এক শিক্ষার্থী বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে স্মারকলিপি দিলাম, আন্দোলন করলাম, কিন্তু স্যারদের কোনো সাড়াশব্দ নেই। বাধ্য হয়ে আমরা সম্মিলিতভাবে একাডেমিক শাটডাউন দিয়ে বাড়ি চলে এসেছি। এভাবে একটা মেডিকেল কলেজ চলতে পারে না।
জানতে চাইলে গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. গোলাম মোর্শেদ মোল্লা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের মেডিকেল কলেজের বয়স হচ্ছে প্রায় ১৫ বছর। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর আর কোনো রিনোভেশন (সংস্কার) হয়নি। এজন্য পানি এবং ইলেক্ট্রিসিটিসহ বেশ কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে আপাতত যেন শিক্ষার্থীরা থাকতে পারে, আমরা ইমিডিয়েটলি সেরকম উদ্যোগ নিয়েছি।
তিনি বলেন, আর দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিষয়টি হচ্ছে— ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট (জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল) এগুলো এস্টিমেট করে বরাদ্দ দিয়ে তাদের মেইন্টেন করার কথা। আমাদের কী কী দরকার, তারা ইতোমধ্যে তার একটা চাহিদাও দিয়েছে।
তবে ছাত্রীদের সমস্যা বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, লেডিস হোস্টেলে একটা। ওখানে সিট হচ্ছে ২৪০, কিন্তু আমাদের প্রায় এখন ৩৫০-এর উপরে মেয়ে আছে। মেডিকেলগুলোতে মেয়েরা বেশি চান্স পায়। এজন্য সংকটটা তৈরি হয়েছে। আপাতত ওই হোস্টেলের কমনরুমগুলোকে গণরুম হিসেবে সিট বরাদ্দ দিয়েছি। এ ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে একটি নতুন হোস্টেল ভবন নির্মাণের জন্য আবেদন করেছি। এই সংকটটার সমাধান হলে খুব ভালো হয়।