ঈদি, সালামি, ঈদিয়া: ফাতেমীয় আমল থেকে যুগে যুগে বদলেছে কীভাবে?

২১ মার্চ ২০২৬, ০৯:৫৬ AM
ঈদের সালামি

ঈদের সালামি © বিবিসি বাংলা

ঈদের দিনে শুরুতেই শিশু ও তরুণরা যে জিনিসটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে, তা হলো সালামি। যেটা আরবিতে ঈদিয়া বা ঈদি হিসেবে পরিচিত। সাধারণত বাবা-মা ও বয়সে বড় আত্মীয়রা ছোটদের মধ্যে এটি বিতরণ করেন। ঈদে মুসলমানদের ধর্মীয় রীতির অংশ হিসেবে অনেকেই ঈদি বা ঈদিয়ার অপেক্ষা করে।

এর ঐতিহাসিক উৎস কী? এটি কীভাবে শুরু হলো? আর কবে থেকে এর প্রচলন? কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায়, ‘ঈদিয়া’ শব্দটি ‘ঈদ’ থেকে এসেছে, যার অর্থ দান বা উপহার। সেসব বিবরণ অনুযায়ী, ঈদের দিনে উপহারের আবির্ভাব হয়েছিল মিসরের ফাতেমীয় যুগে। অর্থাৎ হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর শেষ দিকে, যেটা ছিল খ্রিষ্টীয় দশম শতক।

তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে টাকা ও কাপড় বিতরণ করা হতো। ঈদের উপহারের তখন বিভিন্ন নাম ছিল, যেমন ‘রুসুম’ ও ‘তাওসিয়া’। রাজপুত্রদের দেওয়া হতো সোনার দিনার, আর শিশুদের দেওয়া হতো উপহার এবং অর্থ।

ফাতেমীয় আমল: ‘ঈদের উপহারের জন্ম’
ফাতেমীয় যুগের ইতিহাসবিদদের লেখায় খলিফাদের ঈদ উদযাপনের সাথে সম্পর্কিত আচার-অনুষ্ঠান এবং রীতিনীতির বিবরণ পাওয়া যায়। এই আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল ‘ঈদিয়া’, যা প্রথমবারের মতো অন্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে আলাদা উপহার হিসেবে চালু হয়। এটি শুরু হয় খলিফা আল-মু’ইয লি-দীনিল্লাহ আল-ফাতেমীর সময়। তিনি মিশরে তার শাসনামলের শুরুতে মানুষের মন জয় করতে চেয়েছিলেন।

তাই তিনি মিষ্টি বিতরণ, ভোজের আয়োজন, অর্থ ও উপহার বিতরণ এবং ঈদের নতুন পোশাক দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এই পোশাক বা কসওয়া ঈদের প্রায় দেড় মাস আগে থেকেই প্রস্তুত করা হতো, যাতে ঈদে আগের রাতে বিতরণ করা যায়। হিজরি ষষ্ঠ শতকে শুধু পোশাক তৈরির জন্য বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ হাজার স্বর্ণ দিনার। এগুলো রাষ্ট্রের কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হতো।

ইসলামিক ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ ড. আইমান ফুয়াদ বিবিসিকে বলেন, ‘মিশরে অধিকাংশ ধর্মীয় উৎসবের প্রচলন ফাতেমীয় যুগ থেকেই। তখনও মুসলিম বিশ্বে দুটি বড় উৎসব ছিল ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। ফাতেমীয়রা মিশরে এসে নানাভাবে উদযাপন ও রীতিনীতি যোগ করেন’।

‘বর্তমানের ঈদ উপহারের ধারণাটি তখন ছিল না। তবে ঐতিহাসিক সূত্রে দেখা যায়, রমজান শুরু হলে খলিফার দরবারের পদাধিকারী, দাস, খলিফার আশেপাশের ব্যক্তিবর্গ, এমনকি খলিফার স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য মিষ্টিভরা থালা দেওয়া হতো, যার মাঝখানে স্বর্ণমুদ্রা থাকত। রাষ্ট্রের লোকেরাও ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে উপহার পেতেন। এটিকে তখন বলা হতো ‘তাওসিয়া’, যা ফাতেমীয় যুগে চালু ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘ফাতেমীয়রাই ঈদ উপলক্ষে 'দার আল-ফিতরা' চালু করেন। সেখানে ফিতরাহ হিসেবে মিষ্টান্ন, অন্যান্য খাবার ও পোশাক বিতরণ করা হতো এবং প্রাসাদের সোনালী কক্ষে বড় ভোজের আয়োজন করা হতো। এই ভোজ ফাতেমীয় প্রাসাদের 'গোল্ডেন হল'-এ আয়োজন করা হতো এবং ঈদের প্রথম দিনে সবার জন্য খাবার উন্মুক্ত থাকত’।

ফাতেমীয়রা এই ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত ছিল যা ‘ইদিয়া’ নামে উল্লেখ করা হতো। তখন ঈদের আগে কোরআন খতমের পর খলিফা নিজ হাতে আলেম, কুরআন তিলাওয়াতকারী ও মুয়াজ্জিনদের রূপার মুদ্রা উপহার দিতেন। এমনকি রাজা-বাদশাহরাও ঈদের সময় উপহার পেতেন।

ইবন দিহইয়া (মৃত্যু ৬৩৩ হিজরি/১২৩৫ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁর ‘আল-মুতরিব’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘ঈদের দিনে লোকেরা সুলতান আল-মুতামিদ ইবন আব্বাদকে (মৃত্যু ৪৮৮ হিজরি/১০৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) রাজাদের উপযোগী উপহার পেশ করেছিল’।

প্রথম দিকে ‘আল-তাওসিআহ’ নামে পরিচিত ছিল ঈদিয়া, অর্থাৎ ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত অর্থ বিতরণ। ঈদের দিন সকালবেলা প্রাসাদ থেকে খলিফার তত্ত্বাবধানে জনগণের কাছ থেকে শুভেচ্ছা জানাতে আসা ব্যক্তিদের রুপার দিরহাম ও স্বর্ণের দিনার বিতরণ করা হতো।

মামলুক যুগে ‘তাওসিআ’ থেকে ‘জামকিয়া’
মামলুক যুগে ঈদের উপহার আনুষ্ঠানিক রূপ নিতে শুরু করে এবং তখন একে বলা হতো 'আল-জামকিয়া'। এটি শুধু শিশুদের জন্য না, ছোট-বড় সবার জন্যই ছিল। ‘জামকিয়া’ ছিল সুলতানের আদেশে দেওয়া বিশেষ ভাতা, যা ঈদ উপলক্ষে সৈন্য থেকে শুরু করে রাজপুত্র ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দেওয়া হতো।

‘জামকিয়া’ শব্দটি তুর্কি ‘জামা’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ কাপড় বা পোশাক। অর্থাৎ এটি ছিল ঈদের নতুন পোশাক কেনার জন্য বরাদ্দ অর্থ। এর উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে সহায়তা করা এবং ঈদের জন্য বিশেষভাবে নতুন পোশাক কিনতে সক্ষম করা।

ওসমানীয় বা অটোমান যুগে পরিবর্তন
ওসমানীয় বা অটোমান যুগে ঈদিয়া একটি ভিন্ন রূপ ধারণ করে, কারণ এটি জনগণের মধ্যে একটি জনপ্রিয় সংস্কৃতি এবং রীতিতে পরিণত হয়। এটি আর রাষ্ট্রীয়ভাবে বিতরণ করা উপহার ছিল না, বরং মানুষ নিজেদের মধ্যেই এটি পালন করা শুরু করে। 

তখন ঈদের সময় উপহার দেয়া আনন্দের প্রকাশ ও পারস্পরিক সহমর্মিতার সামাজিক রূপ হয়ে দাঁড়ায়। শুধু অর্থ নয়, খাবার, পোশাকসহ নানা উপহারও এর অংশ হয়। সময়ের সাথে সাথে ‘ঈদিয়া’র ধরন পরিবর্তন হতে থাকে এবং পরিবারভিত্তিক নগদ অর্থে সীমিত হয়ে যায়, যা বয়স অনুযায়ী ভিন্ন পরিমাণে হয়।

আধুনিক যুগে ঈদিয়ার বিকাশ
ওসমানীয় যুগের অবসান থেকে আধুনিক যূগের সূচনার সাথে ‘ঈদিয়া’ এখনকার সময়ের মতোই পরিচিত হয়ে ওঠে। পরিবারের প্রধান ব্যক্তি ও বড়রা শিশুদের মধ্যে নগদ অর্থ বিতরণ করেন। শিশুদের কাছে ‘ঈদিয়া’ বিশেষ আনন্দ এবং কে কত টাকা পেল তা নিয়ে গর্ব করার বিষয়।

যদিও ‘ঈদিয়া’র মধ্যে খেলনা, মিষ্টি ও পোশাকের মতো বিভিন্ন উপহার থাকতে পারে। তবে বর্তমানে এটি মূলত সেই নগদ অর্থকেই বোঝায় যার জন্য অনেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। আমরা বাংলাদেশে যেটি সালামি নামে চিনি, বর্তমানে আরব দেশগুলোতে সেটি বিভিন্ন নামে পরিচিত।

সৌদি আরবসহ, জর্ডান, সিরিয়া, ইরাক, কুয়েত ও মিশরে এটি ‘ঈদিয়া’ হিসেবেই পরিচিত। সৌদি আরবের কিছু অঞ্চলভেদে ‘হাওয়ামা’, ‘খাব্বাজা’, ‘হাক্কাকা’ বা ‘ক্কারকিআন’ বলা হয়। কিছু দেশ, যেমন ওমানে এটি ‘আয়্যুদ’ নামে পরিচিত। তিউনিসিয়ার মতো কিছু উত্তর আফ্রিকান দেশে এটি ‘মাহবাত আল-ঈদ’ এবং মরক্কোয় ‘ফলুস আল-ঈদ’ নামে পরিচিত।

ঈদিয়ার মানসিক প্রভাব
মনোবিজ্ঞানী ডা. নিহায়া আল-রিমাওয়ি বলেন, ‘ঈদিয়া ভালোবাসার প্রকাশ। এটি অক্সিটোসিন নামের হরমোন বাড়ায়, যা ভালোবাসা, স্নেহ ও ইতিবাচক সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত। আধ্যাত্মিকভাবে দেখলে এটি সম্পর্ক মজবুত করে এবং আত্মীয়তার বন্ধন জোরদার করে।’ তার মতে, ঈদিয়া দিলে শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। অর্থ পাওয়ার মাধ্যমে তারা দায়িত্ববোধ শেখে। কীভাবে নিজের পছন্দমতো খরচ বা সঞ্চয় করবে সেটাও শেখে।

সমাজবিজ্ঞানী ড. আমাল রিদ্‌ওয়ানও এই ধারনার সাথে একমত। তিনি বলেন, ‘ঈদিয়া শিশুদের আনন্দ দেয় এবং তাদের আচরণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে শুধু গ্রহণকারী নয়, দানকারীও আনন্দ পায়। এটি শিশুদের দান করার ধারণা, সঞ্চয়ের মূল্য এবং ঈদিয়ার টাকা কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা শেখানোর একটি সুযোগ’।

যেমন আট বছর বয়সী মিরাল বলেন, ‘আমি আমার ঈদিয়ার টাকা তিন ভাগ করি, এক ভাগ দিয়ে নিজের পছন্দের জিনিস কিনি, অন্য ভাগ পিগি ব্যাংকে রাখি (সঞ্চয়), আর বাকি অংশ ঘরের গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্রের জন্য।

আরও পড়ুন: দেশজুড়ে জামাতে ঈদের নামাজে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা, প্রধান জামাতে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী

তার মা এটা নিশ্চিত করে বলেন ‘আমি আমার বাচ্চাদের তাদের ঈদির টাকার কিছু অংশ তাদের পছন্দের জিনিস কিনতে, খেলনা কেনার জন্য জমাতে, পাশাপাশি কিছু স্কুল ফি প্রদানেও অভ্যাস করিয়েছি, যাতে তারা দায়িত্বশীল বোধ করে।’

ড. রিদওয়ান এও ব্যাখ্যা করেন যে, ‘ঈদের উপহার কেবল শিশুদের জন্য নয়। স্বামীর স্ত্রীকে দেয়া ঈদের উপহার তাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ায় এবং স্ত্রীর হৃদয়ে একটি জাদুকরী প্রভাব ফেলে, তাকে তার প্রিয় সন্তানের মতো অনুভব করায়। ঈদের উপহার তাদের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে এবং সমস্যা বা মতবিরোধের চিহ্ন মুছে ফেলতেও সাহায্য করে।’

বয়স্ক বাবা-মা’কেও ঈদের উপহার ভক্তি, সম্মান ও ভালোবাসা অনুভব করায় বলে উল্লেখ করেন তিনি। অবশ্য এর কিছু নেতিবাচক দিক নিয়েও সতর্ক করেন বিশেষজ্ঞরা।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ আওয়াব আবু দানুন সতর্ক করেন, ‘যদি শিশু ঈদের আনন্দকে শুধু টাকার সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে, তাহলে ধর্মীয় ও সামাজিক দিক থেকে দূরে সরে যেতে পারে। এছাড়াও, শিশুদের মধ্যে অর্থের পরিমাণের তুলনা থেকে হিংসা বা হতাশাও তৈরি হতে পারে।’

অর্থনৈতিক কষ্টে থাকা ব্যক্তিরাও ঈদিয়া দিতে গিয়ে চাপ অনুভব করতে পারেন। যদি এটি বাধ্যতামূলক সামাজিক রীতি হয়ে যায়। এমন হলে আনন্দের বদলে চাপ তৈরি হতে পারে বলে উল্লেখ করেন ড. দানুন। ডা. আমাল রিদওয়ান বলেন, ‘ঈদিয়া একটি সুন্দর ঐতিহ্য। তবে এতে অপচয় বা নিজের সামর্থ্যের বাইরে যাওয়া উচিত নয়। কারণ এর আসল মূল্য ভালোবাসা প্রকাশ ও অনুভূতিতে নিহিত’। খবর: বিবিসি বাংলা।

তারকা হল্যান্ডকে নিয়ে শক্তিশালী দল ঘোষণা নরওয়ের
  • ২২ মে ২০২৬
কিশোরীকে ধর্ষণ করে ভিডিও ভাইরাল, গ্রেপ্তার ৩, ধরা-ছোঁয়ার বা…
  • ২২ মে ২০২৬
এজলাসে এক আসামিকে গাঁজা-ইয়াবা সাপ্লাই আরেকজনের, দুজনকেই জেল…
  • ২২ মে ২০২৬
স্কুলে যাওয়ার টাকা না পেয়ে বাবার ওপর অভিমান, অষ্টম শ্রেণির …
  • ২২ মে ২০২৬
পরিচয় মিলেছে নিহতের, ১৭ বছর আগে অভিমানে ছেড়েছিলেন বাড়ি
  • ২১ মে ২০২৬
শিশু ধর্ষণে অভিযুক্তকে ‘আটক’ করতে পুলিশের গুলি, ২ সাংবাদিক …
  • ২১ মে ২০২৬
×
ADMISSION
GOING ON
SPRING 2026
APPLY ONLINE
UP TO 100% SCHOLARSHIP
UNIVERSITY OF ASIA PACIFIC 🌐 www.uap.ac.bd
Last Date of Application:
21 June, 2026
📞
01789050383
01714088321
01768544208
01731681081