প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবারকে মুসলিম সমাজে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ বলা হয়। ফারসি শব্দ ‘আখেরি’ অর্থ শেষ এবং ‘চাহার সোম্বা’ অর্থ বুধবার। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের শেষ অসুস্থতার সময় এ দিনের একটি বিশেষ ঘটনা স্মরণ করা হয়।
ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, সফর মাসের শেষ বুধবার মহানবী (সা.) তাঁর দীর্ঘ অসুস্থতার মধ্যে কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেছিলেন। এ সময় তিনি গোসল করেন এবং নামাজে ইমামতিও করেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। তাঁর সুস্থতার খবরে সাহাবিরা আনন্দিত হন এবং অনেকে দান-সদকা ও শুকরিয়া আদায় করেন।
আখেরি চাহার সোম্বা কী?
হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবারকে আখেরি চাহার সোম্বা বলে। সফর মাসের শেষ বুধবারে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রচণ্ড অসুস্থতা থেকে সুস্থতা অনুভব করলে সাহাবিরা খুশি হয়ে দান সদকা করেন ও শুকরিয়া আদায় করেন বলে মত পাওয়া যায়। এ জন্য কিছু দেশে এদিনে দান সদকাসহ বিভিন্ন নফল ইবাদত করেন ধর্ম প্রাণ মুসলমানগণ।
বাংলাদেশে এ দিবস উপলক্ষ্যে বার্ষিক সরকারি ছুটির তালিকায় একটি ছুটি ঐচ্ছিক ছুটি হিসেবে উল্লেখ আছে। বাংলাদেশে এ দিবস পালন নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্যও দেখা যায়।
আখেরি চাহার সোম্বা কবে পালন করা হয়— আখেরি চাহার সোম্বা প্রতি বছর হিজরি চন্দ্র বছরের সফর মাসের শেষ বুধবার পালন করা হয়।
প্রেক্ষাপট
আখেরি চাহার সোম্বা পালনের নেপথ্যে মূলত দুটি লোকপ্রচলিত ধারণার কথা বলা হয়ে থাকে—
প্রচলিত কিতাব (যেমন, বারো চান্দের ফজিলত বা রাহাতুল কুলুব) অনুযায়ী, হিজরি ১১ সনের সফর মাসের শেষের দিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনসায়াহ্নে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। সফর মাসের শেষ বুধবারে তিনি কিছুটা সুস্থতা বোধ করেন, গোসল সমাপন করেন এবং মসজিদে নববিতে উপস্থিত হয়ে সাহাবিদের নিয়ে জোহরের নামাজ আদায় করেন। নবীজি (সা.)-কে সুস্থ দেখে সাহাবিদের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। এই খুশিতে আবু বকর (রা.) ৭ হাজার দিনার, ওমর (রা.) ৫ হাজার দিনার, ওসমান (রা.) ১০ হাজার দিনার, আলী (রা.) ৩ হাজার দিনার এবং আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) ১০০ উট ও ১০০ ঘোড়া সদকা করেছিলেন বলে বর্ণিত আছে।
জাদুর প্রভাব থেকে মুক্তি: অন্য একটি মতে, সপ্তম হিজরিতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর জনৈক ইহুদির জাদুর যে প্রভাব পড়েছিল, তা সফর মাসের শেষ বুধবারে কেটে যায় এবং তিনি সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করেন।
এই দুটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতিচারণা হিসেবেই বিশ্বজুড়ে একশ্রেণির মুসলমান গোসল-অজু সম্পাদন, বিশেষ নফল নামাজ আদায়, দরুদ শরিফ পাঠ এবং দান-সদকার মাধ্যমে দিনটি পালন করে থাকেন। বাংলাদেশেও দিনটি উপলক্ষে সরকারি ঐচ্ছিক ছুটি বহাল রয়েছে।
সিরাত ও হাদিস বিশারদদের বিশ্লেষণ ও ঐতিহাসিক তথ্য
প্রচলিত এই ধারণাসমূহকে ইসলামি পণ্ডিত, সিরাত গবেষক ও নির্ভরযোগ্য হাদিস বিশারদগণ ভিত্তিহীন ও প্রামাণ্য দলিলবিহীন বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের উপস্থাপিত ঐতিহাসিক যুক্তিগুলো হলো—
অসুস্থতার দিনক্ষণ নিয়ে মতভেদ— প্রখ্যাত তাবেয়ি ইবনে ইসহাক ও ইবনে হিশামের বর্ণনানুযায়ী, মহানবী (সা.)-এর অন্তিম অসুস্থতা শুরু হয়েছিল ১৮ সফর অথবা রবিউল আউয়াল মাসের শুরুতে। তিনি ঠিক কোন দিন অসুস্থ হন (শনি, সোম নাকি বুধবার) এবং কত দিন অসুস্থ ছিলেন (১০, ১২, ১৩ নাকি ১৪ দিন), তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। ফলে সফর মাসের শেষ বুধবারেই তিনি সুস্থ হয়ে গোসল করেছিলেন, এমন নির্দিষ্ট কোনো তারিখ বিশুদ্ধ হাদিস সনদে পাওয়া যায় না।
জাদুর ঘটনার সময়কাল— সিরাতগ্রন্থ ও হাদিসের (যেমন ফাতহুল বারি, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া) সনদ অনুযায়ী, হুদায়বিয়ার সন্ধির পর সপ্তম হিজরির মহররম মাসে নবীজি (সা.)-এর ওপর জাদুর প্রভাব ঘটেছিল, যা ৪০ দিন থেকে ৬ মাসের মধ্যে সমাপ্ত হয়। সুতরাং, সফর মাসের শেষ বুধবারে জাদুর প্রভাব কাটার দাবিটির পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
সাহাবি ও তাবেয়িদের আমলে অনুপস্থিতি— বিশ্বনবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর খোলাফায়ে রাশেদিন বা সাহাবায়ে কেরাম কখনো এ দিনটি উৎসব বা ধর্মীয় দিবস হিসেবে পালন করেননি। এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।— মুফতি হাসান আরিফ, ইসলামবিষয়ক গবেষক
আখেরি চাহার শোম্বা উদযাপন
কারও মতে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন দিনে সুস্থ হয়েছিলেন, কোন অসুস্থতার পর সুস্থ হয়েছিলেন ইত্যাদি স্পষ্ট করে ইতিহাসে বর্ণিত নেই। আবার নবীজি (স.)-এর মৃত্যুর পর কোনো সাহাবি এই দিবস পালন করতেন না। তাই এই দিবস পালনে তারা নিরুৎসাহিত করেন।
যারা এই দিবস পালন করে থাকেন তারা দুই সময়ের অসুস্থতার কথা বলে থাকেন। কেউ বলেন সপ্তম হিজরিতে নবীজি (স.)-এর জাদুতে আক্রান্ত হওয়ায় অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর সফর মাসের শেষ বুধবারে সুস্থ হয়ে যান।
আবার কেউ কেউ বলেন নবীজি (স.) মৃত্যুর আগে যে অসুস্থ হয়েছিলেন সে সময় মৃত্যুর আগে সফর মাসের শেষ বুধবারে সুস্থতা অনুভব করেন এবং মসজিদে নামাজ পড়তে আসেন। এ সময় হজরত আবু বকর (রা.)-কে ইমামতির দায়িত্ব দেন তিনি। সে বুধবারের পর আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন।
অসুস্থতার সময় যেটাই হোক নবীজি (স.) সুস্থ হওয়ার পর যখন মসজিদে আসেন তখন সাহাবায়ে কেরাম অনেক আনন্দিত হন এবং শুকরিয়া স্বরূপ দান সদকা করেছিলেন।
বর্ণিত আছে, আবু বকর (রা.) খুশিতে ৭ হাজার দিনার এবং ওমর ইবনে খাত্তাব ৫ হাজার দিনার, ওসমান ১০ হাজার দিনার, আলী ৩ হাজার দিনার, আবদুর রহমান ইবনে আওফ ১০০ উট ও ১০০ ঘোড়া আল্লাহর পথে দান করেছিলেন। এরপর থেকে মুসলমানরা সাহাবিদের নীতি অনুকরণ ও অনুসরণ করে আসছে।
এসব বর্ণনা ‘বারো চান্দের ফজিলত’ ও ‘রাহাতুল কুলুব’ ইত্যাদি বইয়ে বলা আছে। তবে উল্লিখিত কিতাব দুটিতে বর্ণিত ও বহুল প্রচলিত সফর মাসের শেষ বুধবারের বিষয়টিকে ইসলামি পণ্ডিত ও গবেষকগণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।
তাদের বক্তব্য হলো, রসুলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ হওয়ার দিনক্ষণ নিয়ে যথেষ্ট ইখতিলাফ থাকায় নির্দিষ্ট কোনো দিনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অথচ রসুল (সা.)-এর অসুস্থতাজনিত বর্ণনা অসংখ্য হাদিসে রয়েছে, তবে কোথাও দিন-তারিখ নির্দিষ্ট করে উল্লেখ নেই। তা ছাড়া প্রখ্যাত তাবেয়ি ইবনে ইসহাক বলেন, রসুলুল্লাহ (সা.) যে অসুস্থতায় ইন্তিকাল করেন, সেই অসুস্থতার শুরু হয়েছিল সফর মাসের শেষ কয়েক রাত থাকতে অথবা রবিউল আউয়াল মাসের শুরু থেকে। (ইবনে হিশাম, সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ: ৪/ ২৮৯)
এ ছাড়া, ইবনে হিশাম বিভিন্ন বর্ণনার আলোকে রসুলুল্লাহ (সা.)-এর অসুস্থতার দিন ঠিক করেছেন ১৮ সফর থেকে একনাগাড়ে ১৩ দিন পর্যন্ত। (ইবনে হিশাম ৯৯৯) এই মতের মতোই হুবহু পাওয়া যায় ইসলামি বিশ্বকোষের ১৩ নং পৃষ্ঠায়।
শনিবার, কেউ বলেছেন বুধবার এবং কেউ বলেছেন সোমবার। এমনকি কত দিনের অসুস্থতার পর তিনি ইন্তিকাল করেন, সে বিষয়েও রয়েছে মতভেদ। কেউ বলেছেন ১০ দিন, কেউ বলেছেন ১২ দিন, কেউ বলেছেন ১৩ দিন, কেউ বলেছেন ১৪ দিন। এরপর তিনি ইন্তিকাল করেন। (জারকানি/শারহুল মাওয়াহিব-১২/ ৮৩; কাসতালানি, আহমদ ইবনে মুহাম্মদ, আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া: ৩/ ৩৭৩)
সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, রসুল (সা.)-এর ওপর জনৈক ইহুদির জাদুর প্রভাব ছিল হুদায়বিয়ার সন্ধির পরে সপ্তম হিজরির মহররম মাসের প্রথম দিকে। এই জাদুর প্রভাব কোনো বর্ণনায় ছয় মাসের কথা এসেছে, আর কোনো বর্ণনায় এসেছে ৪০ দিনের কথা। সুতরাং সুস্থতার তারিখ কোনোভাবেই ১১ হিজরির সফর মাসের ‘আখেরি চাহার শোম্বা’ বা ‘শেষ বুধবার’ হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রখ্যাত অনেক গবেষক আলেম। (ফাতহুল বারি: ৭/ ৭৪৮, কিতাবুল মাগাজি: ৪৪৪২, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/ ১৯৩, সিরাতুন নবী, শিবলী নোমানী: ২/ ১১৩)
এ কথাও ঠিক নয় যে, বুধবারের পর সুস্থতায় কোনোরূপ উন্নতি হয়নি। বরং এরপর আরেক দিন সুস্থতা বোধ করেছিলেন এবং জোহরের নামাজ আদায় করেছিলেন। (বুখারি ৬৬৪, ৬৮০, ৬৮১; মুসলিম ৪১৮) এমনকি সোমবার সকালেও সুস্থতা অনুভব করেছিলেন, যার কারণে আবু বকর (রা.) অনুমতি নিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। (সিরাতে ইবনে ইসহাক ৭১১-৭১২, আর রাওজাতুল উলুফ ৭/৫৪৭-৫৪৮)
দিনটি যদি আমলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতো তাহলে এ দিনটি সম্পর্কে হাদিসে বা সাহাবিদের বর্ণনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতো। আর ধর্মীয় সব রীতিনীতি নির্ভরযোগ্য সনদে পাওয়া না গেলে সেটার অনুকরণ-অনুসরণ উম্মতের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।
কেউ যদি নিজের থেকে ভালো মনে করে ইবাদতের পদ্ধতি তৈরি করে সওয়াবের আশায় পালন করে তাহলে সেটা বিদআত হিসেবে পরিগণিত হয়। কেননা, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কেউ যদি এমন কোনো আমল করে, যার প্রতি আমাদের নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত। (বুখারি ২৬৯৭; মুসলিম ১৭১৮)