অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম © টিডিসি সম্পাদিত
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ৩১তম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে বাউবির উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তার স্বপ্ন ও পরিকল্পনা, ক্যাম্পাসের হালচাল ও পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে। গল্প-আলাপে পাঠকদের জন্য তার চুম্বক অংশ তুলে ধরছেন ইরফান এইচ সায়েম—
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন নিয়মিত হচ্ছে না কেন?
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম: সাধারণত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর সমাবর্তন হওয়ার কথা। বিগত দিনে প্রতিকূল পরিবেশ ছিল। রাজনৈতিক পরিবেশ অন্যরকম ছিল। সে কারণে প্রতিবছর করার মত পরিবেশ পরিস্থিতি ছিল না। তবে সেই দায়ভার আমি নিচ্ছি না। কারণ আমি দায়িত্ব নিলাম মাত্র।
আমার বক্তব্য হল এই যে, আমার পরিকল্পনা আছে যে একাডেমিক পরিবেশ সুন্দর রাখার জন্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অর্থাৎ ডিগ্রি যারা (শিক্ষার্থী) পাবেন সেটা যেন সমাবর্তনের মাধ্যমে পায়। এজন্য প্রতিবছর সমাবর্তন করার পরিকল্পনা আমার আছে। আগামী দিনে সেই পরিকল্পনা নিয়ে আমরা শিগগির হয়তো এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করব। ইনশাআল্লাহ।
গবেষণায় একদিকে বাজেটের স্বল্পতা, অপরদিকে কোনো অনীহা তৈরি হয়েছে কিনা?
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সবচেয়ে আদি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সর্ববৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে গবেষণা হবে এটাই স্বাভাবিক। এটি শুধুমাত্র সার্টিফিকেট বিতরণ কেন্দ্র না। শিক্ষা এবং গবেষণা মিলে এই বিশ্ববিদ্যালয়। আর গবেষণা এবং শিক্ষার পাশাপাশি জাতির জন্য যা কিছু কল্যাণকর তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তৈরি হয়েছে। জাতি গঠনের সম্পূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়।
আমাদের গবেষণার জন্য যে বাজেট দরকার সেটা অপ্রতুল। কিন্তু গবেষণার জন্য অনীহা আছে এটা আমি ঠিক বলব না। বাজেটের অপ্রতুলতাই আমরা লক্ষ্য করতে পারি। সেক্ষেত্রে আমরা আমাদের লক্ষ্য থাকবে আগামী দিনে সরকার যে বাজেট দেয় বা ইউজিসি যে বাজেট দেয় সেই বাজেট দিয়ে আমাদের বেতন-ভাতা দিয়ে বা অন্যান্য ব্যয় করার পরে আসলে গবেষণার জন্য খুব যৎসামান্য থাকে। সেক্ষেত্রে আমরা সবসময় শিক্ষকদের উৎসাহিত করি, বিভিন্ন জায়গা থেকে গবেষণার জন্য ফান্ড কালেকশন করা। এট দ্যা সেম টাইম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা উদ্যোগ নেব একাডেমিয়া এবং ইনস্টিটিউটের সাথে একটা কোলাবরেশন তৈরি করার।
কেননা, আসলে আমরা যে কারিকুলামের মাধ্যমে শিক্ষা দান করি, সেই শিক্ষাদানটা বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্র হল ইন্ডাস্ট্রি। ইন্ডাস্ট্রিতে যদি সেটা বাস্তব প্রয়োগ হয় তাহলে এই কারিকুলাম যথার্থ বলে আমরা মনে করি। সেক্ষেত্রে আমরা একাডেমিয়ার সাথে ইন্ডাস্ট্রির কোলাবরেশনটাকে গুরুত্ব দিব এবং তার জন্য যা যা করণীয় সরকারের সহযোগিতা আমরা নিব। আর বিদেশের সাথে আমরা যে কোলাবরেশন করা বা চুক্তি করা, এমওইউ করার মাধ্যমে আমাদের পারস্পরিক গবেষণা সহযোগিতা বা এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম করার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে আরো গতিশীল আনার চেষ্টা করব। ইনশাআল্লাহ।
বৈশ্বিকভাবে র্যাঙ্কিংয়ে আরও এগিয়ে যেতে কী কী পরিকল্পনা নেবেন?
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম: বাংলাদেশে বৈশ্বিকভাবে র্যাঙ্কিংয়ে ওভারঅল চিন্তা করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো সবার সেরা। এই র্যাঙ্কিংয়ে শুধুমাত্র গবেষণা না। তার বাইরে অনেক প্যারামিটার কাজ করে। সেই প্যারামিটারগুলো যদি আমরা একটু উন্নত করতে পারি তাহলে আমরা বৈশ্বিকভাবে র্যাঙ্কিংয়ে আরও উন্নত করতে পারবো।
বাংলাদেশে এখন ডেমোক্রেটিক গভর্নমেন্ট আসছে, স্ট্যাবল গভমেন্ট ফর্ম করেছে। আমরা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং সরকার প্রধান যারা আছেন এবং তার সরকার সবাই কিন্তু এই শিক্ষাটাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ আমরা গত সময়ে দেখেছি যে বাংলাদেশের শিক্ষাটাকে অত্যন্ত ধ্বংসপ্রাপ্ত ছিল। সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত শিক্ষা থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য উনারা এখন নজর দিয়েছেন।
শিক্ষার ক্ষেত্রে বাজেট প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে গভর্নমেন্ট যদি শিক্ষাক্ষেত্রে বাজেটে জিডিপির যদি ৬% বরাদ্দ থাকে তাহলে কিন্তু অনেক কাজ করা সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে বাজেটের পরিমাণ খুবই সামান্য। ২% এর কম। সেই বাজেট দিয়ে আমাদের পর্যাপ্ত হয় না। তারপর আগামীতে যিনি একাডেমিক (প্রো-ভিসি) আসবেন তার সাথে আমরা কথা বলবো। যাতে করে অন্তত এই বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে র্যাঙ্কিংটাকে আমরা এগিয়ে নিতে পারি। সেই উদ্যোগ আমি গ্রহণ করব। ইনশাআল্লাহ।
রেজিস্ট্রার ভবনে সেবা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি লাঘবে কী ব্যবস্থা নেবেন?
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম: কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে ইতোমধ্যে একটা নোটিশ দিয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বদনাম এরকম আছে যে ফাইল ফেলে রাখে, ফাইল পাওয়া যায় না, ফাইল হারিয়ে যায় এবং দীর্ঘসূত্রিতা থাকে— সেই কথাগুলো আপনাদের নজরেও আছে। তাই আমি ইতোমধ্যে নোটিশ দিয়েছি যে কোনো ধরনের নথি, নোট বা কোনো ফাইল আসলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সমাধান করতেই হবে। এটা লম্বা সময়ের জন্য কোনো টেবিলে পড়ে থাকলে তাকে জবাব দিতে হবে এবং তার জবাব দেওয়ার পর যা শাস্তি সেটা সে পাবে। কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। আশা করি, কোনো ভোগান্তি হবে না।
শিক্ষার্থীদের সেবাটাই আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। কারণ শিক্ষার্থীরা আমাদের এখানে সম্পদ। তাদের কারণে আমরা আছি। শিক্ষার্থীবান্ধব না হলে আল্টিমেটলি আমার বলব যে কোনো কাজই আমাদের ফলপ্রসূ হবে না। শিক্ষার্থীদের সেবার মান উন্নত করতে হবে। তারা বাইরে যাবে, এটি আমরা চাইব। দেশে লেখাপড়া করে বিদেশে যাবে, তারা ট্রান্সক্রিপ্ট নেবে— সমস্ত কাজ দ্রুত গতিতে সম্পন্ন করা যায়, সেই নির্দেশনা আমি দিয়েছি।
আগামীতে শিক্ষক নিয়োগের মাপকাঠি কী হবে?
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম: শিক্ষক নিয়োগের মাপকাঠি হতে হবে একেবারে মেধা ও যোগ্যতাসম্পন্ন। কারণ এই বিশ্ববিদ্যালয় একটি কসমোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়। সে হিসেবে বাংলাদেশের পাইয়োনিয়ার এটি। এই বিশ্ববিদ্যালয় যদি ভাল থাকে, সারা দেশ ভাল থাকবে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যা কিছু খারাপ, তা সারা দেশকে ভোগান্তি দেবে।
এই বিশ্ববিদ্যালয় গত আমলে যাদের শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে, তাতে অনেক বছর পিছিয়ে দিয়েছে। এ নিয়োগ নিয়ে প্রতিবাদ করেছি আমরা। আমার বক্তব্য হল এই যে, আমরা মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দিতে চাই। শুধু এখানে না, আমার বক্তব্য আপনারা আগেও দেখেছেন বিভিন্ন সময়। শিক্ষার মূল ভিত্তি হল মেধা চর্চা। যদি আমি সেই প্রাইমারি লেভেল থেকে আমি যোগ্য শিক্ষক প্রাইমারি স্কুলে নিয়োগ দেই, তাহলে জাতি গঠনের সুবিধা হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক, যদি সব জায়গায় শিক্ষক নিয়োগে মেধার মূল্যায়ন হয়, তাদেরকে দিয়ে জাতি গঠন সম্ভব। অন্যথায় যদি দলীয় লেজুড়ভিত্তিক হয়, তারা জাতির বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
চাকরিচ্যুত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য— কেমন ছিল আপনার এই জার্নিটা?
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম: আসলে আমি পেছনের কথা এখন আর ভাবতে চাই না। কারণ আমি এই চেয়ারে বসার পরে পেছনের কথা ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে ভোলা যায় না। কেননা খুব খারাপ সময় পার করেছি একটা সময়। আপনি দেখেছেন যে আমার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমাকে চাকরিচ্যুত করেছে বা চাকরি থেকে আমাকে বিরত থাকতে হয়েছে, একাডেমিক কার্যক্রম থেকে। আমি এখনো বলব যে, আমি কোনো ভুল করি নাই। তারা তাদের অপকর্ম, তাদের অন্যায়, তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার— তার প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমি তাদের রোষানলে পড়েছিলাম। এটা আমি কখনো পছন্দ করি না। এটা ব্যক্তিগতভাবে আমি খুবই ঘৃণা করি।
কারণ প্রতিহিংসার রাজনীতি কখনো ভাল কিছু দেয় না। বরং প্রতিহিংসা রাজনীতি মানুষকে আরও ধ্বংস করে দেয়। তো সেই জায়গা থেকে আমি এটা অপছন্দ করি। সবসময় আপনারা দেখেছেন, সিনেটের বক্তব্যে বা বিভিন্ন জায়গায় নেতৃত্ব দেওয়ার সময় আমরা সবসময় শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সোচ্চার ছিলাম। ডাকসু নির্বাচন হওয়াটা, শিক্ষার্থীদের গণরুমে যে অত্যাচার হত, নিপীড়ন হত, গণরুম কালচারকে টর্চার সেল বলেছি। তার থেকে বিরত থাকার কথা বলেছি এবং এগুলো প্রতিবাদ করেছিলাম।
আমরা তখন সহাবস্থান দেখি নাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠন, তারা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করবে, তাদের দলীয় কার্যক্রম চালাবে— স্বাভাবিক এটা। কিন্তু তখন সেখানে বাধাগ্রস্ত করা হত। তাদের মদতপুষ্ট বা সরকারি একটা ছাত্রসংগঠন, তারাই শুধুমাত্র থেকে বাকিরা সবাই ক্যাম্পাসের বাইরে থেকেছে। এটার প্রতিবাদ আমরা করে আসছিলাম। আমরা আশা করি, এই ঘটনা পুনরাবৃত্তি হোক এটা আমরা চাইব না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
৫ আগস্টের পর আওয়ামীপন্থী অনেক শিক্ষক ক্লাসে ফিরতে পারেননি। তাদের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবেন?
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম: ঈদের ছুটির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছি। এরপর স্বাধীনতা দিবসের ছুটি গেল। সংশ্লিষ্টদের ফাইলগুলা কোন অবস্থায় আছে, বিষয়টি জানতে ইতোমধ্যেই তদন্ত কমিটি ও শাখাকে বলেছি। আগামী রবিবার থেকে খুলবে অফিস; তখন বিষয়টি দেখব। যদি সত্যিকারভাবে তাদের সম্পর্কে অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয় এবং তদন্ত কমিটি কী রিপোর্ট দিয়েছে তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কী পরিকল্পনা থাকবে?
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শুধুমাত্র যে পাঠ্যপুস্তকে থাকতে হবে কথাটা ঠিক না। তাদেরকে বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ করে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে এগিয়ে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন অলিম্পিয়াড কাজ করে, ডিবেট বলেন বা বিভিন্ন কম্পিটিশন হয়। আমরা দুই-এক সময় দেখেছি যে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি বা অন্যান্য ইউনিভার্সিটি, বুয়েট এগিয়ে যায়, তারা ভাল করে। এটা আমার কাছে বোধগম্য না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর চাইতে পিছিয়ে পড়ার কথা না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাল করার কথা। আমি আগামী দিনে অবশ্যই এই লেখাপড়ার পাশাপাশি এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিগুলোকে গুরুত্ব দিব।
আমাদের এখন সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি মিনিস্টার যিনি আছেন বা উপদেষ্টা আছেন, অত্যন্ত দক্ষ ও যোগ্য। শিক্ষামন্ত্রী যিনি আছেন বা শিক্ষা উপদেষ্টা— তারা অত্যন্ত দক্ষ ও যোগ্য মানুষ। আমরা তাদেরও নজরে আনব। আগামী সপ্তাহে এখানে সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির উপদেষ্টা আসবেন। তার সাথে কথা বলব। ফান্ডের বিষয়ে বলতে গেলে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের যে খাতগুলো আছে তার বাহিরে খরচ করতে পারি না। তারপরও আমরা বাহিরের পৃষ্ঠপোষকতা কামনা করব। তাদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করব। সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা এদিকে চেষ্টা করব।
পিএইচডি ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ করা হবে না বলে একসময় আলাপ উঠেছিল। সেটি বাস্তবায়নে এগোবেন কী?
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম: শিক্ষক নিয়ে একটা নীতিমালা আছে। এই নীতিমালাটা কিন্তু আমি, একেবারে সরাসরি আমি আমার মত ইন্ডিপেন্ডেন্টলি করতে পারি না। আমাদের একটা মনিটরিং বডি আছে। সেটি হল ইউজিসি। তাদের একটা নীতিমালা থাকে। তাদের সমন্বিত নীতিমালা ইন্টিগ্রেট ফর্মে যে নীতিমালাটা থাকে, সেগুলোকে নিয়ে আমরা চিন্তা করব। এখন আমি চাইলেই সবকিছু রাতারাতি পরিবর্তন করতে পারব না।
কেননা আপনি জানেন যে যিনি ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স বা অনার্স পরীক্ষায় ডাবল ফাস্ট হয়েছেন, তাকে আমি বাদ দিব অথচ বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে একজন পিএইচডিওয়ালা আসছেন, ওনার রেজাল্ট যদি দুর্বল হয়, তাকে শুধু পিএইচডির কারণে গুরুত্ব দেওয়া যাবে— এটাও সবসময় ঠিক না। এজন্য আমি মনে করি, একটা নীতিমালা থাকা উচিত। সেই নীতিমালা যদি সমন্বিত হয়, তাহলে সেটা আমার জন্য বেটার হয়। আমার শেষ কথা, আমরা অবশ্যই যোগ্যতা এবং মেধাকে মূল্য দিতে চাই। মেধা এবং যোগ্যতার মূল্য দিলেই বিশ্ববিদ্যালয় বাঁচবে, দেশ বাঁচবে।
ক্যাম্পাসে ডাকসু, হল সংসদ ও ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিতে কী পদক্ষেপ নেবেন?
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম: দায়িত্ব নেওয়ার পর ডাকসুর ভিপির সাথে কথা হয়েছে আমরা। তিনি বোধহয় বিদেশে আছে। আমরা ডাকসুর সাথে বসব। আমরা একে একে হল সংসদের সাথে বসব এবং বিভিন্ন ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের সাথে বসব। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়টাকে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে রাখতে চাই। তবে নিষিদ্ধ কোনো সংগঠন যদি মিছিল করে এটাকে আসলে কাপুরুষিত মিছিল বলব। কারণ ঈদের ছুটিতে কেউ ক্যাম্পাসে নেই, সেই সুযোগে হঠাৎ ঝটিকা মিছিল, ভোর পাঁচটার সময় মিছিল, ৩০ সেকেন্ডের একটা মিছিল করলাম, এটাকে সংগঠনের কাজ বলে না। এটা এক ধরনের কাপুরুষিত মনোভাব।
আমাদের প্রক্টরিয়াল টিম স্ট্রং আছে। তারা ব্যবস্থা নেবে এবং ক্যাম্পাসে সব সময় টহলে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে আমি ইতোমধ্যে সভা করেছি এবং তাদেরকে বলেছি যে, এই ধরনের কার্যক্রম জিরো টলারেন্স হবে। এই ধরনের কোনো অপকর্মকে আমরা বরদাস্ত করব না। সেটাকে আইনশৃঙ্খলার মাধ্যমে মোকাবিলা করব। যারা ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন আছে, তারা তাদের কাজকর্ম ক্যাম্পাসে অবাধে চালাতে পারবে। এটা আমরা আশা করি।
আমি ব্যক্তিগতভাবে একটা আদর্শ লালন করি। এটা আমি কেন আপনি করেন। প্রতিটা ব্যক্তিরই মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে। দলীয় মত থাকতেই পারে। আপনি যখন চেয়ারে বসবেন তখন সেই দলীয় মতের যেন প্রতিফলন না ঘটে। এটা করতে পারাটা হচ্ছে একজন সার্থক প্রশাসকের কাজ।
সেই জায়গা থেকে আমি বলব যে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে এক মাসের বেশি সময় হয়েছে। আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহাবস্থানের বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি ঘটে নাই। আমি সেই জায়গা থেকে আমার প্রতি কারো চিন্তা থাকে যে, না তিনি একটা দলের মত বিশ্বাস করে। কিন্তু না, চেয়ারে বসার পর আমি কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং সেই জায়গা থেকে আমি বলব, সার্বজনীন উপাচার্য হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। তার বিচ্যুতি হলে আমাকে আপনারা অন্যভাবে ট্রিট করবেন।
৫ আগস্টের পর শিক্ষক সমিতি নিষ্ক্রিয় রয়েছে। সক্রিয় করতে আপনার কী পরামর্শ থাকবে?
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম: ৫ আগস্টের পর না। ৫ আগস্ট আগেও শিক্ষক সমিতিটা ছিল একটা টোটালি অনির্বাচিত শিক্ষক সমিতি। এই শিক্ষক সমিতি একতরফা হয়েছে। এখানে বিরোধী কোনো প্যানেল ছিল না। ওই সময় সাদা দল থেকে বলা হয়েছিল যে, ওই সময় নির্বাচন হওয়া উচিত হবে না এবং নির্বাচন বয়কট করেছিল।
কারণ তারা শুধুমাত্র শিক্ষক নিয়োগ দেয় নাই, ভোটার নিয়োগ দিয়েছিল। সেই ভোটার নিয়োগের মাধ্যমে একচ্ছত্র আধিপত্য এবং একনায়কতন্ত্র চালু করেছিল। তার প্রতিবাদে সেই সময়কার সাদা দল প্রতিবাদ করে নির্বাচন বয়কট করেছে। কিন্তু সাদা দলের দাবিগুলো উপেক্ষা করে তারা এককভাবে শিক্ষক সমিতির একটি প্যানেল তৈরি করে নিজেদের নির্বাচিত ঘোষণা করেছে।
সেই নির্বাচন আল্টিমেটলি ৫ আগস্টের পরে কোনো জায়গা থেকে বৈধতা পায় নাই। এখন তাদেরকে অলরেডি ঘোষণা দিয়েই ঔন করে না। অতএব তারা এখন যদি তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে সেটা তাদের বিষয়। আমি শিক্ষক সমিতিতে এখন নেই।
আগামী দিনে শিক্ষক সমিতিতে কী হবে সেটা তো উপাচার্যের বিষয় না। এটা হল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন। তারা কীভাবে সংগঠন পরিচালনা করবে, তারা কীভাবে সমিতি করবে— সেটা তাদের বিষয়। আমার কাছে উপচার্য হিসেবে সহযোগিতা চাইলে আমি তাদেরকে সহযোগিতা করব।
ক্যাম্পাসে বিগত সময়ে শিক্ষার্থী নির্যাতন হয়েছে। আগামীতেও এসব ঘটনা আবার পুনরাবৃত্তি ঘটবে কিনা?
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম: কয়েকদিন আগে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে কথা বলেছি। আমাদের বক্তব্য হল যে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াটা অপরাধ। আমি কখনো প্রতিহিংসা রাজনীতি করব বলে আইন নিজের হাতে তুলে নেব, এটা হতে পারে না। আমরা যদি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সঠিকভাবে কোনো অপরাধ পেয়ে থাকি কিংবা তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ও অভিযোগ থাকে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে আইনের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। কিন্তু আইন নিজের তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
কারণ আমরা এখানে প্রতিহিংসার রাজনীতি করতে আসি নাই, রাজনীতিও করতে আসি নাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ সুন্দর রেখে বিশ্ববিদ্যালয়কে উপরে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিকল্পনা করছি। তা থাকবে না, যদি সেই একই অপকর্ম (বিগত সময়ে শিক্ষার্থী নির্যাতন) আমরা পরিচালনায় সহায়তা করি। তাহলে জাতি আমাদের ক্ষমা করবে না। আমরা তো মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হয়ে যাব। সেটা তো করতে পারি না।
বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে কী স্বপ্ন দেখেন? দুই-তিন-চার বছর পর...
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম: স্বপ্ন তো দেখি। অনেক বড় স্বপ্ন দেখতে চাই। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান বিশ্ববিদ্যালয়। জাতির পথপ্রদর্শক এটি। সেই বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো ভাল জায়গায় নিয়ে যাওয়াটাই তো আমার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এবং উদ্দেশ্য সেটাই।
তবে আমি একা ব্যক্তি ওবায়দুল ইসলাম কেউ না। আমাদের একটা টিম থাকবে। এটা নিশ্চিত টিমওয়ার্কের আওতায় হবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বলেন, ডিন মহোদয় বলেন, হল প্রভোস্ট বলেন, চেয়ারম্যানবৃন্দ বলেন, শিক্ষার্থী বলেন— সবার সহযোগিতায় আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো উপরে নিয়ে যাব এবং নেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।
একই সাথে র্যাঙ্কিংয়ের কথা বলছি। বিশ্ব পরিমণ্ডলে র্যাঙ্কিংকে উপরে নিয়ে যাওয়ার জন্য অবশ্যই ইচ্ছা আছে এবং দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে কাজ করব। ইনশাআল্লাহ।