ববি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম © টিডিসি সম্পাদিত
পদোন্নতির দাবিতে ‘কমপ্লিট অ্যাকাডেমিক শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। গত বুধবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির ফলে সব বিভাগের ক্লাস, পরীক্ষা ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকেও সরে দাঁড়িয়েছেন শিক্ষকেরা। এতে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশা তৈরি হয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের স্টাফ রিপোর্টার সোহেল রানা—
শিক্ষকদের সঙ্গে পদোন্নতি নিয়ে বর্তমান সংকটের মূল কারণ কী?
শিক্ষকেরা ২০১৫ সালে তৈরি করা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালার ভিত্তিতে পদোন্নতি চাচ্ছেন। কিন্তু সরকার ২০১৭ সালে একটা নতুন 'স্ট্যান্ডার্ড' নীতিমালা তৈরি করে। আগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের মতো করে নীতিমালা তৈরি করতো, একেক বিশ্ববিদ্যালয় একেক রকম। আমরাও ২০১৫ সালে করেছিলাম। এটাকে ইউনিফাইড করার জন্য, বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার মানে টিচারদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে তৈরি করেছিল। দীর্ঘদিন ওয়েবসাইটে দিয়ে রেখেছিল। কারো কোন আপত্তি আছে কিনা?
এই নীতিমালার পরবর্তী প্রক্রিয়া কী ছিল?
পরে ২০২১ সালে এই নীতিমালাটা ইউজিসি হয়ে মন্ত্রণালয় থেকে পাস হয়। তখন সরকার একটা পরিপত্র জারি করে যে শিক্ষক নিয়োগ এবং পদোন্নতির ন্যূনতম যোগ্যতার নির্দেশিকা হবে এটি। এর ওপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে যার মত করে নীতিমালা তৈরি করে নিবে।
অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় কি এই নীতিমালা অনুসরণ করেছে?
ওই নির্দেশিকা বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সবাই মেনে নিয়েছে। আমার জানামতে, তিন বিশ্ববিদ্যালয় এটা মানেনি। তার মধ্যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় একটা।
সবকিছু নিয়ম নীতির মধ্যে না করলে এই টিচারগুলো ভবিষ্যতে বিপদে পড়বেন। উনারা একটা ঘোরের মধ্যে আছেন। আমি হয়তো থাকব কি থাকবো না। কিন্তু পরবর্তীতে উনারা বিপদে পড়বেন পেনশনের সময় যেয়ে। তখন দেখবেন যে পাশে আর কেউ থাকবে না। তখন তো একা হয়ে যাবে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৫ সালের নীতিমালা নিয়ে কী সমস্যা রয়েছে?
আমাদের ২০১৫ সালের যে নীতিমালা আছে, সেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাডপ্ট করা। এই নীতিমালায় বিভিন্ন রেওয়াত দেওয়া আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই ওই নীতিমালা বাদ দিয়ে অভিন্ন নীতিমালায় অনেক আগেই চলে গেছে। কিন্তু আমরা আগের জায়গাতেই রয়ে গেছি। ওই রেওয়াতের ভিত্তিতেই প্রমোশন চাওয়া হচ্ছে।
আপনি দায়িত্ব নেওয়ার পর কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?
আমি আসার পর পরে দেখেছিলাম, আমাদের একটা নীতিমালা আছে এবং ২০১৫ সালের ওই নীতিমালার আলোকে আমি বোর্ড বসিয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে আমাকে ইউজিসি থেকে একটা শক্ত চিঠি দেয়। চিঠিতে সুস্পষ্ট তিনটা পয়েন্ট দিয়ে আমাকে বলে অভিন্ন নীতিমালার আলোকে প্রমোশন দিতে হবে। এর প্রেক্ষিতে আমি গত সিন্ডিকেটে নীতিমালা প্রণয়ন বিষয়ে আমরা আলাপ আলোচনা করেছি। সিন্ডিকেট মেম্বাররা একটা ডিসিশন দেয় যে এক মাসের মধ্যে সংবিধি প্রণয়ন করে নিয়ে যেতে হবে। আগামী ২৮ তারিখে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভা আছে, পরের সিন্ডিকেটে ওইটা প্রণয়ন করে নিয়ে যেতে হবে।
তাহলে প্রক্রিয়াটি এগোচ্ছে না কেন?
কিন্তু মুশকিল হচ্ছে সংবিধি প্রণয়নের যে কমিটি করে দেওয়া হলো, সেই কমিটির টিচাররা ম্যাক্সিমামই সব পদত্যাগ করেছেন। এখন শিক্ষকেরা পদত্যাগ না করে দ্রুত আমাকে সহযোগিতা করলে আমি সংবিধি পাস করে নিয়ে আসতে পারবো। তখন শিক্ষকদের পদোন্নতি বা প্রমোশনগুলো দ্রুত চালু হবে।
শাটডাউনের কারণে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি নিয়ে আপনার অবস্থান কী?
আমি শিক্ষকদের কাছে অনুরোধ রেখেছি অনেক ছাত্ররা আছে, অনার্স পরীক্ষা দিচ্ছেন অন্তত তাদের পরীক্ষাগুলো চালু রাখার জন্য। একই সঙ্গে অনেক শিক্ষার্থীরা আছে যাদের সার্টিফিকেট মার্কশিটগুলার দরকার। তাদের জন্য আমি বিশেষ ব্যবস্থায় সার্টিফিকেট মার্কশিট দেওয়ার জন্য কন্ট্রোলার সেকশনে বিশেষ ব্যবস্থা করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি।
শিক্ষকদের দাবি—অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম আইনি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?
এটা একটা ধুমজালের সৃষ্টি করতেছে। এটা আসলে উনাদের দাবি মূল দাবি হচ্ছে পদোন্নতি বা আপগ্রেশন। এখন এইটা যেহেতু আপনারা দেখছেন যে মিডিয়াতে এটা ভালোভাবে নিচ্ছে না। সেজন্য এটা বলছেন। সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করি, আমি একজন শিক্ষক, আমি খাতা দেখেছি। ৩০-৩২ বছরের শিক্ষকতা জীবনে অনেক পরীক্ষার খাতা দেখেছি। এখন আমি একটা অন্যায় করলাম অন্যায়ের ফলে আমার চাকরি চলে গেল বা জেল হলো বা ফাঁসি হলো। তার মানে কি আমি সারাজীবন যে সমস্ত খাতা দেখেছি সে কি অবৈধ হয়ে গেল?
নতুন শিক্ষক নিয়োগ আটকে থাকার কারণ কী?
এইটা খুবই স্পষ্ট। আমাদের নয়টা শিক্ষক তো নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, ধারাবাহিকভাবে আরো ২৪ টা শিক্ষক লেকচারার নিয়োগের বিষয়টা ইউজিসির ফুল কমিশন মিটিং থেকে অলরেডি পাশ হয়ে আছে। প্রায় ছয় মাস আগেই পাস হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই যে পদোন্নতি নিয়ে যে জটিলতা দেখা দিয়েছে এই জটিলতার কারণে সমস্যার সমাধান না করলে ওরা আমাদের অফিস আদেশটা এখনো দিচ্ছে না। পদোন্নতিত বিষয়টা সমাধান হয়ে গেলে তখন ওগুলো সবই সমাধান হয়ে যাবে।
প্রচলিত নীতিমালার অধীনে অন্তত একটি পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব কি?
অভিন্ন নীতিমালার মধ্যে একটা নয় নম্বর ক্লজ আছে। নয় নম্বর ক্লজে বলা আছে যে অভিন্ন নীতিমালা আমরা যদি এডপ্ট করি তাহলে নয় নম্বর ক্লজের অধীনে একটা পদোন্নতি প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী পাবে। ধরেন উদাহরণ হিসাবে কাউকে আমি বিয়ে করিনি। কিন্তু আমি তাকে কি বউ বলতে পারি? তো আমি অভিন্ন নীতিমালা এখনো মেনেই নিইনি। আমি নয় নম্বর ক্লজের সুবিধা চাচ্ছি।
সিলেকশন বোর্ড হওয়ার পরও পদোন্নতি কেন চূড়ান্ত হয়নি?
২০১৫ সালের নীতিমালা অনুযায়ী আমি তাদের বোর্ড গঠন করেছিলাম। প্রমোশন দেওয়ার জন্যই তো করেছি। সদিচ্ছা আছে বলেই তো করেছি, তাই না? তখন পত্রপত্রিকায় আপনারা লেখা লেখি করলেন ফ্যাসিস্টদের দোষরদের পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা করছি। তাও তো আমি যুদ্ধ করে বোর্ড করেছি। পরে ইউজিসি চিঠি দিয়ে ২৪ জনের সমস্ত কাগজপত্র ইউজিসিতে পাঠিয়ে দিতে বলে। ইউজিসির সিদ্ধান্ত মোতাবেক কাজ করতে হবে। এখন এই চিঠি দেওয়ার পরে আমার কি সুযোগ আছে? আইনগতভাবে আমার আর কোন সুযোগ নাই। এরপরেও যদি আমি কোন কিছু করতে চাই, আমি আইনের ব্যত্যয় ঘটাব। তার জন্য আমার ব্যক্তিগতভাবে শাস্তি হবে। শুধু ব্যক্তিগত শাস্তি না, যারা প্রমোশন নেবে তারাও ভবিষ্যতে শাস্তির আওতায় আসবে। পেনশনের সময় সব টাকা কেটে রেখে দেবে।
নিচের ধাপের পদোন্নতিগুলো দ্রুত দেওয়া সম্ভব কি?
ইউজিসি থেকে দেওয়া চিঠির এক নম্বরে পরিষ্কার লেখা আছে, অভিন্ন নীতিমালার আলোকে নীতিমালা প্রণয়ন করার পরেই আমরা এই ধরনের প্রমোশনের কার্যক্রম করতে পারব। আমরা নীতিমালা প্রণয়ন করে যতদ্রুত ইউজিসিতে পাঠাতে পারবো, তত দ্রুতই সমস্যার সমাধান আসবে। আমরা আবার পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করতে পারবো।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
সবকিছু নিয়ম নীতির মধ্যে না করলে এই টিচারগুলো ভবিষ্যতে বিপদে পড়বেন। উনারা একটা ঘোরের মধ্যে আছেন। আমি হয়তো থাকব কি থাকবো না। কিন্তু পরবর্তীতে উনারা বিপদে পড়বেন পেনশনের সময় যেয়ে। তখন দেখবেন যে পাশে আর কেউ থাকবে না। তখন তো একা হয়ে যাবে।