কিডনির ব্যয়বহুল চিকিৎসা
ছাদখোলা গাড়ি উদ্বোধনকালে চিকিৎসকরা © সংগৃহীত
শুরুতেই কিডনি রোগ চিহ্নিত না হলে রোগীর জন্য অনেক বড় ক্ষতি বলে মন্তব্য করেছেন কিডনি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ব্যয়বহুল চিকিৎসা হওয়ার কারণে ৮০ ভাগ রোগীই চিকিৎসা অভাবে বা বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বরণ করেন। এজন্য বছরের অন্তত একবার হলেও কিডনি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
আজ রবিবার (৮ মার্চ) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) বটতলায় বিশ্ব কিডনি দিবস উপলক্ষে কিডনি রোগ সচেতনতামূলক ভ্রাম্যমান ছাদখোলা গাড়ির উদ্বোধনকালে তারা এ কথা বলেন। বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম ছাদখোলা গাড়ির উদ্বোধন করেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এক সপ্তাহব্যাপী কিডনি রোগ সচেতনতার জন্য এই গাড়ির উদ্বোধন করা হয়েছে।
উদ্বোধনকালে অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, কিডনি নীরবঘাতক। উপসর্গ দেখার আগেই কিডনির নিয়মিত পরীক্ষা করানো উচিত। এ রোগের চিকিৎসা— যেমন ডায়ালাইসিস, ট্রান্সপ্ল্যান্ট অনেক ব্যয়বহুল। একটি পরিবারে কিডনি চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা। তাই শুরুতেই কিডনি রোগ চিহ্নিত করা উচিত।
তিনি বলেন, কিডনি রোগ শুরুতে চিহ্নিত করা গেলে এ রোগ নিরাময় ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কিডনি রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। প্রতিরোধে জনসচেতনা সৃষ্টির বিকল্প নাই। সে কারণেই আজকে কিডনি রোগ সচেতনতামূলক ভ্রাম্যমান ছাদখোলা গাড়ির শুভ উদ্বোধন করা হল।
অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব ডা. মো. ফরহাদ হাসান চৌধুরী বলেন, গত এক দশকে কিডনি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দিগুণ হয়েছে। কিডনি রোগের উপসর্গ নিয়ে যখন রোগী চিকিৎসকের কাছে যান, তখন তার কিডনী তিন ভাগের এক ভাগ অকার্যকর হয়ে যায়। তখন রোগ নিরাময়, নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বছরে একবার হলেও কিডনি রোগের পরীক্ষা করা উচিত। ইউরিন আর ই, ক্রিয়েটিনিনের মত সাধারণ পরীক্ষা ২ শত থেকে ৩ শত টাকা খরচ করলেই কিডনিতে সমস্যা আছে কিনা তা জানা যায়। জনগণকে এই বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
অন্যান্য বক্তারা বলেন, কিডনি মানবদেহের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। শরীরে বিপাকের মাধ্যমে যে ময়লা ও দূষিত পদার্থ তৈরি হয় তা কিডনির মাধ্যমে প্রস্রাবের সাহায্যে বের হয়ে যায়। কিডনিকে সুস্থ রাখা এবং কিডনি রোগীদের জন্য সাহায্য ও সমর্থনের আশির্বাদ নিয়ে ২০০৬ সাল থেকে ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব নেফ্রলজি (আইএসএন) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর কিডনি ফাউন্ডেশনের (আইএফকেএফ) যৌথ উদ্যোগে সারা পৃথিবীব্যাপী মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার কিডনি দিবস পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘সুস্থ কিডনি সকলের তরে, মানুষের যত্নে বাঁচাও ধরণীরে।’
বিশেষজ্ঞরা জানান, ২০১৯ সালে প্রকাশিত ৮টি স্টাডির ওপর একটি সিস্টেমিক রিভিউয়ের মতে, বাংলাদেশে কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ২২.৪৮ শতাংশ। ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে এই তথ্যকে সঠিক ধরে নিলে কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৮২ লক্ষ এবং দ্রুত হারে এ সংখ্যা বাড়ছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, গত ১ দশকে কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই মহামারিতে প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার রোগীর কিডনি বিকল হচ্ছে
তারা বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার যে ক্ষমতা, সে অনুযায়ী এই নতুন রোগীদের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ রোগীকে ট্রান্সপ্লান্ট, ডায়ালাইসিস এবং অন্যান্য চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তার মানে প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে অথবা বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করছে। শুধু যে বাংলাদেশে এই কিডনি রোগের সংখ্যা বাড়ছে তা নয়, সারা পৃথিবীব্যাপী বর্তমানে ৮৫ কোটির বেশি মানুষ কিডনি রোগে ভুগছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দুই যুগ আগে মানুষের মৃত্যুর কারণ হিসেবে কিডনি রোগ ছিল ২৭তম স্থানে। বর্তমানে এটির স্থান অষ্টম এবং ২০৪০ সাল নাগাদ কিডনি রোগ মৃত্যুর কারণ হিসেবে পঞ্চম স্থান দখল করবে, যা মোটে কাম্য নয়।
উদ্বোধনকালে বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেজবাহ উদ্দিন নোমান, ডা. শাহনেওয়াজ দেওয়ান, কোষাধ্যক্ষ ডা. মো. আব্দুল মুকীত, সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মো. রেজাউল আলম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।