রক্তে শর্করার মাত্রা মাপার যন্ত্র (গ্লুকোমিটার) © টিডিসি ফাইল ছবি
ডায়াবেটিস বর্তমানে বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়তে থাকা একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ঝুঁকি বাড়লেও বর্তমানে কম বয়সীদের মধ্যেও ডায়াবেটিসের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাবসহ নানা কারণে এ রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে ডায়াবেটিস আসলে কী এবং কেন হয় এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই রয়েছে নানা রকমের প্রশ্ন।
ডায়াবেটিস এর অপর নাম মধুমেহ বা বহুমূত্র রোগ। এটি এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অবস্থা, যেখানে রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। খাবার থেকে পাওয়া শর্করা শরীরের প্রধান শক্তির উৎস। এই শর্করা শরীরের কোষে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ইনসুলিন নামের একটি হরমোন। আর এই ইনসুলিন তৈরি হয় অগ্ন্যাশয় থেকে।
কোনো কারণে শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে না পারলে অথবা তৈরি হওয়া ইনসুলিন ঠিকভাবে কাজ না করলে রক্তে গ্লুকোজ জমতে শুরু করে। দীর্ঘ সময় ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে ডায়াবেটিসের বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ডায়াবেটিস প্রধানত কয়েক ধরনের হয়ে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো টাইপ-১ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন তৈরি করা কোষগুলোকে নষ্ট করে দেয়। ফলে শরীরে ইনসুলিনের ঘাটতি তৈরি হয়। এ ধরনের ডায়াবেটিস সাধারণত কম বয়সে শুরু হলেও যেকোনো বয়সে হতে পারে।
অন্যদিকে টাইপ-২ ডায়াবেটিস সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে শরীর ইনসুলিন তৈরি করলেও তা যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারে না। একে ইনসুলিন প্রতিরোধ বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়। সময়ের সঙ্গে অগ্ন্যাশয়ও পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে না পারায় রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়।
টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার পেছনে অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পারিবারিক ইতিহাস ও বয়সসহ বিভিন্ন কারণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু মিষ্টি খেলেই ডায়াবেটিস হয় এ ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরিযুক্ত খাবার নিয়মিত খেলে ওজন বেড়ে যেতে পারে, আর অতিরিক্ত ওজন টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া গর্ভাবস্থায়ও কিছু নারীর ডায়াবেটিস দেখা দিতে পারে, যাকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বলা হয়। সন্তান জন্মের পর অনেকের রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক হয়ে গেলেও ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
আরও দেখুন: ইন্দোনেশিয়ায় ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প, নিহত ২০
ডায়াবেটিসের শুরুতে অনেকের তেমন কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। তবে অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অতিরিক্ত ক্ষুধা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ঝাপসা দেখা, কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া এবং ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদ্রোগ, কিডনি রোগ, চোখের সমস্যা, স্নায়ুর ক্ষতি এবং পায়ের বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিস অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। স্বাস্থ্যকর ও পরিমিত খাবার খাওয়া, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিসকে ভয় না পেয়ে সচেতন হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকি থাকলে বা কোনো লক্ষণ দেখা দিলে নিজের মতো করে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা উচিত।