ফল-সবজি ধোয়ার সঠিক নিয়ম © সংগৃহীত
তাজা ফল ও সবজি স্বাস্থ্যকর খাবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে সঠিকভাবে পরিষ্কার না করলে এগুলো থেকেই শরীরে ঢুকতে পারে বিভিন্ন জীবাণু। বিশেষ করে সাইক্লোস্পোরা সংক্রমণ ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য প্রত্যাহারের খবরের মধ্যে ফল ও সবজি নিরাপদে পরিষ্কার করার সঠিক পদ্ধতি জানা জরুরি। খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, ফল ও সবজি পরিষ্কারের ক্ষেত্রে প্রচলিত কিছু ভুল পদ্ধতি বাদ দিয়ে বিজ্ঞানসম্মত নিয়ম মেনে চলা।
ফল ও সবজি পরিষ্কারের আগে প্রথমেই হাত, কাটিং বোর্ড, ছুরি ও থালাবাসন পরিষ্কার করতে হবে। এফডিএর পরামর্শ অনুযায়ী, ফল ও সবজি ধোয়ার আগে ও পরে অন্তত ২০ সেকেন্ড উষ্ণ সাবান-পানিতে হাত ধুতে হবে। পাশাপাশি সিঙ্ক, কল, ড্রেন ও আশপাশের কাউন্টার পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা উচিত।
এরপর ফল ও সবজি পরিষ্কারের সময় ব্যবহার করতে হবে ঠান্ডা, চলমান পানি। গরম পানি ব্যবহার না করাই ভালো। কারণ কিছু ফল ও সবজির বাইরের দূষিত পদার্থ গরম পানির মাধ্যমে খোসার ভেতরে ঢুকে যেতে পারে। একইভাবে ফল ও সবজি ধোয়ার সময় সাবান, ডিটারজেন্ট বা ব্লিচ ব্যবহার করা যাবে না। এগুলোর অবশিষ্টাংশ খাবারে থেকে যেতে পারে।
যেসব ফল ও সবজি ঘষে পরিষ্কার করা যায়, সেগুলোর ক্ষেত্রে সবজি পরিষ্কারের ব্রাশ ব্যবহার করা যেতে পারে। ব্রাশের আঁশ সবজির বিভিন্ন খাঁজ ও কোণ থেকে ময়লা ও দূষক সরাতে সাহায্য করে। তবে মনে রাখতে হবে, কোনো পরিষ্কার করার পদ্ধতিই সব ধরনের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে পারে না। এগুলো জীবাণুর উপস্থিতি কমায়, সম্পূর্ণ নির্মূল করে না।
সাইক্লোস্পোরার ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরজীবী থেকে পুরোপুরি মুক্তির জন্য ফল ও সবজিকে অন্তত ১৫৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় রান্না করতে হয়। তবে কাঁচা খাওয়া ফল ও সবজির ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। শুধু ধুয়ে ফেললে উপরিভাগের কিছু ব্যাকটেরিয়া কমতে পারে, কিন্তু সাইক্লোস্পোরার মতো পরজীবী পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় নাও হতে পারে।
ই. কোলাই বা সালমোনেলার ক্ষেত্রে কোনো প্রাদুর্ভাব না থাকলে ঠান্ডা চলমান পানিতে পৃষ্ঠতল ঘষে পরিষ্কার করা এবং ৪০ ডিগ্রির নিচে ফ্রিজে সংরক্ষণ সাধারণত যথেষ্ট। তবে কোনো প্রাদুর্ভাব চললে সরকারি সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কোনো কৃষিপণ্য সাময়িকভাবে পুরোপুরি এড়িয়ে চলার পরামর্শও দেওয়া হতে পারে।
শাকসবজি
পালং শাক, লেটুস ও কেলের মতো পাতাযুক্ত সবজি দীর্ঘ সময় পানিতে ভিজিয়ে রাখা ঠিক নয়। এসব পাতার মধ্যে দূষিত পদার্থ ঢুকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বরং বাইরের পাতাগুলো ফেলে দিয়ে বাকি অংশ ঠান্ডা চলমান পানির নিচে ধুয়ে নিতে হবে। বাগান বা কৃষকের বাজার থেকে আনা শাকে বালি বা মাটি বেশি থাকলে পরিষ্কার পানিতে ঝাঁঝরিসহ কয়েকবার ডুবিয়ে নেওয়া যায়। এরপর অবশ্যই চলমান পানিতে ধুয়ে নিতে হবে।
আপেল ও শক্ত সবজি
আপেল, শসা ও স্কোয়াশের মতো শক্ত ফল ও সবজি ঠান্ডা চলমান পানির নিচে পরিষ্কার হাত অথবা সবজি ব্রাশ দিয়ে ঘষে ধুতে হবে। দোকান থেকে আনার সঙ্গে সঙ্গে ধোয়ার বদলে খাওয়ার বা রান্নার ঠিক আগে ধোয়া ভালো। এতে এগুলোর সংরক্ষণকাল বাড়ে এবং দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে। আগেভাগে ধুয়ে ফেললে পরিষ্কার কাগজের তোয়ালে দিয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে।
আপেলের গায়ে থাকা মোমের মতো আবরণ নিয়েও অতিরিক্ত চিন্তার প্রয়োজন নেই। আপেল প্রাকৃতিকভাবেই মোম তৈরি করে। ফসল তোলার পর প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় সেই আবরণ কমে গেলে উৎপাদকরা খাদ্যনিরাপদ মোম ব্যবহার করেন। এফডিএর নিয়ম মেনে ব্যবহৃত হলে এই আবরণ খাওয়ার জন্য নিরাপদ।
বেরি ও নরম খোসাযুক্ত ফল
স্ট্রবেরি, রাস্পবেরি, টমেটো ও পাকা পীচের মতো নরম ফল সহজে থেঁতলে যায়। তাই এগুলো পরিষ্কারের সময় ব্রাশ ব্যবহার করা উচিত নয়। নষ্ট বা সন্দেহজনক অংশ ফেলে দিয়ে ফলগুলো ঝাঁঝরিতে রেখে ঠান্ডা চলমান পানিতে ধুতে হবে।
মূলজাতীয় সবজি, তরমুজ ও খোসা ছাড়ানো ফল
আলু, গাজর, তরমুজ ও পেঁপের মতো ফল ও সবজি সবজি পরিষ্কারের ব্রাশ দিয়ে ঠান্ডা চলমান পানির নিচে ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করতে হবে। এমনকি যেসব ফল বা সবজির খোসা পরে ফেলে দেওয়া হবে, সেগুলোকেও আগে ধুতে হবে। কারণ কাটার সময় খোসার বাইরের ময়লা ও জীবাণু ছুরির মাধ্যমে ভেতরের অংশে চলে যেতে পারে। ধোয়া শেষে ব্রাশটিও পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করে রাখা উচিত।
ভেষজ
ধনেপাতা, পার্সলেসহ বিভিন্ন ভেষজ ব্যবহারের ঠিক আগে ধুয়ে নেওয়া ভালো। এগুলো ঝাঁঝরিতে রেখে ঠান্ডা চলমান পানিতে ধুতে হবে এবং হাত দিয়ে উল্টেপাল্টে পরিষ্কার করতে হবে। প্রয়োজন হলে পানিতে ডুবিয়েও পরিষ্কার করা যায়। ধনেপাতা ও পার্সলেতে সাইক্লোস্পোরা সংক্রমণের সন্দেহের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তাই পণ্য প্রত্যাহার ও সরকারি সংস্থার নির্দেশনার দিকে নজর রাখা জরুরি।
আঙুর ও চেরি
আঙুর ও চেরির মতো ছোট ফলের খাঁজ ও কোণ বেশি থাকলেও এগুলো দীর্ঘ সময় পানিতে ভিজিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। বরং খাওয়ার ঠিক আগে ঠান্ডা চলমান পানিতে ধুয়ে নিতে হবে। ঝাঁঝরিতে রেখে পানি ছিটিয়ে বা পানির ধারার নিচে ধরে পরিষ্কার করা যায়। পরিষ্কার হাত দিয়ে আলতোভাবে ঘষে ধোয়ার পর পানি ঝরিয়ে নিতে হবে।
আরও দেখুন: এআই দিয়ে গবেষণায় বাড়ছে মানবসৃষ্ট মহামারির শঙ্কা
মাশরুম
মাশরুমও ব্যবহারের ঠিক আগে ঠান্ডা চলমান পানিতে ধুয়ে নেওয়া যেতে পারে। স্প্রেয়ার দিয়ে পানি দেওয়া এবং আঙুল দিয়ে আলতোভাবে ঘষে ময়লা সরানো উপকারী। ধোয়ার পর পরিষ্কার কাগজের তোয়ালে দিয়ে আলতোভাবে মুছে শুকিয়ে নিতে হবে।
ব্রকলি ও ফুলকপি
ব্রকলি ও ফুলকপি ঠান্ডা চলমান পানিতে ভালোভাবে ধুতে হবে। সবজির মাথা উল্টো করে ধরলে পানি এর খাঁজগুলোর ভেতর ভালোভাবে পৌঁছাতে পারে। বাগান থেকে সদ্য তোলা ব্রকলি বা ফুলকপিতে পোকা থাকলে এক গ্যালন পানিতে চার টেবিল চামচ লবণ মিশিয়ে কয়েক মিনিট ভিজিয়ে নেওয়া যেতে পারে। এরপর অবশ্যই ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।
বেকিং সোডা, ভিনেগার ও বিশেষ ধোয়ার তরল কি দরকার?
খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অ্যামি জনস্টন বলেন, ‘ঠান্ডা চলমান পানিতে ধুয়ে ও ঘষে পরিষ্কার করার চেয়ে বেকিং সোডা, ভিনেগার বা ফল-সবজি ধোয়ার বিশেষ তরল বেশি কার্যকর এমন প্রমাণ নেই। এসব উপকরণ জীবাণুনাশকও নয়। তাই শুধু ফল ও সবজি পরিষ্কারের জন্য বাড়তি অর্থ খরচ করার প্রয়োজন নেই।’
স্টিভ ওয়াগনার (ওয়াগনার রিস এলএলপি) জানান, সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় বেকিং সোডা শুধু পানি বা অন্য দ্রবণের তুলনায় ফলের খোসার ওপরের কীটনাশক অপসারণে বেশি কার্যকর হতে পারে বলে দেখা গেছে। কিন্তু খোসার গভীরে ঢুকে যাওয়া কোনো পদার্থ শুধু বেকিং সোডায় ভিজিয়ে সহজে দূর করা যায় না। এ বিষয়ে গবেষণা এখনও চলমান। তাই সরকারি সংস্থা ও খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা ফল ও সবজি পরিষ্কারের ক্ষেত্রে ঠান্ডা চলমান পানির ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছেন। তথ্যসূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট।