শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী
স্কুল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান © সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে একটি জ্ঞানভিত্তিক টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, সামনে ভবিষ্যৎ তোমাদের। দেশটা গড়ে তুলতে হবে তোমাদেরকে। আমরা হয়ত চেষ্টা করতে পারি, শুরু করে দিয়ে যেতে পারি কিন্তু এটাকে চালিয়ে নিতে হবে তোমাদের।
সোমবার (২৯ জুন) বিকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের যৌথ আয়োজনে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সারা দেশে মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় স্টার্টআপ, বিজ্ঞান প্রকল্প ও উদ্ভাবনী আইডিয়া প্রদর্শনীরও উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীদের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। পরে তিনি প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিজ্ঞান প্রকল্প, স্টার্টআপ উদ্যোগ ও উদ্ভাবনী আইডিয়া পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার প্রশংসা করেন এবং এসব উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিতে সরকারের সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
প্রধারমন্ত্রী তারেক রহমান প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে প্রতি বছর একটি করে গাছের চারা রোপনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, অনুষ্ঠান স্থলে আসার আগে আমি বাইরে একটা বৃক্ষরোপন করেছি। আমার সাথে সারা বাংলাদেশে অনলাইনে ২৯ হাজার ৬শ বিভিন্ন জায়গায় কানেকটেড ছিলো। প্রত্যেকটি জায়গায় আজকে প্রত্যেকে তিনটা করে কাজ লাগিয়েছে…টোটাল ৯০ হাজার মত গাছের চারা একদিনের লাগানো হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা সরকার থেকে তোমাদের জন্য যেসব সুযোগ দেবো যাতে তোমরা খুব কনফিডেন্ট হয়ে গড়ে উঠতে পারো। তোমরা কনফিডেন্ট থাকলে আমি কনফিডেন্ট হয়ে যাবো, আমার জোর বেড়ে যাবে তখন। তার বিনিময়ে তোমাদের কাছে আমি একটা জিনিস চাইছি। দেবে আমাকে?....খুব সিম্পল। জিনিসটা হচ্ছে তোমাদের সবাইকে প্রত্যেক বছর একটা করে গাছ লাগাতে হবে, একটা করে গাছ রোপন করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তুমি যেখানে থাকো, তুমি যেখানে মাঠে খেলো, তুমি যে বাসায় থাকো অথবা যেখানে থাকো, যেই স্কুলে পড়ো, যেই কলেজে পড়ো, ওখানে কোন এক জায়গায় প্রত্যেকে একটা করে প্রতিবছর একটা করে গাছের চারা রোপণ করবে।
এই সময়ে শিক্ষার্থীদের কাছে এই কাজটি করতে পারবে কিনা জানতে চাইলে গ্যালারি বসা শিক্ষার্থী ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দেয়। কেন বৃক্ষ রোপন করতে হবে তার ব্যাখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই দেশে তো আমাদের সবাইকে থাকতে হবে…তাই না? এই দেশে যদি আমরা সবাই থাকি তাহলে আমাদেরকে বুক ভরে শ্বাস নিতে হবে। দেখো তোমরা তো বিভিন্ন রকম আর্টিকেলস পড়ো, এই আর্টিকেলসের মধ্যে তোমরা নিশ্চয়ই পড়েছো যে, আমাদের বর্তমানে জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়াতে, গাড়ি-ঘোড়া সবকিছু বেড়ে যাওয়াতে গাছপালা অনেক কেটে ফেলতে হয়েছে। ফলে আমাদের বাতাস কিন্তু অনেক পলিউটেড হয়ে গিয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা যদি এখন এই মুহূর্তে যদি এটার ব্যাপারে ব্যবস্থা না নেই তাহলে আমরা-একসময় পরিষ্কার বাতাস-বিশুদ্ধ বাতাস শ্বাস হিসেবে নিতে পারব না। সেইজন্য আজকের এই অনুষ্ঠানকে যদি সত্যিকারভাবে ফ্রুটফুল করতে চাই তাহলে আজকে এই রিকোয়েস্টটা আমি তোমাদের কাছে করছি এবং তুমি তোমার নিজের জন্য একটা করে গাছ রোপন করবে।
তারেক রহমান বলেন, তুমিও বড় হবে, গাছটাও বড় হবে। দেখবে গাছটা তোমার সবচেয়ে বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে দেখা দিবে একসময়। ওই গাছের সাথে তুমি কথা বলতে পারবে। তোমরা কথা বলো গাছের সাথে? আমি কিন্তু গাছের দিকে তাকিয়ে থেকে কিন্তু চিন্তা করি। জানো? আমি ঢাকায় যেখানে থাকি ওখানেও বড় বড় গাছ আছে। আমি লন্ডনে যেই বাসাতে থাকতাম ওখানে আশেপাশে অনেক বড় বড় গাছ ছিল এবং আমি মাঝে মাঝে গাছের দিকে তাকিয়ে থেকে সারাদিন তাকিয়ে থেকে হাঁটতাম জানো। এটা একটা ডিফারেন্ট ফিলিং কিন্তু যখন বড় গাছ দেখবে। খুব সুন্দর লাগে দেখতে।
তিনি বলেন, যখন বাতাস হয় যখন গাছটা নড়াচড়া করে গাছটা দেখতে তখন খুব সুন্দর লাগে অদ্ভুত একটা ভালো লাগার ফিলিং থাকে। আমার বিশ্বাস তোমরা যখন একটি গাছকে চারা রোপণ করবেন গাছটা যখন বড় হবে তোমরা এই ফিলিংটি তোমরাও পাবে। ওই গাছের দিকে তাকিয়ে তুমি অনেক কিছু ভাবতে পারবে, অনেক পরিকল্পনা করতে পারবে। আমি করি তোমাদের সাথে শেয়ার করলাম আমার একটা সিক্রেট কথা। আমি কিন্তু গাছের দিকে তাকিয়ে থেকে অনেক পরিকল্পনা করি, অনেক কিছু চিন্তা করি।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য ঢাকার সেন্ট জোসেফ উচ্চ বিদ্যালয়, মেহেরপুরের সন্ধানী স্কুল ও কলেজ, দিনাজপুর সরকারি কলেজ, দিনাজপুর ক্যান্টনমন্ট পাবলিক স্কুল এ্যান্ড কলেজ, ঢাকার আদমজী ক্যান্টমেন্ট কলেজ, নীলফামারীর শরীফাবাদ স্কুল এ্যান্ড কলেজ, চট্টগ্রামের ফুলকি সহজপাঠ বিদ্যালয়, কুষ্টিয়া জেলা স্কুল, নড়াইল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, পটুয়াখালীর গলা চিপার আলিম মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর ‘উদ্भावনী মেধাবী পুরস্কার’ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিনী জুবাইদা রহমান। এই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সেন্ট জোসেফ উচ্চ বিদ্যালয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমানকে স্মারক ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
‘আশ-পাশের জায়গা পরিস্কার রাখতে হবে’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবার আগে বাংলাদেশ। কারণ তোমাদের মত ভবিষ্যৎ যেই দেশে থাকে সেই দেশকে এত টেনশন করতে না, সেই দেশকে এত চিন্তা করতে না। শুধু দরকার ডিসিপ্লিন। আমি বলতে চাই, তোমাদের সকলকে কিন্তু ডিসিপ্লিন হতে হবে। নিশ্চয়ই সোশ্যাল মিডিয়া বা পত্রপত্রিকা টিভিতে দেখেছো, আমি নিজে অনেকবার বলেছি….এখানে বিএনসিসি তোমরা যারা আছো তোমাদের সবার কাছে আরেকটি হেল্প চাই আমি। সেই হেল্পটা হচ্ছে, আমরা যেই জায়গায় থাকি আমরা যেই পরিবেশে থাকি তা পরিস্কার রাখতে হবে। আমরা যখন বিদেশে দেখি, টিভিতে দেখি বা কোন ডকুমেন্টে দেখি আমরা দেখি যে সেই দেশগুলো কিন্তু খুব পরিষ্কার, রাস্তাঘাট সবকিছু বাগান সবকিছু খুব পরিষ্কার।
তিনি বলেন, চলো যাই আমরা দেখি আমাদের বাইরের রাস্তাগুলো অনেক ময়লা। এটা তো বাইরে থেকে এসে কেউ ময়লা করছে না। আমরা তো নিজেরাই ময়লা করছি, তাই না? আমরা নিজেরাই ময়লা করছি। আমরা কি সবাই মিলে পরিষ্কার রাখতে পারি না আমাদের দেশটাকে? সবাই মিলে কি আমরা আমাদের রাস্তাঘাট বিভিন্ন পাবলিক প্লেস যেগুলো আছে আমরা পরিষ্কার রাখতে পারি না? পারি। তোমরা কি এই হেল্পটা আমাকে করবে?
শিক্ষার্থীরা সমস্বরে ‘হ্যাঁ’সূচক জবাব দিলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাহলে আমরা এখন থেকে সবাই মিলে একটা কাজ করার চেষ্টা করবো। আমাদের আশেপাশে কেউ যদি কোন পাবলিক প্লেসে ময়লা ফেলে, জায়গাটা ময়লা হয় আমরা পরিষ্কার করব ওটা যতটুকু সম্ভব। যে ময়লা ফেলছে তাকে আমরা বলব, এই কাজটা করা অন্যায়। তাকে আমরা লজ্জা দিব যে এই পাবলিক প্লেসে ময়লা ফেলতে হয় না। সেটা কাগজ হোক, খাবার দাবার হোক যেটাই হোক আমরা তাকে লজ্জা দিব, এইখানে ময়লা ফেলে যায় না, ময়লা ফেলতে হয় না। আমরা সবাই মিলে একটা সুন্দর বাংলাদেশ চাই। কিন্তু আমরা যদি চেষ্টাই না করি কেমন করে বাংলাদেশ সুন্দর হবে?
‘চেষ্টা তো তোমাদেরকে করতে হবে’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের কিন্তু মোটামুটি দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমার ৬০ বছর বয়স হয়ে গেছে…। সময় এখন তোমাদের। সামনে ভবিষ্যৎ তোমাদের। দেশটা গড়ে তুলতে হবে তোমাদেরকে। আমরা হয়ত চেষ্টা করতে পারি, শুরু করে দিয়ে যেতে পারি কিন্তু এটাকে চালিয়ে নিতে হবে তোমাদের।
তিনি বলেন, আমরা যদি শুধু বলে থাকি সিটি কর্পোরেশন পরিষ্কার করবে, পৌরসভা পরিষ্কার করবে। দেখো তুমি যদি নিজের বাড়ির কথাও চিন্তা করো…তুমি যেই ঘরটাতে থাকো ওই ঘরটাতে বাসার সবাই এসে যদি ময়লা করে তুমি তাহলে কতবার পরিষ্কার করবে? তুমি কি প্রতিবার পরিষ্কার করতে পারবে? পারবে না। সবাই মিলে যদি পুরা ঘরের সবগুলো ঘর যদি আমরা পরিষ্কার রাখি তাহলে তো বাসাটা পরিষ্কার থাকছে তাই না?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঠিক দেশটাও এরকম। দেশটা আমাদের যেহেতু সবার। আমাদের সবাইকে মিলে পরিষ্কার রাখতে হবে। আসো, আমরা যদি পরিবেশটাকে ঠিক রাখি, আমরা যদি ঘরের মত করে নিজের এলাকাটাকে পরিষ্কার রাখি, আমরা যদি নিজের ঘরের মত আশেপাশে আমাদের বাসা-বাড়িতে যেরকম মোটামুটি সুন্দর গাছ লাগানো থাকে, এভাবে যদি আমরা গাছের সংখ্যা বাড়াতে পারি তাহলে কি হবে? আমাদের পুরো পরিবেশটা ফ্রেশ হবে এবং সেই সুন্দর পরিবেশে তোমরা বসে আরো নতুন নতুন ইনোভেটিভ জিনিস তোমরা চিন্তা করতে পারবে, নতুন নতুন ইনোভেট করতে পারবে, তোমরা নতুন জিনিসপত্র তোমরা বানাতে পারবে এবং নতুন নতুন পরিকল্পনা করতে পারবে। যেটি তোমাদের উপকার হবে, যেটি দেশের উপকার হবে। যেটি দেশের মানুষের উপকার হবে।
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্টার্টআপ উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠান স্থলে প্রবেশের পর বিএনসিসির একটি চৌকশ দল প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। পরে তিনি গার্ড পরিদর্শন করেন এবং তাদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সারা দেশে মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং জাতীয় স্টার্টআপ, বিজ্ঞান প্রকল্প ও উদ্ভাবনী আইডিয়া প্রদর্শনীরও উদ্বোধন করেন। পরে সম্মেলনে মূল অনুষ্ঠানে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী।