তারেক রহমান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান © টিডিসি ফটো
দেশের মানুষ অতীতের বিতর্ক নয়, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা শুনতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, অতীতের ভালো-মন্দ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পরিবর্তে এখন সময় সামনে এগিয়ে যাওয়ার। একই সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে তিনি ‘জীবনবান্ধব’ বাজেট হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘এ সেশনে আমরা যে বাজেট উপস্থাপন করছি সরকারি দলের সদস্য হিসেবে একে আমি একটি নামকরণ করতে চাই। আর সেটি হচ্ছে এ বাজেট ‘জীবনবান্ধব’।’
দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও বেশি আলোচনা করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি, অনেক বক্তব্য রেখেছি। অতীতে ভালো-মন্দ কি হয়েছে আমি সে বিতর্কে আর যাবো না। আমাদেরকে অবশ্যই সামনে চলতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে একটি চিত্র আমরা বারবার দেখেছি। সেটি হচ্ছে আমরা যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে যাই তখন অনেক বেশি অতীত নিয়ে কথা বলি। অথচ দেশের প্রত্যেকটি মানুষ চায়, আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলি।’
সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। বাজেটের সমাপনী আলোচনায় প্রথমে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং পরে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেন।
রাষ্ট্র পরিচালনায় বাজেটের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাস্তবতা অনেক কঠিন। তারপরেও বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে যে বাজেটটি আমরা এখানে উপস্থাপন করেছি, অবশ্যই আমরা চেষ্টা করেছি আমাদের সর্বোচ্চ বুদ্ধি, বিবেক ও জ্ঞান দিয়ে এমন একটি বাজেট উপস্থাপন করতে যাতে শ্রেণী-পেশা ও সমাজের সকল মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তির শ্বাস ফেলতে পারে।’
তিনি বলেন, বাজেট ঘোষণার পরও এবার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায়নি। অতীতে বাজেটের আগে ও পরে অনেক পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যেত বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা অতীতে লক্ষ্য করেছি যে বাজেট উপস্থাপনের আগে ও পরে অনেক নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম হঠাৎ করে কোন কারণ ছাড়াই বেড়ে যেত। তবে এ বছর আমরা সেরকম কোন দৃশ্য দেখিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিত্য প্রয়োজনীয় বলতে আমরা সাধারণত যা বুঝে থাকি এরকম ৬১টি পণ্যের ওপর থেকে পূর্বের নির্ধারিত ট্যাক্স প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।’
সরকারের দায়িত্ব পালনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে, রাজনৈতিক সরকার হিসেবে আমরা মনে করি আমাদের জনগণের প্রতি যে দায়িত্ব তার একটু হলেও আমরা হয়ত পূরণ করতে পেরেছি। কিছুটা হলেও আমরা জনগণকে স্বস্তি দিতে পেরেছি।’
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতির যে অবস্থা ছিল, সেটিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমাদের সকলের জানা আছে গতকালকেও এখানে বিরোধী দলের চিফ হুইপ তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছিলেন, কোন প্রেক্ষাপটে এই সংসদ, এই সরকার গঠিত হয়েছে। আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব যখন গ্রহণ করেছিলাম তখন একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছিলাম। তার ভেতরে দুর্নীতি, লোপাট, অব্যবস্থাপনা এবং ভুলনীতির কারণে দেশের অর্থনৈতিক খাত সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসস্তুপ হয়ে গিয়েছিল। এই অবস্থা থেকে আমরা অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিরোধীদলের নেতাও বলেছেন আগে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছিল, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবেও যেটি স্বীকৃত। দেশের উৎপাদন এবং বিনিয়োগ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। মূল্যস্ফীতি কি অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল আজ থেকে দুই আড়াই বছর আগে সেটি বোধহয় আমরা সকলেই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম।’
পুঁজিবাজার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির অবনতির কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘পুঁজিবাজার অর্থনীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত। এই খাত এমন অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছিল মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে আত্মহত্যাও করেছিল। হাজার কোটি টাকা পাচার ও অপচয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কি ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছিল সেটি নিশ্চয়ই কারো অজানা নয়। টাকার যে এক্সচেঞ্জ এটি ৪০ শতাংশ নেমে গিয়েছিল।’
পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বেশ কিছু ভ্যানিটি প্রজেক্ট গ্রহণ করার মাধ্যমে অহেতুক দেশী বিদেশী ঋণ গ্রহণ করা হয়েছিল যা এখন জাতির ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখান থেকে রেভিনিউ কালেক্ট হয় না। ফলে বাইরে থেকে টাকা দিয়ে এই বৈদেশিক ঋণগুলোকে শোধ করতে হচ্ছে এবং শুধু অল্প সময় না লম্বা একটি সময় ধরে আগামীতে হয়তো জাতিকে এই বোঝা টানতে হবে।’
তবে সংকটকে অজুহাত বানাতে চান না বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সংক্ষেপে যে সংকটের কথা আমি বললাম একে অস্বীকার করতে চাই না। অস্বীকার করে আমরা থাকতেও পারবো না। এটি বোকামি হবে। তবে একই সাথে সংকটকে আমরা অজুহাত বানাতে চাই না। সেজন্যই বিরোধী নেতার সাথে আমি সম্পূর্ণভাবে একমত। আমরা জনগণকে সাথে নিয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর নীতির মাধ্যমে সফলভাবে এ সংকট মোকাবিলা করতে চাই।’
সরকারের শুরু থেকেই একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৮ ফেব্রুয়ারি। যাত্রা শুরু করার সাথে সাথেই আমাদেরকে রমজান সামাল দিতে হয়েছে। যাতে করে নিত্য প্রয়োজনীয় সকল কিছু মানুষের ক্রয় ক্ষমতার ভেতরে অন্তত থাকে। যতটুকু সম্ভব একই সাথে ভঙ্গুর অর্থনীতির সংক্ষিপ্ত যে চিত্র আমি তুলে ধরলাম, যা সম্পর্কে আমাদের প্রত্যেকের কমবেশি ধারণা আছে তাও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আমরা আশা করি আমাদের সম্মিলিত চেষ্টায় এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারব।’
প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেওয়ার সময় সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে তাকে অভিনন্দন জানান।