নির্বাচন কমিশন © সংগৃহীত
'সকালে গেছিলাম ট্রেন স্টেশনে, টিকিট পাই নাই। সেখান থেকে এই বাস টার্মিনালে আসছি, কিন্তু বাসেও সিট পাচ্ছি না,' বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মিরপুরের একটি পোশাক কারখানার কর্মী তাজুল ইসলাম।
কারখানা ছুটি হওয়ায় মঙ্গলবার সকালে পরিবার-পরিজন নিয়ে টাঙ্গাইলের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন মি. ইসলাম। মহাখালী বাস টার্মিনালে যখন তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল, ঘড়ির কাঁটায় তখন সময় প্রায় বেলা ১২টা।
বাসে সিটের অপেক্ষায় মি. ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যরা ইতোমধ্যেই দেড় ঘণ্টার বেশি সময় করে ফেলেছেন। দিনের আলো থাকতে গ্রামে পৌঁছাতে পারবেন কি-না, সেটিও নিশ্চিত নন।
'তারপরও গ্রামে যাচ্ছি, কারণ অনেক বছর ভোট দিতে পারি নাই। এবার নিজের ভোটটা দিতে চাই,' বলেন মি. ইসলাম।
১২ই ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে সরকারি নির্দেশে মঙ্গলবারেই বন্ধ হয়ে গেছে শিল্প-কারখানা। বুধ-বৃহস্পতিবার সাধারণ ছুটি, সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শুক্র-শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি।
লম্বা এই ছুটিতে অনেকে ঢাকা ছাড়তে শুরু করায় মঙ্গলবার সকাল থেকেই যাত্রীদের চাপ লক্ষ্য করা গেছে শহরটির বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালে।
অন্যদিকে, ভোটের আগের দিন থেকে বিভিন্ন শপিংমল ও বড় বড় বাজার সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘোষণায় অনেকে জরুরি কেনাকাটাও সেরে নিচ্ছেন।
'দোকানদারেরা বেশিরভাগই গ্রামে চলে, গাড়ি-ঘোড়াও বন্ধ থাকবে শুনছি। আবার ভোটে জয়-পরাজয় ঘিরে কী হয় না হয়, ফের কবে মার্কেট খোলে, না খোলে! সবদিক ভেবেই একটু বেশি করে বাজার সদাই করে রাখছি,' বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ঢাকার পান্থপথ এলাকার বাসিন্দা শিরিন সুলতানা।
ভোটের সময় ঠিক কোন কোন সেবা বন্ধ থাকবে এবং কোনগুলো খোলা থাকবে, চলুন জেনে নেওয়া যাক।
সীমিত থাকছে মোবাইল ব্যাংকিং
বৃহস্পতিবারের সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) আর্থিক লেনদেন সীমিত রাখার নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেটি অনুযায়ী, ৮ ফ্রেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন রাত ১২টা পর্যন্ত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকার বেশি অর্থ লেনদেন করা যাবে না।
১০ হাজার টাকা পাঠাতে গেলেও সেটি পাঠাতে হবে ১০ বারে। অর্থাৎ প্রতিবার এক হাজার টাকার বেশি পাঠানো যাবে না।
ইতোমধ্যেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান।
তবে গ্রাহক পর্যায়ে অর্থ লেনদেন করা গেলেও বন্ধ রয়েছে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ অন্যান্য এমএফএস অ্যাপের ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউট সেবা।
মূলত নির্বাচনের সময় অবৈধ অর্থের লেনদেন ঠেকানোর লক্ষ্যে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে এজেন্ট পর্যন্ত সব ধরনের গ্রাহকের ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউট সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
কাজেই এই সময়ের মধ্যে গ্রাহকেরা কোনো এজেন্টের কাছ থেকে নগদ টাকা তুলতে পারবেন না।
এছাড়া অভ্যন্তরীণ আরেক নির্দেশনায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েছে, তারা যেন গ্রাহকপ্রতি দৈনিক এক লাখ টাকার বেশি নগদ লেনদেন না করেন।
নির্বাচনের সময় আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বন্ধ থাকবে দোকানপাট, শপিংমল
ভোট উপলক্ষে আগামী বুধবার ও বৃহস্পতিবার ঢাকাসহ সারা দেশে বড় বড় সব দোকান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং শপিংমল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি।
সমিতির সভাপতি নাজমুল হাসান মাহমুদ সম্প্রতি এক বিবৃতিতে একথা জানিয়েছেন।
সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি এবং ঢাকা মহানগর দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির যৌথ সভায় গৃহীত হয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত ব্যবসায়ী ও তাদের কর্মচারীরা যে যার এলাকায় গিয়ে যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, সেজন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী শুক্রবার দোকান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং শপিংমল আবারও খুলবে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ঢাকার বসুন্ধরা শপিংমল কিংবা নিউ মার্কেট বন্ধ থাকলেও খোলা থাকবে পাড়া-মহল্লার মুদি দোকান ও সবজি বাজার।
'আমরা বড়জোর হাফ বেলা বন্ধ রাখতে পারি। সকালে ভোটে দিয়ে এসে দোকান খুলবো,' বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তেজগাঁও এলাকার মুদি দোকানি মিজানুর রহমান। তবে ট্রাক ও পিকআপ ভ্যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় ভোটের আগে-পরে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা।
যান চলাচলে বিধিনিষেধ
নির্বাচন ঘিরে যানবাহন চলাচলে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে নির্বাচন কমিশন। এতে নির্বাচনের আগের রাত থেকেই দূরপাল্লা কিংবা স্বল্পপাল্লার যানবাহন চলাচল সাময়িক সময়ের জন্য কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে আগামী ১০ই ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১৩ই ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত মোট ৭২ ঘণ্টা মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
ফলে বন্ধ থাকবে রাইড শেয়ারিং অ্যাপের মোটরসাইকেল সার্ভিস। এছাড়া পিকআপ, মাইক্রোবাস, ট্রাক, লঞ্চ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকবে ১১ই ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত থেকে ভোটের দিন ১২ই ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, প্রশাসন ও অনুমতিপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষকদের যানবাহন এই আওতামুক্ত থাকবে। জরুরি সেবায় নিয়োজিত যানবাহন, ওষুধ, স্বাস্থ্য-চিকিৎসা ও অনুরূপ কাজে ব্যবহৃত দ্রব্যাদি এবং সংবাদপত্র বহনকারী সকল ধরনের যানবাহনও চলাচল করতে পারবে।
বিদেশগামী যাত্রী বা বিদেশ ফেরত আত্মীয়-স্বজনদের যাতায়াতের সুবিধার্থে বিমানবন্দরগামী বা বিমানবন্দর থেকে আসা যানবাহন চলাচলের সুযোগ থাকবে, তবে এক্ষেত্রে টিকেট বা অনুরূপ প্রমাণ প্রদর্শন করতে হবে।
এর বাইরে গণমাধ্যমকর্মী, নির্বাচন পর্যবেক্ষকসহ জরুরি কোনো সেবায় ব্যবহৃত যানবাহন এবং মোটরসাইকেল- নির্বাচন কমিশন বা রিটার্নিং কর্মকতার অনুমোদন সাপেক্ষে সড়কে চলাচল করতে পারবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
পর্যটন কেন্দ্র খোলা থাকবে?
ভোটের সময় লম্বা ছুটি পেয়ে অনেকেই হয়তো ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু তাদের মাথায় রাখা প্রয়োজন যে, নির্বাচনের সময় নিরাপত্তা ইস্যুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি তৎপরতা থাকে।
ভ্রমণের ক্ষেত্রে আইনগত বাধা না থাকলেও নিরাপত্তার স্বার্থে বাড়তি চেকপোস্ট, হোটেলে অতিথিদের পরিচয় ও ভ্রমণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জবাবদিহি এমন বিষয়গুলোও আগের নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে।
এছাড়া ভোটকে প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে নির্বাচনী এলাকায় বহিরাগতদের অবস্থানের ওপর ইতোমধ্যেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইসি'র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্বাচনি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ব্যক্তি, নির্বাচন কমিশনের অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার বাসিন্দা বা ভোটার ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি ভোটগ্রহণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকে ভোটগ্রহণ শেষের ২৪ ঘণ্টা পর পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করতে পারবেন না।
এ নিষেধাজ্ঞা ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা থেকে ১৩ই ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। সেজন্য পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরাও বিষয়টি আমলে নিয়ে ভোটের সময় তাদের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
'নির্বাচনের আগের রাত থেকেই কোনো প্রকার প্যাকেজ, কোনো প্রকার কর্মসূচি আমরা গ্রহণ করছি নাই। তবে পরের দিন থেকে দেশের ভেতরে কিংবা বাইরে সব ক্ষেত্রেই বিভিন্ন প্যাকেজ চালু থাকছে,' বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের (টোয়াব) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রাফিউজ্জামান।
খোলা থাকবে জরুরি সেবা
ভোট উপলক্ষ্যে সরকার দু'দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলেও জনস্বার্থে জরুরি সেবাগুলো চালু থাকছে। সরকারি-বেসরকারি সকল হাসপাতালে ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আগের মতোই সেবা দেবেন। ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর সরবরাহ ও বিপণনে বাধা থাকবে না।
বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ সংস্থা এবং ফায়ার সার্ভিস পূর্ণ মাত্রায় সচল থাকবে। টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবা, ডাক বিভাগ এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট যানবাহন সচল থাকবে।
দেশের সব সমুদ্র ও স্থলবন্দর সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম চালু থাকবে যাতে পণ্য আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত না হয়। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও মাঠে থেকে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।