১০ হাজার টাকা পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা, তথ্যটি সঠিক নয়

১০ হাজার টাকা পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা, তথ্যটি সঠিক নয়
শনিবার গাইবান্ধা সরকারি কলেজে প্রত্যয়নপত্র নিতে ভিড়  © টিডিসি ফটো

করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে শিক্ষার্থীদের ১০ হাজার টাকা সরকারি অনুদান দেওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক এবং ইউটিউবে এমন ভুয়া তথ্য প্রচার করেছেন একটি সংঘবদ্ধ চক্র। আর তাদের এই গুজবে বিশ্বাস করে শনিবার (৬ মার্চ) দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ঢল নেমেছিল। ফটোকপি ও অনলাইন সার্ভিসের দোকানগুলোতেও ছিল উপচে পড়া ভিড়।

প্রতিষ্ঠান প্রধানদের প্রত্যয়নপত্র নিতে দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় যায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এমনকি সারাদেশ থেকে আবেদনের জন্য রাজধানীসহ নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে এসেছেন অবস্থান না করা শিক্ষার্থীরাও।

এদিকে, অনুদান নিয়ে প্রতারণা এড়াতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সতর্কবার্তা জারি করেছে। বৃহস্পতিবার (৪ মার্চ) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. ফজলুর রহমান স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি সর্তকতামূলক বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলা হয়েছে, ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে সরকারের দেয়া বিশেষ অনুদান প্রদানের নামে অনলাইনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে অসৎ উদ্দেশ্যে প্রতারক চক্র ভিন্ন ভিন্ন মোবাইল ফোন থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র, বিকাশ নম্বর ও গোপন পিন ইত্যাদি চাচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিচয় দিয়ে ফোনগুলো করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এতে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় হতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক-কর্মচারী ও ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিশেষ অনুদান বিষয়ে ইতোপূর্বে কাউকে ফোন দেয়া হয়নি এবং জাতীয় পরিচয়পত্র, বিকাশ নম্বর ও গোপন পিন সংক্রান্ত কোনো তথ্যও চাওয়া হয়নি। এ বিষয়ে প্রতারক চক্র হতে সতর্ক থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে।

এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি করোনাভাইরাস মহামারীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) আওতাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক-কর্মচারী ও ছাত্র-ছাত্রীদের অনুদান প্রদানের একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। তবে সেখানে টাকার পরিমাণ উল্লেখ ছিলনা। তাছাড়া নীতিমালা ও শর্ত অনুসারে সবাই আবেদনের যোগ্যও না। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানো হয়েছে সবাইকে অনুদান দেওয়া হবে ১০ হাজার টাকা করে।

সেই গুজবের রেশ ধরে শনিবার গাইবান্ধা সরকারি জাতীয় কলেজে প্রত্যয়নপত্র নিতে ভিড় করেছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজবের রেশ ধরে চলমান করোনা পরিস্থিতে উপচেপড়া ভিড় নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানসহ সবাইকে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলেছে বলে শঙ্কা দেখা দিযেছে।    

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাউশির বাজেট শাখা থেকে ১৮ জানুয়ারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক-কর্মচারী ও ছাত্র-ছাত্রীদের অনুদান প্রদানের জন্য সিনিয়র সহকারী সচিব মো. ফজলুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে কত টাকার অনুদান দেওয়া হবে তা উল্লেখ নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাউশির ওয়েবসাইটে আবেদন ফরম অপশনে ক্লিক করে আবেদন করতে বলা হয়েছে।

ওই বিজ্ঞপ্তিতে সবার জন্য সরকারি অনুদান দেওয়ার কথা বলা নেই। বলা আছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেরামত ও সংস্কার, আসবাবপত্র ক্রয়সহ অন্যান্য উন্নয়ন কাজের জন্য, শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের দূরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনার সহায়তার জন্য এবং শিক্ষার্থী যারা দূরারোগ্য ব্যাধি, দৈব দুর্ঘটনা এবং শিক্ষাগ্রহণ কাজে ব্যয়ের জন্য আবেদন করতে পারবে। তবে শিক্ষার্থীদের এ বিশেষ অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে দুঃস্থ, প্রতিবন্ধী, অসহায়, রোগগ্রস্ত, গরিব, মেধাবী, অনগ্রসর সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।  

এই অনুদানের আবেদনের সময়সীমা ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। মাউশি সেই আবেদনের সময়সীমা বাড়িয়েছে আজ সোমবার (৭ মার্চ) পর্যন্ত। ২৮ ফেব্রুয়ারি সময় বাড়ানোরও ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বর্তমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক কর্মচারী ও ছাত্র-ছাত্রীদের অনুদান প্রদানের লক্ষ্যে অনলাইনে আবেদনের সময়সীমা আগামী ৭ মার্চ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হলো।

এদিকে মাউশির বিজ্ঞপ্তিতে অনুদানের টাকার পরিমাণ উল্লেখ না থাকলেও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাউশি থেকে ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়ার কথা ছড়িয়ে পড়েছে। এই অনুদানের টাকা পাওয়ার জন্য করোনা পরিস্থিতিতে বন্ধ থাকা দেশের সকল স্কুল-কলেজে আজ শনিবার সকাল থেকেই প্রত্যয়নপত্র নেওয়ার জন্য ভিড় করেছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। অনলাইনে আবেদনের নিয়ম থাকার পরও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবাইকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহের গুজব ছড়ানোর কারণেই শিক্ষার্থীরা স্ব-স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভিড় করছে বলেও অনেকেই মনে করছেন।

গাইবান্ধা সরকারি কলেজের ছাত্র শরিফুল নামের জানায়, অন্ততপক্ষে পাঁচ হাজার ছাত্রী ভিড় করেছে প্রত্যয়নপত্র নেওয়ার জন্য। কলেজ ক্যাম্পাস, ক্লাসরুম, একাডেমিক ভবনের বারান্দা থেকে শুরু করে কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। দেখা গেছে কম্পিউটারে টাইপ করা প্রত্যয়নপত্রের ফরম লেখায় ছাত্রীরা মহাব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কলেজের একাডেমিক ভবনের প্রত্যেকটি ক্লাস রুমের বেঞ্চে বসে ছাত্রীরা অপেক্ষা করছে প্রত্যয়নপত্র নেওয়ার জন্য। এই পরিস্থিতিতে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শহীদুল্লাহ ও অন্যান্য শিক্ষকরা পড়েছেন চরম বিপাকে। যদি সব ছাত্রী তাদের প্রত্যয়নপত্র নিয়ে যায় তাহলে রাত ১০টা পর্যন্ত দিলেও দেওয়া শেষ হবে না।

কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরেও কম্পিউটারের দোকানগুলোতেও প্রচুর ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। শহরের সবগুলো কম্পিউটারের দোকানগুলোতে ব্যাপক ভিড় ছিল। শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করতে সঙ্গে তাদের অভিভাবকরাও এসেছেন। তবে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মুখে মাস্ক নেই।

নোয়াখালী সরকারি কলেজের ছাত্রী আসমা আক্তার বলেন, অনলাইনে বিজ্ঞপ্তি দেখছি যে ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দিবে সরকার। বিষয়টা নিয়ে আমার কাছে সন্দেহ হচ্ছে। কারণ এটা কখনোই সম্ভব নয় যে দেশের সব শিক্ষার্থীকে ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দিবে। তারপরও সবাই আবেদন করতেছে। তাই আমিও করবো। আজকে প্রত্যয়নপত্র নিতে এসেছি। 

জামালপুরের সরকারি জাহেদা সফির মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শহীদুল্লাহ বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি আমরা দেখেছি। সেখানে অনুদানের টাকার পরিমাণ উল্লেখ নেই এবং বেশ কিছু শর্ত দেওয়া আছে। সেই শর্ত অনুযায়ী সবাই অনুদান পাবে না। কিন্তু শিক্ষার্থীরা বলছে ১০ হাজার টাকা করে পাবে তারা। সোমবার (৭ মার্চ) আবেদনের শেষ সময় হওয়ায় আজকে সবাই ভিড় করেছে। কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে কলেজ বন্ধ থাকলেও যেভাবে শিক্ষার্থীরা ভিড় করেছে এটা সবার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তারা তো আমাদের শিক্ষার্থী। প্রত্যয়নপত্র নিতে এসেছে, আমরা প্রত্যয়নপত্র দিচ্ছি। তাদেরকে তো আমরা না করতে পারি না। এর সময়সীমা আরো বাড়ানো দরকার। একই সাথে এই অনুদান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব বন্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ