ফয়সাল রুবেল আহমেদ © সংগৃহীত
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি করিম মাসুদ ওরফে রাহুলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফয়সাল রুবেল আহমেদের (৩৩) ছয় দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। আজ বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) তদন্ত কর্মকর্তার আবেদন নিয়ে ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম রিমান্ডেরর আদেশ দেন। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মো. রুকনুজ্জামান রিমান্ডের তথ্য নিশ্চিত করেন।
গত বুধবার মধ্যরাতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আটি নয়াবাজার এলাকা থেকে ডিবি পুলিশেন সহায়তায় রুবেলকে গ্রেফতার করে সিআইডি। গ্রেফতারের পর বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করে তার ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো (পূর্ব) এর সহকারি পুলিশ সুপার আবদুর কাদির ভূঁঞা।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্থ করাসহ নির্বাচনে অংশ গ্রহণে আগ্রহী রাজনৈতিক দলের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টির জন্য এবং প্রার্থীদের মনোবলকে দুর্বল করার জন্য এ আসামি ও তার সহযোগি, সহায়তাকারি ও অর্থায়নকারি (প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে) অজ্ঞাতনামা আসামিদের পরামর্শে ও নির্দেশে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করে। ঘটনার পরপর এ আসামি আত্মগোপনে চলে যায়। আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে তার নাম-ঠিকানা প্রকাশসহ ঘটনার পূর্ব পরিকল্পনা এবং ঘটনার পরবর্তীতে এজাহারনামীয় আসামিসহ অন্যান্য আসামিদের আত্মগোপনে থাকতে সহযোগিতা করে মর্মে তথ্য প্রকাশ করে। রুবেল আহমেদ এজাহারনামীয় আসামি ফয়সাল করিম মাসুদের ঘনিষ্ট সহযোগী।
আসামির নাম ঠিকানা যাচাই বাছাই চলছে। মামলার মূল রহস্য উদঘাটন, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে পুলিশ হেফাজতে এনে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার ১০ দিনের পুলিশ রিমান্ডের প্রয়োজন। রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর জামাল উদ্দিন মার্জিন রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তবে রুবেলের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। পরে আদালত তার ৬ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেয়।
জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করেন চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী।
গুরুতর আহত হাদিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদিকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১৮ ডিসেম্বর হাদির মৃত্যুর খবর আসে।
হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটিতে হত্যার ৩০২ ধারা যুক্ত হয়। এরপর থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে।
তদন্ত শেষে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে গত ৬ জানুয়ারি হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ।
অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন- প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭), তার বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১), মো. কবির (৩৩), মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), ভারতে পালাতে সহায়তার অভিযোগ থাকা সিবিয়ন দিউ (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র-গুলি উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. ফয়সাল (২৫), মো. আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর শেখ (২৬), সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, ভারতে পালাতে সহায়তাকারী ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১) ও জেসমিন আক্তার (৪২)।
তাদের মধ্যে ফয়সাল করিমসহ শেষের পাঁচজন পলাতক রয়েছেন। অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ বলেছেন, আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং বিভিন্ন সময়ে হাদির দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে বোঝা গেছে, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই’ হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এ ছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ‘বাধাগ্রস্ত করতে’ এবং ভোটারদের মধ্যে ‘ভয়ভীতি তৈরি করতেই’ আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হাদির নির্বাচনি প্রচারে অনুপ্রবেশ করে বলে অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়।
তবে ডিবি পুলিশের দেয়া অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট নয় ইনকিলাব মঞ্চ। গত ১২ জানুয়ারি মামলাটি শুনানির জন্য ছিল। আবদুল্লাহ আল জাবের সেদিন অভিযোগপত্র পর্যালোচনার জন্য দুই দিন সময় চান। আদালত তা মঞ্জুর করে ১৫ জানুয়ারি অভিযোগপত্র গ্রহণের দিন ধার্য করেন। ওইদিন ডিবি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে নারাজি দাখিল করেছেন মামলার বাদী ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। পরে আদালত মামলাটি সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেয়।আগামি ২৫ জানুয়ারি প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে।