জাপান ফুটবল দল © টিডিসি ফটো
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কয়েক বছর আগের একটি ভিডিও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বেশ পরিচিত। যেখানে জাপানের তিন আন্তর্জাতিক ফুটবলার—হোতারু ইয়ামাগুচি, হিরোশি কিয়োতাকে এবং ইয়োসুকি ইদেগুচি একটি পূর্ণাঙ্গ ফুটবল মাঠে একসঙ্গে ১০০ স্কুলছাত্রের বিরুদ্ধে খেলছিলেন। অবাস্তব ও অদ্ভুত শোনালেও সেই ভিডিওর ভেতরের কৌশলটি ছিল দারুণ আকর্ষণীয়। ১০০ জন খুদে প্রতিপক্ষ চারপাশ থেকে ঘিরে ধরা সত্ত্বেও কীভাবে নিজেদের মধ্যে ফাঁকা জায়গা তৈরি করে নিখুঁত পাসিং খেলা যায়, তা-ই দেখিয়েছিলেন জাপানি ত্রয়ী।
সেই খুদে ফুটবলাররা স্বাভাবিকভাবেই বলের পেছনে দলবেঁধে ছুটত। আর সেই সুযোগে জাপানি তারকারা বারবার মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিখুঁত লং-পাসের (Switch of play) মাধ্যমে বল পাঠিয়ে দিতেন, যেখানে তাঁদের একজন সতীর্থ সম্পূর্ণ অরক্ষিত বা আনমার্কড অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতেন।
মজার বিষয় হলো, ২০২৬ বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে আজ যখন পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের মুখোমুখি হচ্ছে জাপান, তখন দলটির খেলার মধ্যে হুবহু সেই ১০০ স্কুলছাত্রকে হারানোর কৌশলেরই এক পরিপক্ব রূপ দেখছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
জাপানের ৩-৪-৩ ফরমেশন এবং ‘ফার-পোস্ট’ ফাঁদ
কোচ হাজিমে মোরিয়াসুর অধীনে জাপান মূলত একটি আক্রমণাত্মক ৩-৪-৩ সিস্টেমে খেলে, যা বল পজেশনে থাকার সময় দ্রুত ফ্রন্ট-ফাইভ বা পাঁচজনের আক্রমণভাগে রূপ নেয়। জাপানের শক্তির মূল জায়গা হলো তাদের দুই উইং-ব্যাক। ডান প্রান্তে রিতসু দোয়ান (যিনি বাঁ-পায়ের খেলোয়াড়) এবং বাঁ প্রান্তে কেইতো নাকামুরা (যিনি ডান-পায়ের খেলোয়াড়)।
এই উইং-ব্যাকরা প্রথাগত উইং-ব্যাকের মতো শুধু ক্রস করার জন্য সাইডলাইন ধরে দৌড়ান না। তারা কাট-ইন করে ভেতরে ঢুকে সরাসরি বক্সে শট নিতে পারেন, আবার কোণাকুণি পাসের মাধ্যমে চোখের পলকে মাঠের খেলার দিক পরিবর্তন করে দিতে পারেন। সুইডেনের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচটিতেও দেখা গেছে, দাইচি কামাদা এবং আও তানাকারা কীভাবে বারবার দূরবর্তী পোস্টে থাকা আনমার্কড উইং-ব্যাক ইয়ুকিনারি সুগাোয়ারাকে লক্ষ্য করে ক্রস বাড়াচ্ছিলেন। প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগ বলের লাইনে পজিশন নেওয়ার আগেই ফার-পোস্টে একজন অতিরিক্ত জাপানি খেলোয়াড় তৈরি রাখার এই কৌশলটি যেকোনো রক্ষণভাগের জন্যই এক বড় ধাঁধা।
ব্রাজিলের রক্ষণভাগের দুর্বলতা যেখানে
আজকের হাইভোল্টেজ ম্যাচে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে এই কৌশলটিই জাপানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হতে পারে। কারণ, এই সেলেসাও স্কোয়াডের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হলো তাদের ফুল-ব্যাক পজিশন। ডান প্রান্তের দানিলোর বয়স টুর্নামেন্ট শেষ হতে হতে ৩৫ ছুঁয়ে ফেলবে, যিনি ব্রাজিলের চিরচেনা গতিময় ফুল-ব্যাকদের মতো নন। অন্যদিকে বাঁ প্রান্তের দগলাস সান্তোসও বিশ্বমানের উইঙ্গারদের থামাতে প্রায়ই গতিতে পিছিয়ে পড়েন। সেন্ট্রাল ডিফেন্সে মার্কিনহোস এবং গাব্রিয়েল বাতাসে ভেসে আসা বলে দারুণ শক্তিশালী হলেও, উইং-ব্যাকদের ফাঁকি দিয়ে ফার-পোস্টে তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গা ভরাট করা তাদের জন্য কঠিন হবে।
অন্যান্য দলগুলো জাপানের এই ফ্রন্ট-ফাইভ সামলাতে রক্ষণভাগে একজন অতিরিক্ত মিডফিল্ডার নামিয়ে ব্যাক-ফাইভ তৈরি করে। যেমনটা নেদারল্যান্ডস করেছিল—মিডফিল্ডার ফ্রেঙ্কি দে ইয়ং নিচে নেমে আসায় ডাচ ফুল-ব্যাকরা উইংয়ে জাপানের উইং-ব্যাকদের সহজে নজরে রাখতে পেরেছিলেন। কিন্তু কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিলে এই ভূমিকা কে পালন করবেন? কাসেমিরো কি নিচে নেমে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারদের সাহায্য করবেন, নাকি তরুণ রায়ানকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হবে? আনচেলত্তি এই ট্যাক্টিক্যাল ফাঁদ কীভাবে কাটান, তা দেখার বিষয়।
ইতিহাস গড়ার দোরগোড়ায় সামুরাই ব্লু
ফুটবল বিশ্ব ঐতিহাসিকভাবেই পশ্চিম ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোর দ্বারা শাসিত। এশিয়ান পরাশক্তি হিসেবে জাপানের চমৎকার অবকাঠামো, ট্যাক্টিক্যাল পরিপক্বতা এবং দলগত সংহতি থাকলেও, বিশ্বকাপের ইতিহাসে তারা আজ পর্যন্ত কোনো নক-আউট ম্যাচ জিততে পারেনি।
আজ যদি তারা ফুটবল ইতিহাসের সফলতম দল ব্রাজিলকে বিদায় করে দিতে পারে, তবে তা কেবল এই টুর্নামেন্টেই নয়, বরং সামগ্রিক বিশ্বকাপ ইতিহাসেই অন্যতম বড় এক মহাকাব্যিক জয় হিসেবে গণ্য হবে। আর সেই ইতিহাস গড়ার জন্য মাঠের নকশায় ১০০ স্কুলছাত্রকে বোকা বানানোর সেই পুরোনো কৌশলের ওপরই ভরসা রাখছে সামুরাই ব্লু-রা।