© টিডিসি ফটো
বিভিন্ন ধরনের অব্যবস্থাপনা ও ভুল-ভ্রান্তির মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছে সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষা ২০১৯। আজ শনিবার ঢাকা, চট্টগ্রাম ও যশোর বোর্ডের বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে পুরনো সিলেবাসে প্রণীত প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। আবার সময় মতো প্রশ্ন না পৌঁছায় অনেক কেন্দ্রেই পরীক্ষা শুরু হতে বিলম্ব হয়েছে। এদিকে পরীক্ষা শুরুর ৩৮ মিনিট পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পাওয়া গেল প্রশ্ন।
ভুল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেয়ার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের অধীন সাতটি কেন্দ্রে এ ধরনের ভুলের তথ্য জানিয়েছেন বোর্ড কর্মকর্তারা। চট্টগ্রামে যে সাত কেন্দ্রে ভুল প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হল নগরীর ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মিউনিসিপ্যাল মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, পতেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় ও গরীবে নেওয়াজ উচ্চ বিদ্যালয় এবং কক্সবাজারের পেকুয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, উখিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও উখিয়া পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র।
ওই সাত কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী কেন্দ্র সচিবদের শোকজ করা হয়েছে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাহবুব হাসান। তিনি বলেন, এবার বাংলা পরীক্ষা ২০১৬, ২০১৮ এবং ২০১৯ সালের সিলেবাসের প্রশ্নপত্র অনুসারে হওয়ার কথা। এর মধ্যে সাতটি কেন্দ্রে কেন্দ্র সচিবদের ভুলে ২০১৯ সালের সিলেবাসে যাদের পরীক্ষা দেওয়ার কথা, তাদের মাঝে ২০১৮ সালের সিলেবাস অনুসারে প্রণীত প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়েছে। তবে এতে পরীক্ষার্থীরা যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে ব্যবস্থা অবশ্যই করা হবে।
একইভাবে যশোর বোর্ডের অধীনস্থ সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার চাম্পাফুল এপিসি স্কুল এসএসসি কেন্দ্রে ২০১৮ সালের সিলেবাসে প্রণীত প্রশ্নপত্রে ৪৮ জন পরিক্ষার্থীর বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা গ্রহন করা হয়েছে। এ ঘটনায় কেন্দ্র সচিব সুখলাল বাইনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রায় তিন ঘন্টা পর নতুন প্রশ্নপত্রে তাদের ফের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।
কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সরদার মোস্তফা শাহীন জানান, ২০১৯ সালের প্রশ্নপত্র বন্টনের প্রায় তিন ঘন্টা পর বিষয়টি সবার নজরে আসে। যশোর শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি নিয়ে পরে তাদের নতুন বছরের প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের মাদারীপুরের কালকিনিতে একটি, মুন্সীগঞ্জে একটি, নেত্রকোনার একটি কেন্দ্রে এবং জামালপুরের তিনটি কেন্দ্রে এই ধরনের ভুল প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়েছে।
সারাদেশে পরীক্ষা শুরু হওয়ার ৪০ মিনিট পর প্রশ্ন হাতে পায় কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার দুয়ারিয়া এজি মডেল একাডেমি কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীরা। সকালে কেন্দ্রে পাঠানো প্রশ্নের প্যাকেটে বোর্ড নির্ধারিত রচনামূলক প্রশ্ন না থাকায় এ বিপত্তি ঘটে। পরে অন্যান্য কেন্দ্র থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করে ৪০ মিনিট দেরিতে পরীক্ষা শুরু করা হয়। পরীক্ষার্থীরা জানান, বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষার বোর্ড নির্ধারিত রচনামূলক প্রশ্ন কেন্দ্রে না থাকায় উপজেলার বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করে প্রায় ৪০ মিনিট পর তা বিতরণ করেন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ।
শনিবার সাধারণ শিক্ষাবোর্ডে বাংলা ১ম পত্র এবং মাদ্রাসা বোর্ডে কুরআন মাজিদ বিষয়ের পরীক্ষা ছিল। এদিন সারা দেশে ১০ হাজার ৩৮৭ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। এছাড়া পরীক্ষায় অসদুপদায় অবলম্বনের দায়ে বহিষ্কৃত হয়েছেন ২৪ জন শিক্ষার্থী। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য মতে, অনুপস্থিত এবং বহিষ্কারের শীর্ষে ছিল মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড। এ বোর্ডে অনুপস্থিত ছিল ৩ হাজার ৭৮৮ জন আর বহিষ্কার হয়েছেনর ৬জন পরীক্ষার্থী। এরপরই কারিগরি শিক্ষাবোর্ডে। এ বোর্ডে অনুপস্থিত শিক্ষার্থী সংখ্যা ১ হাজার ৬২১জন, বহিষ্কারের সংখ্যা ১৩জন। এরপর ঢাকা শিক্ষাবোর্ড। এ বোর্ডের অনুপস্থিতির সংখ্যা ১ হাজর ৩৯৬ জন। এছাড়াও রাজশাহী বোর্ডে ৭৬২, কুমিল্লায় ৬৩১, যশোর ৪৬৩, দিনাজপুরে ৫৪১, সিলেটে ৩১৮, বরিশালে ৩৯০, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৪৭৭জন শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। সাধারণ ৮টি বোর্ডে ৫জন শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়েছে। এরমধ্যে ৩জন বহিষ্কার হয়েছেন বরিশাল বোর্ড। এছাড়া ঢাকা ও দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডে একজন করে বহিষ্কার হয়েছে।
রীতি অনুযায়ী পরীক্ষার প্রথম দিন পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনে যান শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। শনিবার সকালে রাজধানীর বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সারাদেশে নকলমুক্ত পরীক্ষা আয়োাজনে তীক্ষ্ম গোযেন্দা নজরদারি বসানো হয়েছে। তাই কোনোভাবে প্রশ্নফাঁস করা সম্ভব নয়। মন্ত্রী বলেন, নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষা শুরুর ২৫ মিনিট আগে প্রশ্নবাক্স খোলা হয়েছে। সারাদেশে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল পেপারে মোড়ানো প্রশ্নপত্র পাঠানো হয়েছে।
প্রশ্নফাঁসের গুজবকারী কয়েকজনকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করেছে উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পূর্বের চাইতে এবার আমরা আরও কঠোর অবস্থানে রয়েছি। তাই প্রশ্নফাঁস বা তার গুজব ছড়ালে তারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়বে।। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। তাই এমন ন্যাক্কারজনক কাজের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে কেউ রেহাই পাবে না। যারা ফেসবুকসহ ইন্টারনেটের মাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছে তাদের ওপর নজরদারি বসানো হয়েছে। দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করবে। তাই সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরীক্ষা সম্পন্ন করতে সকল অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সহায়তা চান শিক্ষামন্ত্রী। এর আগে সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে উত্তরা পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ করেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই সচিবসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও দপ্তর প্রধানরা।
ফেসবুকে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন:
এসএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার ঘন্টাখানেক পর ফেসবুকে বাংলা প্রশ্নের ছবি পাওয়া গেছে। শনিবার সকাল ১০টায় পরীক্ষা শুরু হওয়ার পরেই ১০টা ৩৮ মিনিটে এই প্রশ্ন পাওয়া যায়। তবে তা অস্পষ্ট ছিল। এরপর বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে পরীক্ষাটির সৃজনশীল প্রশ্নের ৩নং সেটের প্রশ্ন পোস্ট করা হয়। বহুনির্বাচনী প্রশ্নের সঙ্গে অসল প্রশ্নের মিল পাওয়া না গেলেও সৃজনশীল প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া যায়
জানা যায়, ফেসবুকের ‘Ssc all board question out 2019-√100%’ নামের একটি পেজে সাড়ে ১০টা ৩৮মিনিটে পর বহুনির্বাচনী প্রশ্ন পোস্ট করা হয়। ওই প্রশ্নের সঙ্গে বহুনির্বাচনী প্রশ্নের মিল না পাওয়া গেলেও সৃজনশীল প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের সমন্বয় সাব কমিটি ও চেয়ারম্যান মু. জিয়াউল হক বলেন, কোনো পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়ার ১ ঘণ্টা পর কেন্দ্র থেকে বের হয়ে যেতে পারবে। এটা নিয়ম। হয়তো এমনটিই হয়েছে, কোনো পরীক্ষার্থী ১ ঘণ্টা কেন্দ্রে ছিল, পরীক্ষা দিয়েছে, বের হয়ে এসে সেই প্রশ্নের ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়েছে।
প্রসঙ্গত, এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এবার মোট পরীক্ষার্থী ২১ লাখ ৩৫ হাজার ৩৩৩। এর মধ্যে ছাত্র ১০ লাখ ৭০ হাজার ৪১১ এবং ছাত্রী ১০ লাখ ৬৪ হাজার ৮৯২জন। সারাদেশে ২৮ হাজার ৬৮২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ৩ হাজার ৪৯৭টি কেন্দ্রে পরীক্ষা আয়োজন করা হয়েছে। বিদেশে কেন্দ্র রয়েছে আটটি, যেখানে পরীক্ষার্থী সংখ্যা ৪৩৪ জন।