বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা: সংকট ও সম্ভাবনা

১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৪২ PM , আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৪৩ PM
প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম

প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে এক জটিল এবং সন্ধিক্ষণমূলক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, যেখানে স্বাধীনতার পর থেকে অর্জিত বিশাল সংখ্যাতাত্ত্বিক প্রসার এবং সমসাময়িক কাঠামোগত সংকটের মধ্যে এক ধরণের টানাপোড়েন পরিলক্ষিত হয়। গত কয়েক দশকে দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তৃণমূল পর্যায়ে কলেজ শিক্ষার বিস্তারের মাধ্যমে। তবে এই প্রসারের সমান্তরালে শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণার সংস্কৃতি, প্রশাসনিক সুশাসন এবং কর্মসংস্থানের বাজারের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক কারিকুলামের অসংগতি এক গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে।

২.
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা কাঠামো মূলত একটি ত্রি-স্তরীয় ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, যার মধ্যে রয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজসমূহ। এছাড়া একটি বিশেষায়িত অবস্থান তৈরি করেছে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি), যা দূরশিক্ষণ ও নমনীয় শিখন পদ্ধতির মাধ্যমে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে উচ্চশিক্ষার আওতায় নিয়ে এসেছে। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম এবং বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত, যার শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি। বাউবি’র অধীনে স্কুল অব এডুকেশন, স্কুল অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, স্কুল অব বিজনেস এবং স্কুল অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সের মতো বিশেষায়িত বিভাগগুলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে কৃষি ও প্রযুক্তিতে উচ্চতর গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করছে।   

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাতের বিকাশ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। ১৯৯২ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের পর থেকে বর্তমানে ১০০টিরও বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের একটি বিকল্প সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত সেশন জট মুক্ত পরিবেশ এবং আধুনিক কর্মমুখী কারিকুলামের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আকৃষ্ট করেছে। তবে এই খাতের দ্রুত বাণিজ্যিকীকরণ এবং অনেক ক্ষেত্রে গবেষণাগার ও স্থায়ী ক্যাম্পাসের অভাব শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। 

বস্তুত বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার পরিসংখ্যানগত চিত্রটি বৈচিত্র্যময় ও ব্যাপক। বর্তমানে দেশে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) নিয়ন্ত্রণাধীন প্রায় ৫৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় মেধাবী ও স্বল্প আয়ের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে এবং আধুনিক ও বাণিজ্যিক বিষয়সমূহের প্রাধান্য নিয়ে ইউজিসি ও নিজস্ব ট্রাস্টি বোর্ডের অধীনে ১০৫টির বেশি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্যদিকে, প্রান্তিক ও মফস্বল এলাকার বিশাল শিক্ষার্থী গোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ২,২৫০টির বেশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। এছাড়াও ঝরে পড়া শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের জন্য দূরশিক্ষণের সুযোগ দিচ্ছে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অসংখ্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠান দক্ষ জনশক্তি গড়তে হাতে-কলমে শিক্ষা প্রদান করে যাচ্ছে। 

৩.
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংকটের মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের সুশাসনের অভাব এবং কাঠামোগত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, যা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি দীর্ঘমেয়াদী সংকটে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির নামে আধিপত্য বিস্তার, ‘গেস্টরুম’ সংস্কৃতির মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা এবং সহিংসতার যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা নবাগতদের মেধা বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও যখন যোগ্যতা ছাপিয়ে ভোটার নিয়োগের সংবাদ শিরোনাম হয়, তখন উচ্চশিক্ষার মান ও সামগ্রিক প্রশাসনিক দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া স্বাভাবিক। এই সামগ্রিক অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল সনদ বিতরণের কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা জাতীয় উন্নয়নের পথে একটি স্থায়ী অন্তরায়।

অতীতে আমরা দেখেছি, ‘সেশন জট’ বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এক অভিশপ্ত শব্দ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। একটি চার বছরের স্নাতক প্রোগ্রাম সম্পন্ন করতে অনেক ক্ষেত্রে ছয় থেকে সাত বছর সময় লেগে যাচ্ছে। এই বিলম্বের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ক্লাস বন্ধ থাকা, শিক্ষক ধর্মঘট, অপরিকল্পিত পরীক্ষা গ্রহণ এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা। সেশন জটের ফলে একজন শিক্ষার্থীর জীবনের উৎপাদনশীল সময় থেকে গড়ে দুই থেকে তিন বছর নষ্ট হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বিশাল ক্ষতি। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। উচ্চশিক্ষায় এই দীর্ঘসূত্রতার ফলে তারা চাকুরির বাজারে প্রবেশ করতে দেরি করছে, যা তাদের ক্যারিয়ারের অগ্রগতির সম্ভাবনাকে কমিয়ে দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সেশন জটের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র মানসিক হতাশা ও বিষণ্নতা তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় একই একাডেমিক স্তরে আটকে থাকা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকেও শিক্ষার্থীদের ঠেলে দিচ্ছে। উল্লেখ্য,ঢাকার স্কুল ও কিছু কলেজে অনলাইন ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। তবে এ উদ্যোগের ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে, অনেক অভিভাবক ও শিক্ষাবিদ মনে করেন—স্কুল পর্যায়ে অনলাইন শিক্ষা খুব একটা কার্যকর নয়।   

৪.
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি হলো শিক্ষিত বেকারত্বের উচ্চ হার। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, স্নাতক সম্পন্নকারী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩৮.৫% শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এটি একটি কাঠামোগত সংকট, যার মূলে রয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের প্রয়োজনের ব্যাপক ব্যবধান। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন সব বিষয়ে সনদ প্রদান করছে যার চাহিদা বাজারে খুব সামান্য, অথবা যে বিষয়গুলোতে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে তার কারিকুলাম আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। শিল্প মালিকদের অভিযোগ যে, তারা দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা গ্রাজুয়েটদের মধ্যে প্রয়োজনীয় পেশাদার দক্ষতা খুঁজে পাচ্ছেন না। বিশেষ করে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের (4IR) এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স এবং ডাটা সায়েন্সের মতো বিষয়গুলোতে দেশীয় গ্রাজুয়েটদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। সিভিল বা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ হলেও বাস্তব নির্মাণ বা মেরামত কাজে অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। একইভাবে ব্যবসায়িক শিক্ষার ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক তত্ত্বের ওপর জোর দেওয়া হলেও করপোরেট কমিউনিকেশন বা ডিজিটাল লিটারেসির মতো আধুনিক দক্ষতাগুলোর অভাব প্রকট।

উচ্চশিক্ষার মানদণ্ড হিসেবে গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম হলেও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার সংস্কৃতি ও বৈশ্বিক অবস্থান অত্যন্ত সংকটাপন্ন। আন্তর্জাতিক ইনডেক্সড জার্নালগুলোতে প্রকাশনার সংখ্যায় প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে থাকার মূলে রয়েছে জিডিপির ১% এরও কম সরাসরি বিনিয়োগ, যেখানে ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী এটি হওয়া উচিত ৪-৬% । আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এই ব্যবধান আরও প্রকট হয়ে ওঠে; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার জিডিপির প্রায় ৩.৫% এবং জার্মানি বা সুইডেনের মতো দেশগুলো ৩% এর বেশি গবেষণায় ব্যয় করে, যা তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উদ্ভাবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশ মুনাফামুখী হওয়ায় ল্যাবরেটরি বা পিএইচডি প্রোগ্রামে বিনিয়োগের অভাব যেমন স্পষ্ট, তেমনি শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য গবেষণার মানের চেয়ে সংখ্যার ওপর জোর দেওয়ায় ‘প্রেডেটরি জার্নালে’ প্রবন্ধ প্রকাশের প্রবণতা বাড়ছে। ফলে ২০২৫ সালের কিউএস (QS) এশিয়া র‍্যাঙ্কিংয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতিষ্ঠানগুলো শীর্ষ ১০০-তে জায়গা পেলেও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সেখানে স্থান পায়নি। যেখানে হার্ভার্ড, এমআইটি বা অক্সফোর্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় ও বিলিয়ন ডলারের এনডাউমেন্ট ফান্ডের মাধ্যমে বিশ্ব শাসন করছে, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে ১০০০-এর বাইরে অবস্থান করছে। এই হতাশাজনক চিত্র পরিবর্তনের জন্য গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং গবেষণার গুণগত মান নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

৫.   
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে (ইউজিসি) একটি শক্তিশালী এবং স্বায়ত্তশাসিত ‘বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন’ (HEC)-এ রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত উচ্চশিক্ষা কমিশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫-এর খসড়ায় এই কমিশনকে অভাবনীয় ক্ষমতা ও মর্যাদা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। কমিশনের চেয়ারম্যান একজন পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা এবং কমিশনারগণ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতির মর্যাদা ভোগ করবেন। এই কমিশনের প্রধান লক্ষ্য হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে এটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট সরাসরি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে বণ্টন করবে, যার ফলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ভরশীলতা হ্রাস পাবে। এছাড়া কমিশন প্রতি তিন বছর অন্তর বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিং প্রকাশ বাধ্যতামূলক করবে এবং নিম্নমানের শিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা লাভ করবে। 

প্রস্তাবিত উচ্চশিক্ষা কমিশনের প্রধান কার্যাবলি: ক) পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অভিন্ন শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা প্রণয়ন। খ) বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক প্রোগ্রামের অনুমোদন প্রদান ও প্রয়োজনে তা বাতিল করা। গ) আন্তর্জাতিক মানের সাথে সংগতি রেখে উচ্চশিক্ষার কারিকুলাম আধুনিকায়ন ও ক্রেডিট ট্রান্সফার পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ। ঘ) গবেষণার অগ্রাধিকার ক্ষেত্র নির্ধারণ এবং জাতীয় গবেষণা তহবিল পরিচালনা। এই সংস্কার প্রস্তাবটি যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় সুশাসন ফিরিয়ে আনার পথে এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।  বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকতা পেশার সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা হ্রাস পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো-শিক্ষকদের সমস্যাকে আমলে না নেওয়া। এতে শিক্ষার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যেমন, বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যেও দীর্ঘদিনের পদোন্নতি বঞ্চিত থাকার ফলে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে। পাঁচ বছরের মধ্যে সহকারী অধ্যাপক হওয়ার কথা থাকলেও অনেকে ১২ বছর ধরে প্রভাষক হিসেবে কাজ করছেন। এই পেশাগত হতাশা শিক্ষকদের পাঠদান ও গবেষণার আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উচ্চশিক্ষা ক্যাডারের এই ‘পদোন্নতি জট’ নিরসন না করলে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব।

৬.
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের জন্য এক নতুন সূর্যোদয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিএনপি’র সরকার গঠন একটি বৈষম্যহীন এবং ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ার অঙ্গীকারে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা আজ ক্যাম্পাসে দখলদারিত্বের রাজনীতি এবং লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র সংগঠনের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ এবং মেধাভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে আছে। বিএনপি সরকার উচ্চশিক্ষা সংস্কারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শিক্ষা দর্শনকে গুরুত্ব দিচ্ছে, যা মূলত স্বায়ত্তশাসন, সৃজনশীলতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষার ওপর জোর দেয়। শিক্ষার্থীরা যে ‘জুলাই চার্টার’ বা জুলাই সনদের কথা বলছে, তার অন্যতম প্রধান দাবি হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় রাজনীতির মুক্তাঞ্চল করা এবং গবেষণায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা। এই নতুন আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের পুরনো আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক খোলস ভেঙে বের হয়ে আসতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর চাওয়া সেই পথেই অগ্রসরমাণ।

৭.   
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। যদি আমরা বর্তমান সংকটগুলোকে কেবল সমস্যা হিসেবে না দেখে সংস্কারের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি, তবে উচ্চশিক্ষা খাতই হতে পারে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রধান ইঞ্জিন। এই লক্ষ্যে নিম্নোক্ত পদক্ষেপসমূহ জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া প্রয়োজন: ১. প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ: উপাচার্য থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ পর্যন্ত সকল পর্যায়ে একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ কমিশন গঠন করতে হবে। ২. কারিকুলাম আধুনিকায়ন ও ৪আইআর দক্ষতা: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের কারিকুলাম শিল্পের চাহিদার সাথে সমন্বয় করতে হবে। মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে সমস্যা সমাধান (Problem Solving), সমালোচনামূলক চিন্তা (Critical Thinking) এবং ডিজিটাল লিটারেসিকে প্রতিটি বিষয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। ৩. গবেষণা বরাদ্দ ও উদ্ভাবন তহবিল: জিপিডির অন্তত ২% সরাসরি গবেষণায় বরাদ্দ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের যৌথ অর্থায়নে গবেষণা প্রকল্প হাতে নিতে হবে যাতে গবেষণার ফলাফল সরাসরি দেশের উন্নয়নে কাজে লাগে। ৪. সেশন জট ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা: একটি সুনির্দিষ্ট একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করে তা অনুসরণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রশাসনিক অদক্ষতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ইউজিসি বা প্রস্তাবিত এইচইসি-এর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ৫. ডিজিটাল ডিভাইড হ্রাস ও ব্লেন্ডড লার্নিং: সাশ্রয়ী ইন্টারনেট এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ল্যাপটপ ঋণের ব্যবস্থা করে অনলাইন শিক্ষার সুযোগ সকলের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। বাউবি’র দূরশিক্ষণ মডেলকে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সমন্বয় করে গ্রাম ও শহরের শিক্ষার ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে।   

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের সম্ভাবনা অপরিসীম। এ দেশের তরুণরা তাদের মেধা ও শ্রমের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করছে। যদি দেশের অভ্যন্তরীণ শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমরা সঠিকভাবে সংস্কার করতে পারি, তবে এই গ্রাজুয়েটরাই হবে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার কারিগর। উচ্চশিক্ষা আজ কেবল ডিগ্রি প্রদানের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের দিকনির্দেশক। সংকট উত্তরণে সম্মিলিত সদিচ্ছা ও দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারই পারে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের গুরুত্বের কথা বলছেন। জাতীয় বাজেটে শিক্ষায় ৬% বরাদ্দের কথাও বলেছেন। এসবই একটি সরকারের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। উচ্চশিক্ষা খাত শীঘ্রই উন্নতির পথে অগ্রসর হবে বলে আমরা মনে করি।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাবেক চেয়ারম্যান, থিয়েটার এন্ড পরফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

হরমুজ প্রণালিতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ অভিযান শুরু যুক্তরাষ্ট্রের
  • ০৬ মে ২০২৬
চরফ্যাশনে ৭ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতার মামলা
  • ০৬ মে ২০২৬
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ১
  • ০৬ মে ২০২৬
ক্লাস শুরুর আগেই দুই মাসের সেশনজটে জাবির প্রথম বর্ষের শিক্ষ…
  • ০৬ মে ২০২৬
রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানানোয় তিন ছাত্রী বহিষ্কার, রাতে উত…
  • ০৫ মে ২০২৬
ব্যানার ছেঁড়া নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুখোমুখি ছাত্রদল-হল …
  • ০৫ মে ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SUMMER 2026
Application Deadline Wednesday, May 13, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9