বুয়েট এলামনাইয়ের গ্র্যান্ড রিইউনিয়ন
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান © টিডিসি ফটো
গল্প-আড্ডা, খুঁনসুটি আর ক্যাম্পাস জীবনের স্মৃতি রোমন্থনের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কেটেছে একটি দিন। আজ শুক্রবার (৭ ফেব্রুয়ারি) কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে দিনব্যাপী বুয়েট এ্যালামনাইয়ের ‘গ্র্যান্ড রিইউনিয়ন-২০২০’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনা সভা, স্মৃতিচারণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন আয়োজনে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় বুয়েটের প্রাক্তনদের মিলন মেলায়। এই আয়োজনে গত বছরের অক্টোবরে ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মীদের হাতে নিহত বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে স্মরণ করা হয়েছে।
জীবনের স্বর্ণালী সময়ের স্মৃতি বিজড়িত ক্যাম্পাসে ফিরে প্রাক্তন প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী হয়েছিলেন আবেগে আপ্লুত। দিনভর আলাপচারিতা, আড্ডা আর স্মৃতিচারণে মেতেছিলেন তারা। বুয়েট এ্যালামনাই আয়োজিত ‘গ্র্যান্ড রিইউনিয়ন-২০২০’ সকাল ১০টায় উদ্বোধন করেন এ্যালামনাইয়ের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। বুয়েট এ্যালামনাইয়ের সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের পরিচালক ও বুয়েট এলামনাই এর সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। আরও বক্তব্য রাখেন বুয়েট এ্যালামনাইয়ের মহাসচিব ড. সাদিকুল ইসলাম ভূঁইয়া।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির ব্ক্তব্যে জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, আপনাদের জগৎ আর আমার জগৎ অনেকখানি আলাদা। তবুও আপনারা আমাকে আহবান করেছেন এবং সম্মানের আসন দিয়েছেন সেজন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। ১০ বছর পর পর বুয়েটে রিইউনিয়ন হয়। যখন পরস্পরের সাথে দেখা হয় তখন হৃদয় স্পন্দন হয় এবং স্মৃতি রোমন্থন হয়।
তিনি বলেন, বুয়েটের অনেক বড় ঐতিহ্য রয়েছে। দুঃখজনকভাবে আবরার ফাহাদের হত্যাকান্ড বুয়েটের কপালে কালিমা রেখা এঁকেছে। এই ঘটনার পর জানতে পারলাম শুধু বুয়েটের নয় বাংলাদেশের প্রায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের নির্যাতন চলে আসছে। এটা আমাদের খুবই বিস্মিত করে। দেশের সেরা এবং মেধাবী শিক্ষার্থীরাই বুয়েটসহ নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়। তাদের মাঝে যদি এই অমানবিক মানসিকতা থাকে তাহলে এই মেধা নিয়ে কি করব? আজকে এই প্রশ্ন আমাদের নিজেদের করতে হবে এবং এর জন্য পুনরাবৃত্তি না হয় সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা যারা আজকে শিক্ষার্থী রয়েছে তাদেরকে একটা মৌলিক প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কি শুধুমাত্র পরীক্ষার খাতায় নাম্বার পাওয়ার জন্য শিক্ষা গ্রহণ করছি? আমাদের ভালো ছাত্র হওয়ার চেয়ে দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়া বেশি জরুরি।
সভাপতির বক্তব্যে বুয়েট এ্যালামনাইয়ের সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, বুয়েট প্রতিষ্ঠার ১৫৪ বছরে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সবচেয়ে মর্মান্তিক এবং মারাত্মক। সারাদেশ এবং সারাবিশ্বে এ ঘটনা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আশা করছি এর সুষ্ঠু এবং কার্যকরী বিচার হবে।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় বুয়েট এ্যালামনাই কর্মসূচি পালন করেছে। কর্মসূচিতে আমাদের দাবির মধ্যে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি বন্ধ করা। পুরো শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দুরবস্থা দূর করতে হলে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি বন্ধ করার মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার খারাপ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব।
উপচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম নিহত আবরারের বিদেহী আত্নার মাগফেরাত কামনা করে বলেন, আমি আমার বক্তব্যের প্রথমে আবরারের বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা এবং সকল ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে স্মরণ করছি। বুয়েট এ্যালামনাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি এরকম সুন্দর একটি অনুষ্ঠান উপহার দেওয়ার জন্য। তিনি আরও বলেন, আমাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে। সনাতনী চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক চিন্তা নিয়ে বিশ্বের দরবারে দাড়াতে হবে। এ কাজে বুয়েট এ্যালামনাই এসোসিয়েশনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তার বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক আইনুন নিশাত। এছাড়া আরও বক্তব্য রাখেন বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের পরিচালক ও বুয়েট এ্যালামনাইয়ের সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান এবং বুয়েট এ্যালামনাইয়ের মহাসচিব ড. সাদিকুল ইসলাম ভূঁইয়া।
দিনব্যাপী এ আয়োজনে ছিল বিভিন্ন কর্মসূচিতে ঠাঁসা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে ছিল জুমার নামাজ আদায়ের বিরতি। এরপরই মধ্যাহ্নভোজ। দুপুর আড়াইটা থেকে ‘আশা-হতাশা-ভালবাসার বুয়েট’ শীর্ষক স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান শুরু হয়। এটি পরিচালনা করেন অধ্যাপক আইনুন নিশাত। দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের মধ্যে আরও ছিল র্যাফেল ড্র, ক্রীড়া, গেমস ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রমুখ।
দিনব্যাপী এ মিলনমেলায় বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা সপরিবারে যোগ দেন। পরিবারের সদস্যদের জন্য অনুষ্ঠানকে আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে চা-কফি, আইসক্রিম দিয়ে আপ্যায়নের ব্যবস্থা ছিল। অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের দ্বারেই অতিথি অভ্যাগতদের বিভিন্ন উপহারে বরণ করে নেয়া হয়। এ্যালামনাইদের দেয়া হয় ব্যাগ, টি-শার্ট, স্পাউজদের দেয়া হয় আকর্ষণীয় জিনিস এবং ছোটদের দেয়া হয় রং-বেরংয়ের খেলনা এবং আরও কত কি! এছাড়া সবার জন্য ছিলো ইউনিক গিফট।