নোবিপ্রবি
টিডিসি সম্পাদিত © সংগৃহীত
প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুই দশক পেরিয়ে গেলেও নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘রিজেন্ট বোর্ড’-এ নিশ্চিত হয়নি শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের প্রতিনিধিত্ব। আইনের ধারা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটদের মধ্য থেকে নির্বাচিত ৫ জন প্রতিনিধি রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রতিষ্ঠার ২০ বছরেও তার বাস্তব কোনো প্রয়োগ নেই। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়টির মূল আইনে সরাসরি কোনো ‘ছাত্র প্রতিনিধি’ রাখার বিধানই রাখা হয়নি, যা রাখতে হলে প্রয়োজন আইন সংশোধনের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০১-এর ১৮ (১) ধারায় রিজেন্ট বোর্ড গঠনের সুস্পষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। উক্ত ধারার (ঝ) উপ-ধারায় বলা হয়েছে, ‘রিজেন্ট বোর্ডে সদস্য হিসেবে থাকবেন—রেজিস্টারভুক্ত গ্র্যাজুয়েটগণ কর্তৃক তাঁহাদের মধ্য হইতে নির্বাচিত পাঁচজন প্রতিনিধি, যাঁহারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বেতন ভোগী কর্মকর্তা বা কর্মচারী হইবেন না।’
একই আইনের ১৮ (২) উপ-ধারায় উল্লেখ রয়েছে, ‘এই প্রতিনিধিদের নির্বাচন সংবিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া ১৮(৩) ধারা অনুযায়ী, নির্বাচিত এই সদস্যদের মেয়াদ হবে ৩ বছর।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই ধরনের কোনো নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেয়নি প্রশাসন। ফলে আইনি অধিকার থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ দুই দশক ধরে গ্র্যাজুয়েটরা তাদের এই প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অন্যদিকে দেশের প্রাচীন ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিনেট বা সিন্ডিকেটে ছাত্র সংসদ থেকে নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধি রাখার বিধান থাকে। কিন্তু নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০১ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এর রিজেন্ট বোর্ডের গঠনতন্ত্রে সরাসরি কোনো ছাত্র প্রতিনিধি রাখার কথা উল্লেখই নেই।
আরও পড়ুন: মাতৃত্বকালীন সময়ে ছাত্রীদের জন্য বিশেষ ছাড় দিচ্ছে রাবি
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিনির্ধারণী বোর্ডে বর্তমান শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে কথা বলার কোনো প্রতিনিধি না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে রিজেন্ট বোর্ডে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল আইন সংশোধন করা জরুরি। ফলে বর্তমান ও প্রাক্তন উভয় ধরনের শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের কোনো মতামত ও প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সব নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
নীতিনির্ধারণী ফোরামে নিজেদের প্রতিনিধি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গ্র্যাজুয়েট বলেন, ‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হচ্ছে তার শিক্ষার্থীরা। পড়াশোনা শেষ করে বের হয়ে যাওয়ার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার আইনি সুযোগ আমাদের দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, দুই দশক ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই ধারাটি পুরোপুরি চেপে গেছে। গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি থাকলে আবাসন সংকট, সেশনজট কিংবা শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানমুখী সিলেবাস প্রণয়নে তারা সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে রিজেন্ট বোর্ডে গ্র্যাজুয়েটদের অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত জরুরি। অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে সিনেট বা সিন্ডিকেটে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধিরা বড় ভূমিকা রাখছেন, সেখানে নোবিপ্রবিতে তা না থাকা দুঃখজনক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ তামজিদ হোছাইন চৌধুরী বলেন, ‘গ্র্যাজুয়েটদের রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে এখনো তালিকা করা হয়নি। কিছু প্রক্রিয়া আছে, আগে তালিকাভুক্ত করে এরপর নির্বাচন করতে হবে। আর ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন যেহেতু আইনে নেই, তাই সেটা সম্ভব নয়। করতে হলে আইন সংশোধন করতে হবে।’
আরও পড়ুন: ১০ হাজার নতুন পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ দেবেন সরকার
গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি রাখার বিষয়ে নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, ‘আইনটা আমি ভালো করে দেখব। এ পর্যন্ত কেউ তো আসলে করেনি। আইনগত অবস্থা পর্যালোচনা করে দরকার হলে নেব।’ ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয়ে বলেন, ‘এটা তো আমাদের আইনে নেই, তাই সম্ভব নয়। এটা করতে হলে সংসদে আইন সংশোধন করতে হবে, যেটা জটিল প্রক্রিয়া।
তিনি আরও বলেন, ‘এ ক্যাম্পাসকে শিক্ষার্থীবান্ধব করতে আমার যা করণীয়, সর্বোচ্চটুকু দিয়ে করব। সে আলোকে যে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন, গ্রহণ করব। আমার আসলে ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ নেই। এ বিশ্ববিদ্যালয়কে উঁচু একটা অবস্থানে নিয়ে যেতে পারলেই আমি স্বার্থক।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের দাবি অবিলম্বে ‘রেজিস্টারভুক্ত গ্র্যাজুয়েট' তালিকা প্রণয়ন করে আইন অনুযায়ী নির্বাচন দিয়ে যোগ্য ৫ জন প্রতিনিধি নিশ্চিত করতে হবে। এর পাশাপাশি আইন সংশোধনের মাধ্যমে ‘ছাত্র প্রতিনিধি’ অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক ও গণতান্ত্রিক করার আহ্বান জানান তারা।