নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় © সংগৃহীত ও সম্পাদিত
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ১১৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকার মূল বাজেট অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। সম্প্রতি ইউজিসি থেকে প্রকাশিত বাজেট বরাদ্দপত্র থেকে এই তথ্য জানা গেছে। তবে এই বাজেটের সিংহভাগ অর্থই ব্যয় হবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায়। অন্যদিকে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে বিবেচিত ‘গবেষণা ও উদ্ভাবন' খাতে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে এবার কোনো সরাসরি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, পূর্ববর্তী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সরকারি বরাদ্দের ভিত্তিতে সংশোধিত বাজেট ছিল ১০৮ কোটি ৩০ লাখ ৯০ হাজার টাকা। সেই তুলনায় চলমান অর্থবছরের মূল বাজেট ১০ কোটি ৩ লাখ ১ হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চলমান কার্যক্রমসহ সংশোধিত বাজেটের পরিমাণ ছিল ১১৮ কোটি ৬৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। ফলে সার্বিকভাবে বর্তমান অর্থবছরের মূল বাজেট পূর্ববর্তী বছরের সামগ্রিক খরচের তুলনায় ৩১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা সংকুচিত হয়েছে। প্রতি বছর শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়লেও সামগ্রিক বাজেট কমে যাওয়ায় মাথাপিছু শিক্ষার্থীর পেছনে সরকারি বরাদ্দের পরিমাণ কমেছে।
ইউজিসি থেকে অনুমোদিত বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নোবিপ্রবিতে মোট আবর্তক (পরিচালন) অনুদান খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১০৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং মূলধন (উন্নয়ন) অনুদান খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট বাজেটের ৯০.৩০ শতাংশই চলে যাচ্ছে আবর্তক বা দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয়ে, যেখানে স্থায়ী সম্পদ সৃষ্টি বা অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য থাকছে মাত্র ৯.৭০ শতাংশ। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করায় শিক্ষার্থীদের সেমিস্টার ও ভর্তি ফি বৃদ্ধির মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণের একটি পরোক্ষ চাপ তৈরি হতে পারে।
বরাদ্দের সবচেয়ে বড় অংশ গ্রাস করবে বেতন-ভাতা ও সংশ্লিষ্ট সুবিধা খাত। এ খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৮ কোটি ৬৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা, যা মোট বাজেটের সর্বোচ্চ ৬৬.৪৫ শতাংশ। এর মধ্যে কর্মকর্তাদের বেতনের জন্য ৩৬ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, কর্মচারীদের বেতনের জন্য ৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, বিশেষ সুবিধার জন্য ৪ কোটি ৮৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ভাতাদি বাবদ সহায়তা ২৯ কোটি ২৫ লাখ ১৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজেটের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি অর্থ সংস্থাপন ব্যয়ে চলে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য অ্যাকাডেমিক উন্নয়ন কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
পণ্য ও সেবা বাবদ সহায়তা খাতে মোট ২৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মোট বাজেটের ২২.৬৭ শতাংশ। এর মধ্যে সাধারণ পণ্য ও সেবা খাতে ২২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং বিশেষ পণ্য ও সেবা খাতে ৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন যন্ত্রপাতি (৭.২৯ কোটি) ও যানবাহন (৩.০৪ কোটি) ক্রয়ের বড় বরাদ্দের তুলনায় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতের বাজেট পর্যাপ্ত নয়। উপকূলীয় নোনা আবহাওয়ার কারণে নোবিপ্রবির ল্যাব সরঞ্জাম দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, যেখানে রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট কম হওয়া উদ্বেগজনক।
এছাড়া মূলধন খাতের মোট ১১ কোটি ৮৪ লাখ টাকার মধ্যে যন্ত্রপাতি অনুদান খাতে ৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা, যানবাহন বাবদ অনুদান ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অনুদান ৭৫ লাখ টাকা এবং অন্যান্য মূলধন অনুদানে ৪০ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। পেনশন ও অবসর সুবিধা খাতে এবার বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা যা মোট বাজেটের ০.৯৬ শতাংশ। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে ১০ লাখ টাকা এবং অন্যান্য অনুদান খাতে ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
পূর্ববর্তী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে যেখানে নোবিপ্রবির নিজস্ব গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল, সেখানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল বাজেটে বরাদ্দ এক লাফে ‘শূন্য’ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউজিসি বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান উন্নত করার তাগিদ দিলেও গবেষণা খাতে ‘শূন্য' বরাদ্দ নোবিপ্রবিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও পিছিয়ে দেবে।
গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে বরাদ্দ ইউজিসি কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করবে জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব দপ্তরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বলেন, ‘ইউজিসি কর্তৃপক্ষ এবার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে সরাসরি আলাদা বরাদ্দ দেয়নি। এটি তারা কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করবে বলে জানতে পেরেছি। তবে নোবিপ্রবি এই খাত থেকে পরবর্তীতে প্রতিযোগিতামূলক প্রকল্পের মাধ্যমে কত টাকা বরাদ্দ পাবে তা এখনও জানানো হয়নি।'
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, ‘একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল প্রাণ হলো গবেষণা। ইউজিসি কেন্দ্রীয়ভাবে গবেষণা ফান্ড নিয়ন্ত্রণ করবে জেনেছি। যার কারণে এই খাতে কোনো বরাদ্দ দেয়নি।’
শিক্ষার্থীদের সেমিস্টার ও ভর্তি ফি বৃদ্ধির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জিত রাজস্ব ঘাটতি পূরণের একটি পরোক্ষ চাপ তৈরি হতে পারে কিনা জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের উপর বোঝা চাপিয়ে এই বাজেট পূরণ করার কোনো পরিকল্পনা এই অর্থবছরে নেই। যদি কোনো ঘাটতি তৈরি হয় তবে সেটা ইউজিসি থেকে পূরণ করার চেষ্টা করা হবে।'
আবর্তক বনাম মূলধন বাজেটের ভারসাম্যহীনতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘এই অর্থবছরে আমরা ১৮১ কোটি বাজেট চেয়েছিলাম। কিন্তু যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেটি পূর্বের তুলনায় প্রায় একই। এটির বাস্তবতাও আছে, চলমান অর্থ সংকটের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে চাহিদা সে অনুযায়ী বাজেট পাইনি। তবে আশা রাখি ভবিষ্যতে মূলধন বাজেট বাড়িয়ে এই ব্যবধান কমিয়ে আনার চেষ্টা থাকবে।’