নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় © সংগৃহীত
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ২০তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে অনুষদভিত্তিক সর্বোচ্চ ফলধারী শিক্ষার্থীদের ‘ডিনস অ্যাওয়ার্ড’ প্রদানের উদ্যোগে চরম সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠেছে। আগামী ২২ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে এই অ্যাওয়ার্ড প্রদানের কথা থাকলেও মাত্র এক দিনের ব্যবধানে পূর্বঘোষিত তালিকা সংশোধন করে একাধিক শিক্ষার্থীর নাম বাদ এবং নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করায় বিশ্ববিদ্যালয়ে তীব্র বিতর্ক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ জুন নোবিপ্রবি রিসার্চ সেল উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী, উপ-উপাচার্য ও রিসার্চ সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ২২ শিক্ষার্থীর একটি অফিশিয়াল তালিকা প্রকাশ করে। কিন্তু এর ঠিক একদিন পরই, ১৮ জুন ডিনস অফিস থেকে আগের তালিকা কাটছাঁট করে ৩ জনকে বাদ দিয়ে নতুন করে ৪ জনের নাম যুক্ত করে সংশোধিত তালিকা পাঠানো হয়।
এ ছাড়া বিএমবি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের উত্তীর্ণদের বাদ দিয়ে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত কর হয়। শিক্ষা বিজ্ঞান অনুষদের সেশন-সংক্রান্ত জটিলতায় ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে রদবদল করা হয়। সংশোধিত তালিকাটি এখনো দাপ্তরিকভাবে চূড়ান্ত অনুমোদন না পেলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
অফিশিয়াল তালিকা অনুযায়ী অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা হলেন ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদ থেকে নাহিন সুলতানা লিজা (ইইই), নিলয় দাস (আইসিই) ও হৃদয় বণিক (ইইই)। বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ থেকে নাফিসা জান্নাতুল মাওয়া (এমআইএস), সাদিউল আলম চৌধুরী (ব্যবসায় প্রশাসন) ও এমরান হোসাইন (ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট)। জীববিজ্ঞান অনুষদে মো. রকিবুল হাসান (অণুজীববিজ্ঞান), ফজলে রাব্বী শুভ (ফার্মেসি) ও সুকন্যা সাহা (বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি)। আইন অনুষদে মো. মুবদি ইসলাম (আইন)। বিজ্ঞান অনুষদে ইশরাত জাহান (পরিসংখ্যান), মনিকা ধর (সমুদ্রবিজ্ঞান) ও নাদিয়া জাহান (সমুদ্রবিজ্ঞান)। কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে ইশরাত জাহান ইভা (ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট), সাদিয়া সুলতানা (সমাজকর্ম) ও মোসাম্মৎ কামরুন নাহার (অর্থনীতি)।
আরও পড়ুন: এনটিআরসিএ শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারবে, এটা আইনের কোথাও নেই
এ ছাড়া ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষা বিজ্ঞান অনুষদে রাহনুমা নূরাইন (শিক্ষা), হাফসা আক্তার (শিক্ষা প্রশাসন) ও আরাফাত উল্লাহ আরমান (শিক্ষা); বিজনেস স্টাডিজ অনুষদে মারিয়া তাবাসসুম (এমআইএস), আয়েশা সিদ্দিকা (ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট) ও ডালিয়া রানী শর্মা (ব্যবসায় প্রশাসন)।
ডিন অফিসসমূহের তথ্য অনুযায়ী, আগের তালিকা থেকে মোট ৩ জন শিক্ষার্থীর নাম সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয় এবং ৪ জনের নাম নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদে (২০১৯-২০ সেশন) ইইই বিভাগের হৃদয় বণিকের নাম বাদ দিয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসটিই) বিভাগের মনীষা মজুমদারের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিজ্ঞান অনুষদ (২০১৯-২০ সেশন) সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের নাদিয়া জাহানের নাম বাদ দিয়ে ফলিত গণিত বিভাগের সাবরিনা সুলতানা রিচির নাম যুক্ত করা হয়। এ ছাড়া শিক্ষাবিজ্ঞান অনুষদের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের আরাফাত উল্যাহ আরমানের (শিক্ষা) নাম বাদ দিয়ে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের নতুন দুজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন সংযোজিত দুজন হলেন তাসফিয়া নওয়ার ইরা (শিক্ষা) ও মুসলিমা আফরোজ শম্পা (শিক্ষা প্রশাসন)।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের দাবি, গত ১৭ জুন প্রথম তালিকা প্রকাশের পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে তাদের প্রত্যেককে ব্যক্তিগতভাবে ফোন দিয়ে ডিনস অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। প্রশাসনের দায়িত্বশীল জায়গা থেকে ফোন পেয়ে তারা সবাই উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন এবং পরিবার ও সহপাঠীদের সঙ্গে আনন্দের এই খবর ভাগ করে নেন। কিন্তু কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ বা পূর্বাবাস ছাড়াই সংশোধিত তালিকায় নিজেদের নাম বাদ পড়তে দেখে চরম ধাক্কা খান তারা। প্রশাসনের এমন অপেশাদার ও দায়িত্বহীন আচরণে এসব মেধাবী শিক্ষার্থীদের আনন্দ মুহূর্তেই মলিন হয়ে যায়, যা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
তালিকা থেকে বাদ পড়ায় তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। বিজ্ঞান অনুষদের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে বাদ পড়া শিক্ষার্থী নাদিয়া জাহান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটা নিয়ে আমি আর কিছু বলতে চাই না। এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, যা অপমান করার করে ফেলছে। আটটি সেমিস্টার, এসএসসি, এইচএসসি রেজাল্ট দেখার পর আমাকে সিলেক্ট করা হয়েছিল। এরপরও বিভাগ একই হবার অজুহাতে বাদ পড়াটা খুবই দুঃখজনক।’
আরও পড়ুন: আগামী দিনে টেক্সটাইল খাতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে বুটেক্স: শিক্ষামন্ত্রী
অন্যদিকে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ইইই বিভাগ থেকে বাদ পড়া শিক্ষার্থী হৃদয় বণিক বলেন, ‘কেন বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটা তো জানি না। তবে হয়তো কোনো যৌক্তিক নিয়ম ছিল। আর প্রথমে হয়তো কোনো মিসক্যালকুলেশনে আমার নামটা চলে এসেছিল।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ সেল সূত্রে জানা যায়, নোবিপ্রবি ‘ডিনস অ্যাওয়ার্ড সংক্রান্ত নীতিমালা (প্রস্তাবিত)-২০২৫’-এর ৪ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একই অনুষদের অন্তর্গত একাধিক বিভাগের মধ্যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট বিভাগ থেকে একই সময়ে সর্বোচ্চ ১ (এক) জন শিক্ষার্থীকে এই অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা যাবে। অর্থাৎ একই অনুষদের একটি বিভাগ থেকে একই শিক্ষাবর্ষে দুজন শিক্ষার্থী এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হতে পারবেন না।
নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রথমে ভুল তালিকা প্রকাশ এবং পরে তা সংশোধনের বিষয়ে অনুষদের ডিন ও রিসার্চ সেলের কর্মকর্তারা ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। নোবিপ্রবি রিসার্চ সেলের ডেপুটি রেজিস্ট্রার কৃষিবিদ ড. মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী বলেন, ‘গত ১৭ তারিখ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদ, বিজ্ঞান অনুষদ এবং শিক্ষা বিজ্ঞান অনুষদের ডিনগণ আমাদের কাছে যে তালিকা প্রেরণ করেছেন, আমরা সেটাই প্রকাশ করি। এখানে ডিন মহোদয়গণ যে যে শিক্ষার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছেন সেই তালিকা কোনো প্রকার পরিবর্তন করার অধিকার আমাদের নেই। মনোনয়নের সম্পূর্ণ দায়িত্ব স্ব স্ব ফ্যাকাল্টটির ডিনদের। গতকাল ১৮ জুন উনারা আমাদের কাছে আবার একটি তালিকা সংশোধিত করে প্রেরণ করলে আমরা তা প্রকাশ করি।’
একই বিভাগ থেকে একাধিক শিক্ষার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার ভুলের বিষয়ে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আশরাফুল আলম বলেন, ‘আমি কিছুদিন আগে দায়িত্ব পেয়েছি। আমরা ডিনস কমিটি বসে অ্যাওয়ার্ড মনোনয়ন করার সময় নীতিমালার ওই বিষয়টি খেয়াল ছিল না যে একই বিভাগ থেকে একজনের বেশি দেওয়া যায় না। পরবর্তী সময়ে রিসার্চ সেল অফিস থেকে জানানোর পর আমরা সংশোধন করে নতুন তালিকা প্রেরণ করি।’
কাছাকাছি ভুল স্বীকার করে বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মহিনুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ডিনস অ্যাওয়ার্ড নীতিমালার একই বিভাগের দুইজনকে যে দেওয়া যায় না সেটি ওভারলুক (এড়িয়ে) করে গেছি। পরবর্তীতে রিসার্চ সেল থেকে জানার পর সংশোধন করে আবার তালিকা পাঠিয়েছি।’
আরও পড়ুন: অনার্সে ভর্তির প্রথম রিলিজ স্লিপ আবেদন শুরু চলতি মাসের শেষে
বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি যোগ করেন, ‘নিয়মের কারণে যেহেতু বাদ দেওয়া হয়েছে, তাই তাদের আবার অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই। তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া আমাদের আসলে কিছুই নেই।’
শিক্ষা বিজ্ঞান অনুষদের নবনিযুক্ত ডিন অধ্যাপক ড. আবিদুর রহমান নিজের দায় এড়িয়ে বলেন, ‘এই তালিকা আসলে আমি পাঠাইনি। আমি দায়িত্ব নিয়েছি এক সপ্তাহ হয়েছে। আগে যিনি ডিন ছিলেন তিনি তালিকাটা পাঠিয়েছিলেন। সেখানে ভুলে একই বিভাগের দুজনকে দেওয়া হয়েছে। আমাদের মধ্যে যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের ভবিষ্যতে সঠিক তথ্য জেনে সঠিকভাবে কাজ করতে হবে।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে নোবিপ্রবি উপ-উপাচার্য ও রিসার্চ সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, এই ভুলটা বিভিন্ন অনুষদের যারা ডিন আছেন, তারা করেছেন। কেননা ডিনস অ্যাওয়ার্ড মনোনয়ন ওই অনুষদের ডিন ও চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব। গতকাল একজন শিক্ষার্থী বলার পর বিষয়টি আমাদের নজরে আসে। যেখানে একই বিভাগ থেকে দুজনকে দেওয়ার নিয়ম নেই। পরবর্তী সময়ে আমরা স্ব স্ব অনুষদের ডিনদের সংশোধিত তালিকা প্রেরণ করার জন্য বলি।’