মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ
মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজে অনিয়ম © এআই জেনারেটেড ছবি
একই সময়ে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার অভিযোগ উঠেছে মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হকের বিরুদ্ধে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি। সরকারি বিধি লঙ্ঘনের মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা বেতন প্রদান, সরকারি ভ্যাট-আয়কর জমা না দেওয়া, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নীতিমালার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়েছে। এসব অনিয়মের ফলে কয়েক কোটি টাকা আর্থিক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্ত প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হকের নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ। পূর্ববর্তী চাকরির অভিজ্ঞতা, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুতর অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে অর্থ ফেরত, ব্যাখ্যা প্রদান এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ আমিনুল হক। তার দাবি একই সঙ্গে দুই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও বেতন নেননি তিনি। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, ‘মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজে যোগদানের ৬ মাস পর তাকে বেতন দেওয়া হয়েছে।’
একই সময়ে দুই প্রতিষ্ঠানে চাকরির অভিযোগ
ডিআইএর প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হক ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। তার নিয়োগ সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের মাধ্যমে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে তার পূর্ববর্তী চাকরির অভিজ্ঞতা যাচাই করে গুরুতর অসঙ্গতি খুঁজে পান ডিআইএর তদন্ত দল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধ্যক্ষ আমিনুল হক ফুলপুর ডিগ্রি কলেজে ১৯৯৫ সালের ২২ জুন থেকে ১৯৯৮ সালের ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ১৯৯৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজেও প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন।
অর্থাৎ ১৯৯৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৯৮ সালের ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় সাত মাস আমিনুল হক একই সঙ্গে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। যা বিধিবহির্ভূত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই চাকরির অভিজ্ঞতা দেখিয়ে পরবর্তীতে তিনি মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজে অধ্যক্ষ পদ বাগিয়ে নেন।
ডিআইএ জানিয়েছে, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ থেকে আমিনুল হক কবে চাকরি ছেড়েছেন, সেই তারিখ অভিজ্ঞতার সনদে উল্লেখ নেই। এছাড়া পরবর্তী কর্মস্থল হযরত শাহ আলী মহিলা কলেজে যোগদানের সময় তিনি মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ থেকে কোনো অব্যাহতি বা ছাড়পত্রও নেননি।
চাকরির শর্ত অনুযায়ী কোনো শিক্ষক একই সময়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে বেতনসহ বা বেতন ছাড়া চাকরি করতে পারেন না। এছাড়া ১৯৯৫ সালের ২৪ অক্টোবরের নীতিমালা অনুযায়ী একই সঙ্গে একাধিক চাকরিতে নিয়োজিত থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হকের অভিজ্ঞতার সনদেই একই সময়ে দুই প্রতিষ্ঠানে চাকরির তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের গরমিল থাকায় তার আবেদনপত্র বাতিলযোগ্য ছিল। কিন্তু আবেদন বাতিল না করে তাকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে তার নিয়োগ বিধিসম্মত হয়নি বলে জানিয়েছে ডিআইএ।
গ্রন্থাগারিকের বেতনেও অনিয়ম
ডিআইএর প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের গ্রন্থাগারিক দিলরুবা শারমীন ১৯৯৪ সাল থেকে সরকারি বেতন গ্রহণ শুরু করলেও সে সময় তার গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে ডিপ্লোমা ডিগ্রি ছিল না। তিনি ডিপ্লোমা অর্জন করেন ১৯৯৭ সালে। বিধি অনুযায়ী ডিপ্লোমা অর্জনের পর ১৯৯৮ সালের ১ জুলাই থেকে সরকারি বেতন পাওয়ার কথা থাকলেও তিনি ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকেই বেতন-ভাতা নিচ্ছেন। ফলে এই সময় বেতন-ভাতা বাবদ নেওয়া ৯৬ হাজার ৭২ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতের সুপারিশ করেছে ডিআইএ।
ভ্যাট-আয়কর জমা না দেওয়ার অভিযোগ
ডিআইএর নিরীক্ষায় দেখা গেছে, বিভিন্ন ব্যয় খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও সরকারি ভ্যাট ও আয়কর কেটে কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ কর্তৃপক্ষ ভ্যাট বাবদ ৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা জমা দেয়নি। এছাড়া আয়কর বাবদ ৪ লাখ ৫ হাজা টাকা এবং কমিটির সদস্যদের সম্মানীর উৎসে কর বাবদ আরও প্রায় ৭৬ হাজার টাকা ফাঁকি দিয়েছে। এই টাকা আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
শিক্ষক-কর্মচারীদের নিজস্ব তহবিল থেকে বেতন
ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল থেকে বেতন-ভাতা দেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২৩ সালের ৩১ জুলাইয়ের প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল থেকে বেতন দেওয়া যাবে না।
কিন্তু প্রতিষ্ঠানে ২০২৩-২৪, ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মোট ১ কোটি ৯৮ লাখ ৪৫ হাজার ৪৪১ টাকা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আদায় করে প্রতিষ্ঠানের সাধারণ তহবিলে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে ডিআইএ।
শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি ফি ও সেশন চার্জ সরকার নির্ধারিত ৫ হাজার টাকার পরিবর্তে ৭ হাজার ৫০০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে। এছাড়া অনলাইন আবেদন ফি, দৈনিক পত্রিকা ফি, কলেজ প্রতীক ফি, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা ফি, টিউটোরিয়াল ফি, রক্ষণাবেক্ষণ ফিসহ বিভিন্ন নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছে কর্তৃপক্ষ। এসব অর্থ শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কাছে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
রেজিস্ট্রেশন ও কেন্দ্র ফিতেও অতিরিক্ত আদায়
বোর্ড ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নির্ধারিত রেজিস্ট্রেশন ফি এবং কেন্দ্র ফির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। এছাড়া প্রশংসাপত্র, প্রত্যয়নপত্র এবং টিসি প্রদানের ক্ষেত্রেও অর্থ আদায় করা হয়েছে, যদিও এ বিষয়ে কোনো নীতিগত অনুমোদন নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া হয়নি। হয়তো শিক্ষকরা বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে যে টাকা পান সেটা থেকে ভ্যাট দেননি দেখে এমন হয়েছে। আমরা নিয়মিত ভ্যাট পরিশোধ করি। এছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছে কোনো অতিরিক্ত ফি নেওয়া হয় না। যদিও সাড়ে ৫ হাজার টাকার ফি সাড়ে ৭ হাজার টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ।’