প্রতীকী ও মাউশি লোগো © টিডিসি সম্পাদিত
বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার সরকারি সোনাতলা মডেল উচ্চ বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। প্রতিষ্ঠানটিতে সহকারী শিক্ষকেরও সংকট রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ৮ জন সহকারী শিক্ষক রয়েছেন। অথচ থাকার কথা ১২ থেকে ১৫ জন। এর মধ্যে পদার্থ, রসায়ন এবং গণিতের মতো বিষয়ের শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ইংরেজি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক মোছা. আয়েশা আকতার জানান, ‘শিক্ষক সংকট থাকায় ক্লাস নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এক বিষয়ের শিক্ষক আরেক বিষয়ের ক্লাস নিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠান প্রধান না থাকায় স্কুল পরিচালনায় নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। প্রধান শিক্ষক এবং অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষকের পদ পূরণ হলে পাঠদানের মান উন্নয়ন হবে। স্কুলের ফলাফলও ভালো হবে।
সরকারি সোনাতলা মডেল উচ্চ বিদ্যালয় নয়, দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং সহকারী শিক্ষক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট থাকায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের শিখন এবং শিক্ষার মানে।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক সংকট নিয়ে একটি তালিকা করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। তালিকাটি গত এপ্রিল মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তালিকায় থাকা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫৮৬টি সরকারি স্কুলে প্রতিষ্ঠানপ্রধান, সহকারী প্রধান এবং সহকারী শিক্ষকের মোট পদ রয়েছে ১৬ হাজার ৬০১টি। এর মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ১৩ হাজার ১৯২ জন। আর পদ ফাঁকা রয়েছে ৩ হাজার ৪০৯টি পদ।
শিক্ষকদের অবসর, পদোন্নতিসহ নানা কারণে পদ শূন্য হয়। শূন্য পদের চাহিদা পাওয়ার তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। পদ পূরণে সরকারি কর্ম কমিশনের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনাও হয়েছে। কীভাবে শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা যায় সেই চেষ্টা করা হচ্ছে।—অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল, মহাপরিচালক, মাউশি
প্রাপ্ত তথ্য ঘেটে দেখা গেছে, বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ রয়েছে ৫৮৬টি। এর মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ২০৩ জন। আর শূন্য পদের সংখ্যা ৩৮৩টি। অর্থাৎ, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ৬৫ দশমিক ৪ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে।
সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ রয়েছে ৭২২টি। এর মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ৪৭৩ জন। আর শূন্য পদের সংখ্যা ২৪৯টি। অর্থাৎ, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষকের প্রায় ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে।
এছাড়া বিষয়ভিত্তিক সহকারী শিক্ষকের পদ রয়েছে ১৫ হাজার ২৯৩টি। এর মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ৮ হাজার ৯০০ জন। ৩ হাজার ৬১৬ জন সিনিয়র শিক্ষক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। পদ শূন্য রয়েছে ২ হাজার ৮৪২টি। অর্থাৎ, বিষয়ভিত্তিক সহকারী শিক্ষকের প্রায় ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ পদ শূন্য। সিনিয়র শিক্ষকের ৪ হাজার ৩০টি শূন্য পদ যুক্ত করলে শূন্য পদের হার আরও বেশি হয়। তবে সৃজনকৃত পদের বাইরে অন্য পদের সংখ্যা যুক্ত করার বিধান না থাকায় সেই হিসেব তুলে ধরা হয়নি।
সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষক সংকট রয়েছে জানিয়ে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শিক্ষকদের অবসর, পদোন্নতিসহ নানা কারণে পদ শূন্য হয়। শূন্য পদের চাহিদা পাওয়ার তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। পদ পূরণে সরকারি কর্ম কমিশনের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনাও হয়েছে। কীভাবে শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা যায় সেই চেষ্টা করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্কুলগুলোতে শিক্ষক সংকট থাকলেও পাঠদান থেমে নেই। বিকল্প হিসেবে অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন। শিক্ষক ঘাটতি মেটাতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকরাই অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।’
বিদ্যালয় পরিদর্শক ও সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসারের অবস্থা আরও করুণ
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের তীব্র সংকট থাকলেও বিদ্যালয় পরিদর্শক, সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক ও সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসারের শূন্য পদের অবস্থা আরও করুন। এই তিন পদে বর্তমানে কোনো জনবলই নেই বলে মাউশির তৈরিকৃত তালিকা থেকে জানা গেছে।
তালিকার তথ্য বলছে, বর্তমানে বিদ্যালয় পরিদর্শকের পদ রয়েছে ১৬টি। ১৬টি পদই শূন্য। একই ভাবে সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শকের ১৬টি পদও শূন্য। এ ছাড়া সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসারের ৬৪টি পদের সবগুলোই শূন্য রয়েছে। আর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের ৬৪টি পদের মধ্যে ৪১ জন কর্মরত। শূন্য রয়েছে ২৩টি পদ।
সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের পদ শূন্য থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের। বাড়তি চাপে দায়িত্ব পালনে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাদের। দেশের অন্তত তিনজন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে তারা এ কথা জানিয়েছেন। তবে কেউ নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্কুলে শিক্ষক সংকট, সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ অন্যান্য পদগুলো পূরণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি।—শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা
চট্টগ্রাম বিভাগের এক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘শিক্ষা অফিসগুলাতে পর্যাপ্ত কর্মকর্তার অভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়মের তদন্ত থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজেও বেগ পেতে হচ্ছে। বিষয়গুলো একাধিকবার মন্ত্রণালয়কে জানানো হলেও পদ পূরণে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
এ বিষয়ে জানতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিনের নম্বরে কল দেওয়া হলে তিনিও ফোন রিসিভ করেননি।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘স্কুলে শিক্ষক সংকট, সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ অন্যান্য পদগুলো পূরণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
শিক্ষক সংকটের প্রভাব এসএসসির ফলে
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ অনেকাংশেই নির্ভর করে দক্ষ ও সক্রিয় নেতৃত্ব এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষকের ওপর। কিন্তু দেশের অনেক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের শেখার মান ও পরীক্ষার ফলাফলে।
প্রধান শিক্ষক একটি বিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম, শিক্ষক ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত তদারকিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে কোনো বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলে প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি পাঠদানেও সমন্বয়হীনতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি, শ্রেণি কার্যক্রমের তদারকি, দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করা এবং শিক্ষার মান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্বের ঘাটতি তৈরি হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সহকারী শিক্ষকের সংকট। অনেক বিদ্যালয়ে ইংরেজি, গণিতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যিক বিষয়ের শিক্ষক পর্যাপ্ত নেই। কোথাও আবার শিক্ষকস্বল্পতা সামাল দিতে একজন শিক্ষককে তার নিজ বিষয়ের বাইরে অন্য বিষয়ও পড়াতে হচ্ছে। এতে কোনোভাবে শ্রেণি কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হলেও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতি শিক্ষার্থীদের শেখার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকটের বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের তুলনামূলকভাবে দুর্বল ফল এসেছে গণিত ও ইংরেজিতে। অথচ এই দুই বিষয়েই যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক থাকার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গণিত ও ইংরেজি শিক্ষকদের ৮০ শতাংশের বেশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী নন। ফলে বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগকে কতটা প্রভাবিত করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এবারের এসএসসি ফলাফলের সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগের। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। পরীক্ষার ফলকে কোনো একটি কারণে ব্যাখ্যা করা যায় না; তবে শিক্ষকস্বল্পতা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতি এবং বিদ্যালয় পরিচালনায় নেতৃত্বের সংকট এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শিক্ষকের ঘাটতির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে বিদ্যালয় পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন পদেও শূন্যতা রয়েছে। আঞ্চলিক বিদ্যালয় পরিদর্শক, সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম তদারক করেন। এসব পদে পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে বিদ্যালয়ের পাঠদান, শিক্ষক উপস্থিতি, একাডেমিক কার্যক্রম ও শিক্ষার মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।