আশা নিয়ে বসে আছেন কর্মকর্তারা © এ আই সম্পাদিত ছবি
গত ১২ বছর ধরে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের প্রভাষক পদে কর্মরত শত শত কর্মকর্তা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। ৩২ ও ৩৩তম বিসিএস ব্যাচের চার শতাধিক প্রভাষক চাকরিতে যোগদানের এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কোনো পদোন্নতি পাননি। একইভাবে ৩৪তম বিসিএস ১১ বছর, ৩৫ বিসিএস ১০ বছর বছর এবং ৩৬ বিসিএস ক্যাডারদের চাকরির বয়স ৯ বছর হয়েছে। অথচ এই ব্যাচগুলোর কোনো প্রভাষকই পদোন্নতি পাননি। অথচ একই সাথে যোগদান করে অন্য ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যেই একাধিক ধাপে পদোন্নতি পেয়েছেন। আগামীকাল বুধবার থেকে শুরু হতে যাওয়া ডিপিসি মিটিংয়ের মাধ্যমে পদোন্নতির উদ্যোগ শুরু হতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষকদের পদোন্নতির বিষয়টি ইতিবাচক ভাবে দেখা হচ্ছে। আগামীকাল বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) থেকে শুরু হতে যাওয়া ডিপিসি (Departmental Promotion Committee) সভায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ডিপিসি সভায় প্রভাষকদের পদোন্নতির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি না হওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা দেকা দিয়েছে। বিষয়টি আমরা অনুধাবন করেছি। পদোন্নতি বঞ্চিত প্রভাষকদের জন্য কিছু একটা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিসিএস ৩৩তম ব্যাচের শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা ২০১৪ সালের ৭ আগস্ট চাকরিতে যোগ দেন। কিন্তু চাকরির ১২ বছর পূর্ণ হলেও প্রায় ৩৬৪ জন প্রভাষক এখনো পদোন্নতি পাননি। ৩২তম বিসিএসের ৫৮ জন কর্মকর্তাও একইভাবে পদোন্নতি বঞ্চনার শিকার। ২০১৬ সালে ৩৪ বিসিএস ব্যাচ এবং ২০১৭ সালে বিসিএস ৩৫ ব্যাচ যোগদান করেন। অথচ এরই মধ্যে ৩৭তম ব্যাচ পর্যন্ত পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন। অন্যদিকে একই ব্যাচের অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যেই প্রথম পদোন্নতি পেয়ে দ্বিতীয় ধাপের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এদিকে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ের পদোন্নতি গত ১৭ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ পদোন্নতির জন্য ২০২৫ সালের ৪ জুন ডিপিসি (Departmental Promotion Committee) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেই বৈঠকের পরও কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। আত্তীকৃত শিক্ষকদের মামলার অজুহাতে পদোন্নতি প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা হয়েছে। অথচ আদালতের কোনো পর্যবেক্ষণেই পদোন্নতি স্থগিত রাখার নির্দেশনা নেই।
মাউশি (মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সূত্র বলছে, পদোন্নতির মূল বাধা শূন্য পদের সংখ্যা ও অনুমোদন নিয়ে মতভেদ। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে পদোন্নতির সুযোগ প্রায় ৫০০ জন কর্মকর্তার জন্য। অন্যদিকে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা অ্যাসোসিয়েশন বলছে, প্রকৃত শূন্য পদ সংখ্যা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ এর মধ্যে। এছাড়া ইতোমধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর রিজার্ভ পদ সৃষ্টির জন্য মন্ত্রণালয়ে ফাইল প্রেরণ করেছেন।
অন্য ক্যাডারের ৩৬তম ব্যাচ ২০২৩ সালে এবং ৩৭তম ব্যাচ ২০২৪ সালে পদোন্নতি পেয়েছেন। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন, ব্যাংকাররা ৬ষ্ঠ/৫ম গ্রেডে এমনকি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও চলে গেছেন ৬ষ্ঠ গ্রেডে। চলতি সপ্তাহেও বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে পাঁচ শতাধিকেরও অধিক কর্মকর্তার সুপারনিউমারি পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অথচ শিক্ষা ক্যাডারে প্রভাষক পর্যায়ের ৩২-৩৭ ব্যাচ পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার কর্মকর্তা পদোন্নতির সব যোগ্যতা অর্জন করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের আহবায়ক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘প্রভাষকদের দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি না হওয়ার বিষয়টি নিয়ে সরকার কাজ করছে। ডিপিসি সভায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হবে। আশা করছি সরকার বিষয়টি সমাধানে উদ্যোগ নেবে।’
এদিকে পদোন্নতি বঞ্চিত শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষকরা বলছেন, একজন শিক্ষক যখন বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করেন, তখন তার পদোন্নতি কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিষয় থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে তার পেশাগত স্বীকৃতি, সামাজিক মর্যাদা, কর্মপ্রেরণা ও রাষ্ট্রের কাছে তার অবদানের মূল্যায়ন। পদোন্নতি বিভিন্ন অনিশ্চয়তার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। পদোন্নতি না হওয়ায় তারা মানসিক যন্ত্রনায় ভুগছেন।
রাজধানীর একটি কলেজের পদোন্নতি বঞ্চিত এক প্রভাষক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে অন্যান্য ক্যাডারে যোগদানকারী সহকর্মীরা ইতোমধ্যে একাধিক পদোন্নতি পেয়ে উচ্চ পদে চলে গেছেন। অথচ আমরা যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও ১২ বছর ধরে প্রভাষক পদেই আটকে আছি। এটি কেবল ব্যক্তিস্বার্থের হানি নয়, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদানের মনোভাব ও মানকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’