মেজর কাজী ইমতিয়াজ কবীর © টিডিসি ফটো
সম্প্রতি মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) দুটি স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি উদ্ভাবনের পেটেন্ট প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৬ সালেই প্রতিষ্ঠানটির একটি দল আন্তর্জাতিক আন্ডারওয়াটার রোবট প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। দুটি খবরই ইঙ্গিত দেয় একটি বড় পরিবর্তনের। একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা শুধু ভবন, শ্রেণিকক্ষ বা পরীক্ষার ফল দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। আসল প্রশ্ন হলো, সেখানে কী গবেষণা হচ্ছে, তা থেকে কী প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে এবং সেই প্রযুক্তি মানুষের জীবন, শিল্প, স্বাস্থ্য ও জাতীয় সক্ষমতায় কতটা কাজে লাগছে। এমআইএসটিতে গবেষণা শুধু গবেষণাপত্রে সীমাবদ্ধ নেই। ল্যাবরেটরি থেকে প্রোটোটাইপ, প্রোটোটাইপ থেকে প্রতিযোগিতা, প্রতিযোগিতা থেকে পেটেন্ট এবং সেখান থেকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দিকে একটি দৃশ্যমান ধারা তৈরি হয়েছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে এমআইএসটির সমন্বিত গবেষণা ও প্রণোদনা নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রেখেছে। গবেষণা অনুদান, মানসম্মত জার্নালে প্রকাশনায় উৎসাহ, উদ্ভাবনী প্রকল্পে সহায়তা, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং মেধাস্বত্ব সুরক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় আনা হয়েছে। এর একটি দৃশ্যমান সূচক স্কোপাস-সূচিকৃত গবেষণাপত্র। ২০২২ সালে এমআইএসটির স্কোপাসভুক্ত প্রকাশনা ছিল ২০০। ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয় ২২৫, ২০২৪ সালে ৩৪১ এবং ২০২৫ সালে ৩৪২। অর্থাৎ ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রকাশনা বেড়েছে ৭১ শতাংশ। ২০২৪ সালে বড় উল্লম্ফনের পর ২০২৫ সালেও সেই উচ্চ মাত্রা ধরে রাখা গেছে। এখন গবেষণার মান, উদ্ধৃতি ও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে।
এই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়েও এমআইএসটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং ২০২৬-এ প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবার তালিকাভুক্ত হয়ে ১৫০১+ ব্যান্ডে স্থান পায়। টাইমস হায়ার এডুকেশন ইন্টারডিসিপ্লিনারি সায়েন্স র্যাঙ্কিং ২০২৬-এ প্রথম অংশগ্রহণেই ৪০১-৫০০ ব্যান্ডে জায়গা করে নেয়। ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ভিত্তিক র্যাঙ্কিং ২০২৬-এ এমআইএসটির অবস্থান ১০০১-১২৫০ ব্যান্ডে এবং এশিয়া ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং ২০২৬-এ ৬০১-৮০০ ব্যান্ডে। সাসটেইনেবিলিটি ইমপ্যাক্ট রেটিং ২০২৬-এও এমআইএসটি প্রথমবার অন্তর্ভুক্ত হয়। সেখানে টেকসই নগর ও জনপদে ৪০১-৬০০ এবং মানসম্মত শিক্ষা, সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং শিল্প, উদ্ভাবন ও অবকাঠামোতে ৬০১-৮০০ ব্যান্ড অর্জিত হয়। র্যাঙ্কিং কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য নয়। তবে শিক্ষা, গবেষণা, আন্তর্জাতিক সংযোগ ও সামাজিক অবদান বহিরাগত মানদণ্ডে কীভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, তার একটি চিত্র এতে পাওয়া যায়।
র্যাঙ্কিংয়ের পাশাপাশি গবেষণার আরেকটি পরীক্ষা হয় বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মাঠে। ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত মেট আরওভি ইন্টারন্যাশনাল আন্ডারওয়াটার রোবট প্রতিযোগিতায় এমআইএসটি মাভিরভ ১৮ দেশের ৭৭টি আন্তর্জাতিক দলের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয়। একই বছরে টিম মঙ্গল বারোতা যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ রাজ্যে অনুষ্ঠিত ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জে ১১তম স্থান অর্জন করে। তাদের সেলেস্তে-১ রোভার মঙ্গলগ্রহের অনুরূপ পরিবেশে চলাচল, যোগাযোগ, রোবোটিক বাহু পরিচালনা এবং স্বয়ংক্রিয় মিশনের সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। ৩০তম এআইএএ ডিজাইন/বিল্ড/ফ্লাই প্রতিযোগিতায় টিম হাইজেনবার্ড ১৭৫ দলের মধ্যে ৫৮তম স্থান লাভ করে। এর আগে ২০২৫ সালে ফর্মুলা স্টুডেন্ট চায়না প্রতিযোগিতায় এমআইএসটি বিøটজ ‘বেস্ট ফরেন টিম’ ও ‘বেস্ট প্রেজেন্টেশন’ পুরস্কার পায় এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা উপস্থাপনায় চতুর্থ হয়।
এই সাফল্যগুলো কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন নয়। ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ ২০২৫-এ এমআইএসটি মঙ্গল বারোতা ১০৬টি দলের মধ্যে চ‚ড়ান্ত ৩৮ দলে উঠে ১৪তম হয়েছিল এবং ৯২.৬৪ স্কোর নিয়ে সর্বোচ্চ সিস্টেম অ্যাকসেপ্ট্যান্স রিভিউ স্কোর অর্জন করেছিল। এক বছর পর ১১তম স্থানে ওঠা তাই মোটেও আকস্মিক নয়। একইভাবে এমআইএসটি মাভিরভের তৃতীয় আন্ডারওয়াটার ড্রোন ২০২৬ সালে উদ্বোধনের পর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়াও দীর্ঘ প্রস্তুতির দৃশ্যমান ফল।
এই ধারাবাহিকতার আরেক অধ্যায় ২০২৫ সালের বিয়ার সামিট ও ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম। নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের র্যাডসেফ, অর্থাৎ আইওটি ও মেশিন লার্নিংভিত্তিক পারমাণবিক বিকিরণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, শতাধিক অংশগ্রহণকারীর মধ্যে সেরা তিনে স্থান পায়। ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইসিই) বিভাগের ৮-বিট ১২-ফাংশন এএলইউ নকশা সেমিকন্ডাক্টর বিভাগে সেরা ১৫-এর মধ্যে আসে। জিসিএএফ-নেট নামে ঔষধি উদ্ভিদ শনাক্তকরণভিত্তিক প্রকল্প বায়োটেক পিপলস চয়েস বিভাগে ৯৪টি পোস্টারের মধ্যে দ্বিতীয় রানার-আপ হয়। পরে র্যাডসেফ বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫-এ গোল্ড ট্রফি জিতে অ্যাপিকটা অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫-এ অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। অ্যাপিকটায় এমআইএসটির ফাতিমা আশরাফের দল অটোমেটেড এমটিবিএম প্রকল্প নিয়ে সিলভার প্রাইজ এবং ৫ হাজার মার্কিন ডলার পুরস্কার অর্জন করে।
এমআইএসটি স্টলের প্রকল্পগুলোর বৈচিত্র্য সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়ামেও বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ইন্টেলিজেন্ট ইউএভি সোয়ার্ম একাধিক ড্রোনকে সমন্বিতভাবে কাজ করানোর ধারণা নিয়ে তৈরি। ইউনিভার্সাল ব্রেইল জেনারেটর কম খরচে ডিজিটাল লেখাকে স্পর্শনির্ভর ব্রেইলে রূপান্তর করে। কোড ক্ল্যাশ এরিনা প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রামিংকে খেলার ধাঁচে শেখার সঙ্গে যুক্ত করেছে। স্লামলিংক সহায়তা বিতরণ, উপকারভোগী যাচাই ও অভিযোগ ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল কাঠামোয় আনতে চায়।
জননিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকেন্দ্রিক প্রকল্পগুলোও উল্লেখযোগ্য। ইন্টেলি-হেলমেটে এজ এআই, আইওটি সেন্সর, হৃদস্পন্দন পর্যবেক্ষণ ও জিপিএস সতর্কবার্তা ব্যবহার করে শিল্প ও খনি এলাকার কর্মীদের দুর্ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অটোনোমাস এক্সপ্লোরার একটি স্বল্পমূল্যের স্থল রোবট, যা বিপজ্জনক ভ‚গর্ভস্থ এলাকা বা দুর্যোগস্থলে মানুষের আগে প্রবেশ করে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও ঝুঁকি শনাক্ত করতে পারে। সেন্টিনেল পারমাণবিক স্থাপনার সীমানা নিরাপত্তায় অস্ত্র শনাক্তকরণ, ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ এবং প্রতিক্রিয়ার পরামর্শ দেওয়ার জন্য তৈরি।
এই বিস্তৃত পরিসরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের উদ্ভাবনও জায়গা করে নিয়েছে। ইশারা স্মার্ট গ্লাভ বাংলা সংকেত ভাষাকে তাৎক্ষণিক লেখা ও কণ্ঠে রূপান্তরের চেষ্টা করছে। ভয়েস অ্যাসিস্ট ডিভাইস বাংলা ভাষাভিত্তিক একটি সহায়ক যোগাযোগ প্রযুক্তি, যা বাক্প্রতিবন্ধী শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষা, থেরাপি ও পুনর্বাসনে ব্যবহার করা যায়। আরেকটি চোখের দৃষ্টিনির্ভর সহায়ক ব্যবস্থা গুরুতর শারীরিক বা বাক্প্রতিবন্ধী ব্যক্তির চোখের নড়াচড়াকে লেখা বা কণ্ঠে রূপান্তরের উদ্দেশ্যে তৈরি। প্রযুক্তি যে শুধু উচ্চক্ষমতার যন্ত্র নয়, মানুষের স্বনির্ভরতা ও অন্তর্ভুক্তিরও মাধ্যম হতে পারে, এই প্রকল্পগুলো তার উদাহরণ।
একইসঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব উপকরণ ও স্থানীয় সমস্যাকেও গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুপারহাইড্রোফোবিক জুট ফ্যাব্রিক প্রকল্পে পাটকে পানিরোধী করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ও প্যাকেজিং উপকরণ তৈরির চেষ্টা হয়েছে। ডিস্যালাইনেশন অ্যান্ড আর্সেনিক রিমুভাল ফিল্টারে স্থানীয় পাটজাত বায়োমেটেরিয়াল, কম চাপের পরিচালনা এবং বদলানো যায় এমন কার্টিজ ব্যবহারের ধারণা এসেছে। আগরউড-ভিত্তিক সবুজ উদ্ভাবনে আইওটি-নিয়ন্ত্রিত হিউমিডিফায়ারের সঙ্গে প্রাকৃতিক মশা প্রতিরোধক দ্রবণ যুক্ত করা হয়েছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য পানি পরিশোধন এবং কৃষিবর্জ্য থেকে তৈরি সক্রিয় কার্বন ব্যবহার করে নিরাপদ পানির প্রযুক্তিও উন্নয়ন করা হয়েছে।
সম্প্রতি স্থানীয় সমস্যাভিত্তিক গবেষণার একটি বড় প্রদর্শনী ছিল বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬। জাতীয়ভাবে নির্বাচিত সেরা ৫০ প্রকল্পের চূড়ান্ত তালিকায় ৬টি ছিল এমআইএসটির, অর্থাৎ মোট নির্বাচিত প্রকল্পের ১২ শতাংশ। এর মধ্যে ছিল ভয়েস অ্যাসিস্ট ডিভাইস, ডিস্যালাইনেশন অ্যান্ড আর্সেনিক রিমুভাল ফিল্টার, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য পানি পরিশোধন ব্যবস্থা, পানিরোধী পাটজাত পণ্য, এআইভিত্তিক বহনযোগ্য হৃদ্যন্ত্র পর্যবেক্ষণ যন্ত্র এবং আগরউড-ভিত্তিক সবুজ উদ্ভাবন। পরিসরও বিস্তৃত: সামাজিক অন্তর্ভুক্তি থেকে বিশুদ্ধ পানি, জনস্বাস্থ্য, টেকসই উপকরণ ও পরিবেশ।
স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিতে আরও দুটি কাজ আলাদা করে নজর কাড়ে। এআইভিত্তিক বহনযোগ্য হৃদ্যন্ত্র পর্যবেক্ষণ যন্ত্রে একই সঙ্গে ইসিজি, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা (এসপিও২), রক্তচাপ, শ্বাসের হার এবং তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। আর বহনযোগ্য এআই-সমন্বিত ইএনটি (কান, নাক ও গলা) পরীক্ষাযন্ত্রে পরিবর্তনযোগ্য প্রোব ব্যবহার করে কান, নাক ও গলা পরীক্ষা করা যায়। এই দুটি উদ্ভাবনের পেটেন্ট আবেদন ২০২৬ সালে প্রকাশনার পর্যায়ে পৌঁছায়। আবেদন দুটি একই দিনে, অর্থাৎ ১৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ডিপার্টমেন্ট অব পেটেন্টস, ডিজাইনস অ্যান্ড ট্রেডমার্কসের (ডিপিডিটি) প্রকাশনা নম্বর ৩৬-এ প্রকাশিত হয়।
পেটেন্টমুখী গবেষণার এই ধারা ২০২৫ সালেই দৃশ্যমান হয়েছিল। পানিরোধী পাটজাত পণ্য, জায়ফল-রসুনভিত্তিক থেরাপি এবং ডিস্যালাইনেশন ও আর্সেনিক অপসারণ ফিল্টারের মতো কাজ এমআইএসটির মেধাস্বত্বভিত্তিক গবেষণার তালিকায় যুক্ত হয়। একই বছরে বাক্প্রতিবন্ধীদের জন্য অগমেন্টেটিভ অ্যান্ড অল্টারনেটিভ কমিউনিকেশন (এএসি) ভিত্তিক পুনর্বাসন ব্যবস্থার পেটেন্ট প্রকাশিত হয়। গবেষণাকে প্রবন্ধের বাইরে নিয়ে গিয়ে সুরক্ষিত মেধাস্বত্বে রূপ দেওয়ার এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এমআইএসটির গবেষণা ও উদ্ভাবনের চিত্র শুধু প্রকৌশলভিত্তিক যন্ত্রে সীমাবদ্ধ নয়। আর্কিটেকচার বিভাগের শিক্ষার্থীরা ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক নকশা প্রতিযোগিতায় সম্মানজনক স্বীকৃতি, উন্মুক্ত নকশা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান, বায়োসিটি নগর জলাভ‚মি পুনরুদ্ধার প্রতিযোগিতায় বিজয় এবং বেসহ্যাবিটাট সামার স্কুলে প্রতিযোগিতামূলক বৃত্তি অর্জন করেছে। বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক গেটি কনজারভেশন ইনস্টিটিউটের পূর্ণ বৃত্তি পেয়েছেন এবং গেøাবাল আন্ডারগ্র্যাজুয়েট অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫-এর বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিইউপি সিএসই টেক কার্নিভালে এমআইএসটির একটি দল চ্যাম্পিয়ন এবং আরেকটি দল প্রথম রানার-আপ হয়েছে। ফিউচার বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জে প্রজেক্ট কিরণ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও বেড়েছে। ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার কর্মসূচি ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশের (আইএবি) পাঁচ বছরের শর্তহীন স্বীকৃতি পেয়েছে। বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার (ব্রিক) ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনুমোদন লাভ করেছে। ডাটা সায়েন্স ও গণিত এবং ন্যানো সায়েন্স ও রসায়ন বিভাগ চালু হয়েছে। এমআইএসটির দুই শিক্ষক বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন এবং সিএসই গবেষকেরা আইসিসিআইটি ২০২৫-এ শীর্ষ ২ শতাংশ পেপার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা ও প্রকল্পের পাশাপাশি শিক্ষার মান, গবেষণা অবকাঠামো এবং শিক্ষক-গবেষকদের স্বীকৃতিও এগিয়েছে।
এত অর্জনের মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হয়তো অন্য জায়গায়। এই সাফল্যগুলোর স্থায়িত্ব কতটা হবে, গণমানুষের কাছে তা কীভাবে পৌঁছাবে? দেশের শিল্প কি বাণিজ্যিকীকরণে এগিয়ে আসবে? গবেষণাপত্র প্রকাশ, র্যাঙ্কিং, পুরস্কার বা পেটেন্ট, সবই গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। প্রকৃত সাফল্য আসে তখন, যখন একটি গবেষণা হাসপাতালের শয্যায় রোগীর উপকারে লাগে, একটি পানি পরিশোধন প্রযুক্তি গ্রামের মানুষের হাতে পৌঁছায়, একটি রোবট ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে মানুষের জীবন বাঁচায়, কিংবা একটি দেশীয় উদ্ভাবন শিল্পে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করে। এমআইএসটির সামনে তাই এখন এক নতুন ও দ্বিতীয় অধ্যায়ের বড় সম্ভাবনা: প্রকাশনা থেকে প্রয়োগে, প্রোটোটাইপ থেকে পণ্যে এবং প্রতিযোগিতার সাফল্য থেকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাবে পৌঁছানো।
সেখানেই আগামী দিনের বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল পরিচয় নির্ধারিত হবে। কতটি গবেষণাপত্র ছাপা হলো, কতটি পদক এল কিংবা কোন র্যাঙ্কিংয়ে নাম উঠল, এসবের পাশাপাশি দেখতে হবে একটি ধারণা কত দূর গেল। সেটি কি শিক্ষার্থীর কৌত‚হলকে নতুন প্রশ্নে নিয়ে গেল? কোনো গবেষককে নতুন আবিষ্কারে সাহস দিল? কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধান করল? কোনো রোগীর চিকিৎসা সহজ করল? কোনো দুর্গম অঞ্চলের মানুষের জন্য নিরাপদ পানি পৌঁছে দিল? কিংবা দেশের জন্য এমন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি করল, যার জন্য একদিন আমাদের বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো?
এ কারণেই এমআইএসটির পথচলার আশাব্যঞ্জক দিক শুধু অর্জনের সংখ্যা নয়, বরং গবেষণার সঙ্গে প্রয়োগের দূরত্ব কমানোর চেষ্টা। একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে সুন্দর পরিচয় তার প্রবেশদ্বারে লেখা নাম নয়, বরং সেই জ্ঞান, যা তার সীমানা পেরিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। গবেষণার আলোও তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা ল্যাবের দেয়াল ছেড়ে বাস্তব জীবনে কাজ করে। এমআইএসটির এই যাত্রা যদি সেই পথেই আরও গভীর হয়, তবে এর সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনো র্যাঙ্কিং, পদক বা পেটেন্টে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা মাপা হবে মানুষের জীবনে তৈরি করা পরিবর্তনে। শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় পরিচয় তার জটিলতা নয়, তার উপযোগিতা, আর গবেষণার সবচেয়ে বড় পুরস্কার স্বীকৃতি নয়, মানুষের কাজে লাগা।
লেখক: এসজিপি, ইঞ্জিনিয়ার্স, জিএসও-২ (এআরএসটিসি), (র্যাংকিং এন্ড কোলাবোরেশন সেল) ও অতিরিক্ত পরিচালক (কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স) আইকিউএসি-এমআইএসটি