এইচএসসি ফল বিশ্লেষণ এবং এর শিক্ষাতাত্ত্বিক পর্যালোচনা
এম এ মতিন © টিডিসি সম্পাদিত
উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান মাইলফলক, যা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে প্রবেশের ভিত্তি নির্ধারণ করে। গত ৩১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। তবে এবারের ফলাফল দেশের শিক্ষা খাতের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিগত ২২ বছরের মধ্যে পাসের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেকই অকৃতকার্য হয়েছে, যা জাতীয় স্তরে গভীর উদ্বেগ ও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই বিপর্যয় কেবল পরীক্ষার্থীদের ব্যর্থতা নয়, বরং তা আমাদের প্রচলিত শিক্ষাদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন কাঠামো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক গুণগত মানকে বড় ধরনের কাঠামোগত প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। উল্লেখ্য, এটি বি এন পি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দ্বিতীয় গণ-পরীক্ষার ফলাফল। এর আগে এস এস সি পরীক্ষায়ও অনুরূপ ফল বিপর্যয় ঘটেছে।
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল যে কোন দেশের উচ্চশিক্ষায় প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। সুতরাং একে উচ্চশিক্ষার ভিত বলা যেতে পারে। এস এস সি এবং এইচ এস সি-তে জ্ঞানের ভিত্তিমূল শক্তিশালী না হলে উচ্চশিক্ষার ফলাফল আশানুরূপ হতে পারে না। এর প্রমাণ পাওয়া যায় বিশ্বখ্যাত স্যাডলার কমিশনের প্রতিবেদনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের (১৮৫৭) শিক্ষার মানের অধোগতি লক্ষ্য করে ব্রিটিশ সরকার ১৯১৭ সালে বিখ্যাত ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ স্যার মাইকেল আর্নেষ্ট স্যাডলার কে সভাপতি করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্যে একটি কমিশন গঠন করে। এই রিপোর্টে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্যে বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়। কেননা ঐ সময় যারা বাংলা, বিহার, আসাম এবং সংলগ্ন অঞ্চলের ছাত্রছাত্রী এন্ট্রান্স/সমমান পাশ করে কলাকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছিল তাদের মান আশানুরূপ ছিল না বলে স্যাডলার কমিশন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ১৯১৭ সালের স্যাডলার কমিশন রিপোর্টে উচ্চমাধ্যমিক বা ইন্টারমিডিয়েট (সমমান) স্তরের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান এবং তাদের যোগ্যতার ঘাটতি নিয়ে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও কঠোর মূল্যায়ন করা হয়েছিল। কমিশনের মতে, তৎকালীন উচ্চমাধ্যমিক স্তর পার করা ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার মান বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনা করার জন্য একেবারেই পর্যাপ্ত ছিল না। রিপোর্টে বলা হয়েছে -
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অযোগ্যতা: কমিশন রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয় যে, ম্যাট্রিকুলেশন বা ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পরও অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্বতা এবং জ্ঞানগত মান এমন স্তরে পৌঁছায় না যা দিয়ে তারা উচ্চতর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা (University Education) গ্রহণ করতে পারে। তারা মূলত মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
ভাষাগত দক্ষতার অভাব: ছাত্রছাত্রীদের ইংরেজি ভাষা ও নিজস্ব মাতৃভাষায় দক্ষতার মান অত্যন্ত দুর্বল ছিল। এর ফলে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি মাধ্যমের জটিল বক্তৃতাসমূহ বুঝতে ও তা নিজের ভাষায় বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হতো।
বাস্তবধর্মী বা বৃত্তিমূলক জ্ঞানের ঘাটতি: উচ্চমাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কেবল পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বিজ্ঞান, বাণিজ্য বা প্রযুক্তিগত বিষয়ে তাদের কোনো প্রায়োগিক বা ব্যবহারিক ভিত্তি গড়ে উঠত না।
শিক্ষার পরিবেশ ও ত্রুটিপূর্ণ পাঠদান: কলেজ ও স্কুলগুলোতে মানসম্মত শিক্ষকের অভাব এবং অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপের কারণে শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত যত্ন পেত না, যা তাদের মেধার মানকে আরও নিম্নমুখী করে তুলত।
অতএব, সুপারিশ করা হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যে সকল কলেজ তালিকাভুক্ত ছিল সেগুলোর শিক্ষার মানের প্রতি যেন বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ নজর দেয়। উল্লেখ্য, ঐ সময় এনট্রান্স, মেট্রিকুলেশন, এফ এ, ইত্যাদি পরীক্ষা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত হতো। আজ বাংলাদেশের এইচ এস সি পরীক্ষার ফল বিপর্যয় স্যাডলার কমিশনের সুপারিশের কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে বৈ কি?
আজকের প্রতিবেদনের মূল উদ্দেশ্য হলো ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের একটি বস্তুনিষ্ঠ ও পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা। বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করে বিপর্যয়ের প্রকৃত গভীরতা পরিমাপ করা এবং এর পেছনের মূল কারণগুলো উদঘাটন করাই এর লক্ষ্য। একইসঙ্গে এর মাধ্যমে দেশের শিক্ষার বিদ্যমান মান মূল্যায়ন করা এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারকল্পে টেকসই ও সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি তৈরিতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডসমূহের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান, শিক্ষাবিদদের মতামত, জাতীয় সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন এবং মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংগৃহীত উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে।
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল
সম্মিলিত পাসের হার: ১১টি শিক্ষা বোর্ডে (৯টি সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি) সম্মিলিত পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫২.১২ শতাংশ। এর অর্থ হলো পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মোট ১২,৭০,৫৮৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৬ লাখ শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছে।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর চিত্র: ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের গড় পাসের হার আরও নিচে—৫১.৬২ শতাংশ। ২০২৪ সালে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এই পাসের হার ছিল ৭৫.৫৬ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ছিল ৫৭.১২ শতাংশ। ফলে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে পাসের হার প্রায় ২৪ শতাংশীয় পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে।
জিপিএ-৫ প্রাপ্তি: সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৫,৯৪৮ জনে। ২০২৫ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৬৩,২১৯ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৭,২৭১ জন। সব বোর্ড মিলিয়ে জিপিএ-৫ এর সংখ্যা ৪০,০৮৪।
শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠান: দেশের ইতিহাসে অন্যতম নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে এবার ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। বিপরীতে শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বোর্ডভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার বোর্ডভিত্তিক ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাজধানী ও এর আশপাশের অঞ্চলের তুলনায় প্রান্তিক ও আঞ্চলিক শিক্ষা বোর্ডগুলোতে বিপর্যয়ের তীব্রতা ছিল অনেক বেশি। সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের পাশাপাশি মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের ফলাফলেও বড় ধরনের তারতম্য লক্ষ করা গেছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ড: বরাবরের মতোই পাসের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তির দিক থেকে দেশের সব বোর্ডের শীর্ষে অবস্থান করছে ঢাকা বোর্ড। তবে শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও এই বোর্ডের সামগ্রিক ফলাফল বিগত বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা রাজধানীর বাইরের কলেজগুলোর দুর্বল পারফরম্যান্সকে নির্দেশ করে।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড: এই বোর্ডে এবার নজিরবিহীন ফল বিপর্যয় ঘটেছে। রাজশাহীতে পাসের হার নেমে এসেছে মাত্র ৪৫.০৫ শতাংশে। এর অর্থ হলো, এই বোর্ডের অর্ধেকেরও বেশি পরীক্ষার্থী চূড়ান্ত পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়েছে। এছাড়া জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪,৫২০ জনে।
সিলেট শিক্ষা বোর্ড: সিলেটে গড় পাসের হার কোনোমতে অর্ধেক পার হয়ে ৫০.৯০ শতাংশে ঠেকেছে। পাসের হারের এই নিম্নমুখী প্রবণতার পাশাপাশি মেধার অন্যতম সূচক জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও বড় পতন ঘটেছে; এই বোর্ড থেকে মাত্র ১,২০৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড: নতুন এই শিক্ষা বোর্ডটি এবার অন্যতম বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। ইংরেজি ও বিজ্ঞানের আবশ্যিক বিষয়গুলোতে গণহারে ফেল করার কারণে ময়মনসিংহ বোর্ডের পাসের হার ও জিপিএ-৫ এর সংখ্যা উভয়ই অত্যন্ত কম, যা এই অঞ্চলের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ড: ২০২৬ সালের ফলাফলে সাধারণ ৯টি বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে সবার নিচে অবস্থান করছে বরিশাল বোর্ড। সর্বনিম্ন পাসের হারের পাশাপাশি জিপিএ-৫ প্রাপ্তির দিক থেকেও বোর্ডটি চরম সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে, যা দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত ঘাটতিকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (আলিম): সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর তুলনায় মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবার কিছুটা ভালো করেছে। এই বোর্ডে গড় পাসের হার ৬১.০৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩,২৫০ জন পরীক্ষার্থী। মূল ধারার কলেজগুলোর চেয়ে পাসের হারে কিছুটা এগিয়ে থাকলেও বিগত বছরের তুলনায় আলিম পরীক্ষার ফলাফলও নিম্নমুখী।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ড: কারিগরি ও বৃত্তিমূলক বোর্ডের ফলাফলও এবার দেশের সামগ্রিক শিক্ষা সংকটের বাইরে ছিল না। এই বোর্ডে পাসের হার অর্ধেকের নিচে নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৯.৪৩ শতাংশে। বৃত্তিমূলক শিক্ষার এই বোর্ডে মাত্র ৮৮৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন, যা কারিগরি শিক্ষার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক মূল্যায়নে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার প্রমাণ।
ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে নজিরবিহীন বিপর্যয়: একটি পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ
২০২৬ সালের নজিরবিহীন ফল বিপর্যয়ের নেপথ্য কারণগুলো সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের একটি বিশাল অংশ আবশ্যিক বিষয়, বিশেষ করে ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) বিষয়ে গণহারে অকৃতকার্য হয়েছে। সরকারি ও শিক্ষা বোর্ডের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ মোট ৫,৯৪,১১৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে কেবল ইংরেজি এবং আইসিটি—এই দুটি বিষয়েই সম্মিলিতভাবে ফেল করেছে ৩,৮২,০২১ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ মোট অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীর প্রায় ৬৪.৩ শতাংশই এই দুই বিষয়ে আটকে গেছে, যা সামগ্রিক পাসের হারকে ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন (৫২.১২%) পর্যায়ে নামিয়ে আনার মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্যাদি
শহরাঞ্চলের নামী-দামি এবং বিশেষায়িত কলেজগুলোর পাসের হার ও জিপিএ-৫ এর সংখ্যা বজায় থাকলেও গ্রামীণ এবং মফস্বল এলাকার কলেজগুলোতেই মূল বিপর্যয়টি ঘটেছে। বিশেষ করে যে ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী ফেল করেছে, সেগুলোর সিংহভাগই দেশের প্রান্তিক ও অনুন্নত এলাকায় অবস্থিত। এসব প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই এবং অনেক ক্ষেত্রে আবশ্যিক বিষয়ের জন্য কোনো স্থায়ী শিক্ষকও ছিল না।
এইচএসসি ফল বিপর্যয়ের প্রধান কারণসমূহ
২০২৬ সালের এই নজিরবিহীন ফল বিপর্যয়ের পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট একক কারণ কাজ করেনি, বরং বেশ কিছু কাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও কৌশলগত পরিবর্তন যৌথভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে গণহারে অকৃতকার্য হওয়া
বিষয়ভিত্তিক এই বিপর্যয়ের চিত্র নিচে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:
ইংরেজি বিষয়ের চিত্র: এবারের পরীক্ষায় একক বিষয় হিসেবে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে ইংরেজিতে। সারা দেশে মোট ২,৪৩,৫২৮ জন পরীক্ষার্থী ইংরেজি বিষয়ে ফেল করেছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড (যেখানে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৩.৬২%) ছাড়া দেশের অন্য কোনো সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেই ইংরেজি বিষয়ে পাসের হার ৭০ শতাংশের ঘর ছুঁতে পারেনি। বিশেষ করে বরিশাল, যশোর ও দিনাজপুরের মতো আঞ্চলিক বোর্ডগুলোতে ইংরেজিতে পাসের হার মাত্র ৫৪ থেকে ৫৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সৃজনশীল লেখার দক্ষতার অভাব এবং ব্যাকরণগত অংশে শিক্ষার্থীদের চরম দুর্বলতাই এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) বিষয়ের চিত্র: ইংরেজিতে বিপুল বিপর্যয়ের পাশাপাশি আইসিটি বিষয়েও এবার বড় ধরনের ধাক্কা এসেছে। সারা দেশে মোট ১,৩৮,৪৯৩ জন পরীক্ষার্থী আইসিটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। মফস্বল ও গ্রামীণ অঞ্চলের কলেজগুলোতে আইসিটি বিষয়ের জন্য কোনো বিশেষায়িত ও স্থায়ী শিক্ষক না থাকা এবং অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব ও ব্যবহারিক ক্লাসের অনুপস্থিতি শিক্ষার্থীদের এই প্রযুক্তিভিত্তিক বিষয়ে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত রেখেছিল। ফলে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বর মূল্যায়নে কড়াকড়ি করতেই এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী অনুত্তীর্ণ হয়েছে।
শিক্ষা গবেষকদের মতে, ইংরেজি ও আইসিটি মূলত মুখস্থনির্ভর কোনো বিষয় নয়, এগুলো পুরোপুরি দক্ষতাভিত্তিক (Skill-based) বিষয়। মাধ্যমিক স্তরে করোনাকালীন শিখন ঘাটতি (Learning Gap) থাকার কারণে এই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের বুনিয়াদি ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল ছিল। উচ্চমাধ্যমিক স্তরে এসে তারা যখন এই দুটি আবশ্যিক বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও কঠোর মূল্যায়নের মুখোমুখি হয়েছে, তখন তাদের সেই কাঠামোগত দুর্বলতা ও দক্ষ শিক্ষকের অভাবের বিষয়টি পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে পড়েছে।
উত্তরপত্র মূল্যায়নে কড়াকড়ি ও নতুন মূল্যায়ন নীতি
বিগত বছরগুলোতে উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যে শিথিলতা বা 'গ্রেস মার্কস' দেওয়ার অলিখিত প্রবণতা ছিল, ২০২৬ সালের পরীক্ষায় তা সম্পূর্ণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। খাতা মূল্যায়নে যথাযথ মানদণ্ড অনুসরণ করায় এবং শিক্ষকরা প্রকৃত মেধার ভিত্তিতে নম্বর প্রদান করায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ এর কৃত্রিম স্ফীতি বন্ধ হয়েছে। পরীক্ষকদের ওপর কোনো মনগড়া নির্দেশনা না থাকায় প্রকৃত মূল্যায়নের চিত্রটি ফুটে উঠেছে।
প্রশ্নপত্রের অসঙ্গতি ও ত্রুটি
এবারের পরীক্ষায় বিভিন্ন বিষয়ের প্রশ্নপত্রে বেশ কিছু ত্রুটি ও কাঠামোগত অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিজেই পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের পরীক্ষায় দুটি প্রশ্নে বড় ধরনের ভুল থাকার কথা স্বীকার করেছে এবং এর বিপরীতে সব শিক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিল। এছাড়া রসায়ন ও জীববিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রেও সিলেবাস বহির্ভূত বা অত্যন্ত কঠিন উদ্দীপক ব্যবহারের কারণে সাধারণ মানের শিক্ষার্থীরা খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি।
করোনা পরবর্তী শিক্ষাগত ঘাটতি
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা তাদের মাধ্যমিক ও নিম্ন-মাধ্যমিক স্তরে করোনাকালীন দীর্ঘ ছুটির মুখোমুখি হয়েছিল। অটোপাশ বা সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের মাধ্যমে পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত হওয়ার কারণে এই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বুনিয়াদি শিক্ষার (ফাউন্ডেশনাল লার্নিং) এক বিশাল ঘাটতি থেকে যায়। উচ্চমাধ্যমিক স্তরের দুই বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে ইংরেজি ব্যাকরণ, গণিত এবং বিজ্ঞানের মূল বিষয়গুলোর এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়নি, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই চূড়ান্ত পরীক্ষায়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের নিম্নমান ও প্রস্তুতির অভাব
সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অধিকাংশ কলেজেই নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান হয় না। বিশেষ করে গ্রামীণ ও বেসরকারি কলেজগুলোতে দক্ষ শিক্ষকের চরম সংকট রয়েছে। শিক্ষকরা সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি সম্পর্কে নিজেরাও পুরোপুরি অভ্যস্ত নন। ফলে শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি গাইড বই বা প্রাইভেট-কোচিং নির্ভর হয়ে পড়ে। যারা অর্থনৈতিক কারণে এই সুযোগ পায়নি, তাদের প্রস্তুতি ছিল অত্যন্ত দুর্বল।
বাংলাদেশের শিক্ষার বর্তমান মান মূল্যায়ন
২০২৬ সালের ফলাফল দেশের উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার গুণগত মানের এক বাস্তবসম্মত কিন্তু চরম হতাশাজনক চিত্র উন্মোচন করেছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় পিছিয়ে থাকা: সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক শিক্ষা সমীক্ষা ও মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা ১২ বছরের শিক্ষা (প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক) শেষ করলেও তাদের অর্জিত মেধার স্তর আন্তর্জাতিক সূচকে মাত্র সপ্তম শ্রেণির সমতুল্য। আন্তর্জাতিক টেস্টিং স্কেলে যেখানে উন্নত দক্ষতার বেঞ্চমার্ক ৬২৫, সেখানে বাংলাদেশের গড় স্কোর মাত্র ৩৬৮।
সার্টিফিকেট বনাম মেধার ব্যবধান: জিপিএ বা সার্টিফিকেটের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার্থীদের মূল দক্ষতা (Core Competencies) যেমন—ভাষা জ্ঞান, গাণিতিক বিশ্লেষণ এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার মান অত্যন্ত নিম্নমুখী। এইচএসসি পাস করার পরও সিংহভাগ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাগুলোতে ন্যূনতম পাস নম্বর তুলতে পারে না এবং সাধারণ প্রবন্ধ লিখন বা গবেষণামূলক কাজে তাদের চরম দুর্বলতা প্রকাশ পায়।
কাঠামোগত সংকট: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মিজানুর রহমান নিজেই স্বীকার করেছেন যে, সনাতন ও প্রাচীন ধারার পাঠ্যক্রম, দুর্বল মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল সংকট।
এই বিপর্যয় রোধে ও শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রতিকারের সুপারিশমালা
এই জাতীয় বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই মেধা উন্নয়নের জন্য নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন করা জরুরি:
১. ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ের জন্য বিশেষ রেমিডিয়াল ক্লাস: করোনাকালীন ও মাধ্যমিক স্তরের ঘাটতি পূরণের জন্য উচ্চমাধ্যমিকের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি, আইসিটি ও বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলোর ওপর বিশেষ ব্রিজিং বা রেমিডিয়াল কোর্সের ব্যবস্থা করতে হবে।
২. প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ ও মফস্বলের কলেজগুলোর মানোন্নয়ন: যে ২৯৩টি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ ফেল করেছে, সেগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক লাইসেন্স বা এমপিও (MPO) স্থগিত করে জরুরি ভিত্তিতে সরকারি তত্ত্বাবধানে দক্ষ শিক্ষক ডেপুটেশনে পাঠাতে হবে। সারা দেশে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতির ওপর শিক্ষকদের ধারাবাহিক আধুনিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
৩. প্রশ্নব্যাংক তৈরি ও ত্রুটিহীন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন: প্রশ্নপত্রের ভুলভ্রান্তি ও অসঙ্গতি দূর করতে শিক্ষাবোর্ডগুলোর মডারেশন বোর্ডকে আরও দায়বদ্ধ করতে হবে। একটি কেন্দ্রীয় ও মানসম্মত 'প্রশ্নব্যাংক' তৈরি করা যেতে পারে, যা থেকে পরীক্ষার প্রশ্ন নির্বাচন করা হবে।
৪. কঠোর ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ব্যবস্থা ধরে রাখা: পাসের হার কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর জন্য রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে। ২০২৬ সালে যে কঠোর ও প্রকৃত মূল্যায়নের ধারা শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা ফাঁকিবাজি না করে পড়াশোনায় মনোযোগী হয়।
৫. এক বা দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের বিশেষ সুযোগের সঠিক ব্যবহার: ২০২৬ সাল থেকে সরকার ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্য ১ মাসের মধ্যে সম্পূরক বা সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা দেওয়ার যে সুযোগ রেখেছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক। এই সুযোগ যেন প্রার্থীরা যথাযথ প্রস্তুতির মাধ্যমে নিতে পারে, সেজন্য কলেজগুলোতে তাৎক্ষণিক বিশেষ কাউন্সেলিং ও সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।
৬. ডিজিটাল লার্নিং ও প্রযুক্তির ক্লাসরুম সচল করা: আইসিটি কেবল কাগজে-কলমে না শিখিয়ে প্রতিটি কলেজে কম্পিউটার ল্যাব সক্রিয় করতে হবে। গ্রামীণ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনে কেন্দ্রীয়ভাবে দক্ষ শিক্ষকদের ডিজিটাল লেকচার বা ক্লাস প্রচারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৭. শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও অপচয় রোধ: ইউনেস্কোর মানদণ্ড অনুযায়ী জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা উচিত। বর্তমান বরাদ্দ বৃদ্ধি করে তা প্রধানত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি ও গবেষণামূলক প্রশিক্ষণে ব্যয় করতে হবে যাতে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট হয়।
উপসংহার
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয় বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের জন্য একটি বড় ধরনের 'ওয়েক-আপ কল' বা অশনিসংকেত। পাসের হারের এই আকস্মিক পতন সাময়িকভাবে বেদনাদায়ক হলেও, এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরের জরাজীর্ণ ও ভঙ্গুর রূপটিকে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। কৃত্রিমভাবে পাসের হার বাড়িয়ে মেধার যে মিথ্যা সন্তুষ্টি আমরা বিগত বছরগুলোতে খুঁজছিলাম, তার অবসান ঘটেছে। এখন সময় এসেছে রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি দীর্ঘমেয়াদি, আধুনিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক সংস্কারের আওতায় আনা। তবেই বাংলাদেশ ২০৪১ সালের রূপকল্প অনুযায়ী একটি জ্ঞানভিত্তিক ও বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতাসক্ষম 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাবিষয়ক অভিভাবকদের ঐতিহাসিক স্যাডলার কমিশন প্রতিবেদন তাদের সামনে রাখার জন্যে বিনীত অনুরোধ জানাই।
লেখক: উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি)