৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস যেভাবে হলো

০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৬ PM
মোঃ ফিরোজ আলম

মোঃ ফিরোজ আলম © টিডিসি ছবি

বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর, ১৯৭৫ সালে একদল সেনাবাহিনীর অফিসার, সিপাহী মিলে জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে। জিয়াউর রহমানের মুক্তিকে কেন্দ্র করে জনগণ রাস্তায় নেমে আসেন এবং বরণ করে নেয়। পরবর্তীতে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে করতে তাঁকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বসানো হয়। ফলশ্রুতিতে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি ও বিদেশি প্রভাব থেকে বাংলাদেশ মুক্তি পেয়েছিল। ৭ই নভেম্বর সিপাহী জনতার বিপ্লব কেন হলো, এই বিপ্লব ও সংহতি না হলে বাংলাদেশের ভাগ্য কেমন হতে পারতো তা জানতে হলে এর প্রেক্ষাপট জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২৫শে মার্চ, ১৯৭১ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গভীর রাতে নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের উপর নির্বিচারে হামলা চালায়। শেখ মুজিবুর রহমান নিজ বাসা থেকে স্বেচ্ছায় গ্রেফতার হলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে চলে যান। এমন পরিস্থিতিতে সালের ২৬শে মার্চ সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা দেন। প্রথমে তিনি নিজ নামে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও পরবর্তীতে জনগণের অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা উপলব্ধি করে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা করেন। 

পশ্চিম পাকিস্তান সরকার কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের শোষণের ফলে সামরিক এবং বেসামরিক সরকারি চাকরিজীবীরা ক্ষুব্ধ ছিলো। এই শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যদের অধিকাংশই (ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর…) বিদ্রোহ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন, খালেদ মোশাররফ, শাফায়াত জামিল, আবু তাহের প্রমুখ সেক্টর বা ব্রিগেড-স্তরে নেতৃত্ব দেন। অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর বাঙালি অফিসার ও সৈনিকদের একটি বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকলেও যুদ্ধের পুরো সময় পাকিস্তানে আটকা ছিলেন। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্বাধীনতা অর্জনের পর আটককৃতরাও দেশে ফিরে আসেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর মধ্যে অদৃশ্য বিভাজন সৃষ্টি হয় - দুই অভিজ্ঞতা থেকেই পরে অন্তত দুটি বিভাজন তৈরি হয়: মুক্তিযোদ্ধা বনাম প্রত্যাগত, আর অফিসার বনাম সৈনিক। প্রত্যাগত কর্মকর্তারা দেশে ফেরার পর জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি নিয়ে অসন্তোষ এবং বিভাজন কিছুটা প্রকাশ্যে চলে আসে।

১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান নিজের নিরাপত্তা জোরদার এবং বিরোধী মতকে দমন করতে জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন করেন। রক্ষীবাহিনী সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে থাকায় তুলনামূলকভাবে সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশি সুবিধা পেতেন। তাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়েছিল। এসব নিয়ে সেনাবাহিনীর ভেতরে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছিল।

একইসাথে রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে বৈষম্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলের মধ্যেও বিভাজন সৃষ্টি হয়। ১৯৭২ সালের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের অপেক্ষাকৃত তরুণ অংশ জাসদ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। জাসদ সেনাবাহিনীর ভেতরে সংগঠন গড়তে তৎপরতা চালায়। এক্ষেত্রে মূখ্য ভূমিকা পালন করেন সেনাবাহিনীর যুদ্ধাহত সেক্টর কমান্ডার আবু তাহেরসহ অন্যান্যরা। শেখ মুজিবুর রহমান কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হওয়ায় যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি আরো ভেঙে পড়ে। দেশে দুর্নীতি, লুটপাট এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি হতে থাকে। একইসাথে ১৯৭৪ সালে বন্যার ফলে খাদ্যসংকট দেখা দেয় এবং দুর্ভিক্ষে অনেক লোক মারা যাওয়ায় সরকারের জনপ্রিয়তা কমে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর দমন-পীড়ন করে সরকার আইনশৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যর্থ হলে ডিসেম্বরে জরুরি অবস্থা জারি হয়।

১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক লীগ) গঠন করে একদলীয় ব্যবস্থা চালু হলে বিরোধী দলমতের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের বৈধ রাজনৈতিক অধিকার প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এবং অসন্তোষ প্রকাশের বৈধ পথ সংকুচিত হয়। ফলে সামরিক বা গোপন পথের প্রতি বিরোধী দলমতের নেতাকর্মীদের আকর্ষণ বাড়ে।

এমন বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান, মেজর খন্দকার আবদুর রশীদ-সহ কয়েকজন অফিসারসহ একদল সেনা কর্মকর্তার নেতৃত্বে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য এবং কয়েকজন নিকটাত্মীয়কে হত্যা করেন। তখন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। সামরিক বাহিনীর প্রধান কে এম শফিউল্লাহ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বৈষম্য বিলোপ করতে ব্যর্থ হন। পরিবর্তে সেনাবাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। খন্দকার মোশতাক আহমেদ পরিবর্তিত পরিস্থিতি সামাল দিতে ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ "ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ" জারি করেন। এই অধ্যাদেশের ফলে ১৫ আগস্টের ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা দায়মুক্তি পায়। ১৫ই আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত অফিসাররা দায়মুক্তি পাওয়ায় অধিকাংশই ঢাকা সেনানিবাসে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। তাদের দাপটে অনেক সিনিয়র কর্মকর্তারাও তটস্থ হয়ে পড়েন। এমনকি সেনাবাহিনীর প্রধানকেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হয়। সেনাপ্রধানসহ সেনা বাহিনীর বড় একটি অংশ তাঁদের কর্মকাণ্ডকে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ ও চেইন অব কমান্ড ভঙ্গ করার প্রবণতা দেখে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। 

এমন পরিস্থিতিতে ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সেনাবাহিনীর চিফ অফ জেনারেল স্টাফ, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, কর্নেল শাফায়াত জামিল ও আরও কয়েকজনের নেতৃত্বে একটি সেনা অভ্যুত্থান ঘটে। সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে হত্যা করা হয়। জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধানের পদচ্যুত করে খালেদ মোশাররফ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করেন। এরপর খন্দকার মোশতাক আহমেদকে পদত্যাগে বাধ্য করেন এবং প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হন। 

পরদিন, অর্থাৎ ৪ নভেম্বর, ১৯৭৫ সালে ঢাকায় একটি মিছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বর অভিমুখে যায়, তা আওয়ামী লীগ-ঘেঁষা হিসেবে পরিচিত হয়। অফিসারদের সাধারণ সৈনিকদের স্বার্থ উপেক্ষা করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় ফলে খালেদ মোশাররফের পক্ষে সেনাবাহিনীর সব অংশের সমর্থন পাওয়ার ভিত্তি নষ্ট হয়ে যায়। জাসদ নেতা আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ, হাসানুল হক ইনু প্রমুখ এবং মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার (অবসরপ্রাপ্ত) কর্নেল আবু তাহের সহ অন্যান্যরা তা প্রত্যাখ্যান করে। অন্যদিকে, সময়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সেনাবাহিনীর ভেতরে "বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা" নামে একটি গোপন সংগঠন গড়ে তুলেছিল। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা অফিসার ও সৈনিকের বৈষম্য দূর করে, সেনাবাহিনীতে শ্রেণিভেদ বিলোপ করতে ১২-দফা দাবি-সংবলিত লিফলেট বিতরণ করে যা জনপ্রিয়তা পায়।

১৫ আগষ্টের পর থেকে তিনটি পরস্পরবিরোধী শক্তি কাজ করছিল, যেমন - মোশতাক-ফারুক-রশীদের সমর্থক গোষ্ঠী, খালেদ-শাফায়াত-হুদার গোষ্ঠী এবং তাহের-জাসদ ও সৈনিক-আন্দোলনের ধারা। ৩ নভেম্বর জিয়াউর রহমান গৃহবন্দী হলেও এই তিন শক্তির টানাপোড়েনের মাঝে অসম্ভব সততা এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে জিয়াউর রহমান একটি চতুর্থ ধারা হিসেবে আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন। এমন বাস্তবতায় ৬ নভেম্বরের শেষ রাতে (৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে) জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করা হয়। 

খালেদ মোশাররফ ও তাঁর সহযোগীরা জিয়াউর রহমানের প্রতি সৈনিকদের বর্ধমান সমর্থন টের পেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পূর্বে খালেদ মোশাররফ, কর্নেল নাজমুল হুদা ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দারসহ বেশ কয়েকজন অফিসার এবং সৈনিক সেনানিবাসের কাছে বিপ্লবী সৈনিকদের হাতে নিহত হন। অপরদিকে রাষ্ট্র এক ঘোর অমানিশা থেকে মুক্তি পাওয়ায় সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসে উল্লাসে মেতে ওঠে এবং “সিপাহী জনতা ভাই ভাই” স্লোগানে ঢাকার রাজপথ মুখরিত হয়ে উঠে।
প্রেসিডেন্ট সায়েম প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) হিসেবে বহাল থাকেন এবং জিয়াউর রহমানকে পূণরায় সেনাপ্রধানের দায়িত্ব ফিরিয়ে দেয়া হয়।

৭ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী পন্থীদের পতন নিশ্চিত করা হয়। বাকশাল বিলুপ্ত করা হয়, সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া হয়, সুসাশন ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা হয়। সমাজ বা রাষ্ট্রের কাঠামোগত রূপান্তরের জন্য বিপ্লব শব্দ যুক্ত হয়। জিয়াউর রহমানকে মুক্তির পর জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তা নেমে আসে এবং বরণ করে নেয়। সকল বিভাজন কাটিয়ে সেনাবাহিনীর মধ্যে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে সংহতি ফিরে আসার জন্য দিবসের নামে "সংহতি" শব্দটি এসেছে।

পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি করা হয়। তিনি বাংলাদেশকে বিদেশি প্রভুদের হাত থেকে রক্ষা করেন, তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে বাংলাদেশকে উৎপাদন এবং রপ্তানিমুখী দেশে পরিণত করেন। বিদেশ সাহায্য ভিক্ষা না করে জনশক্তি প্রেরণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। সকল দলকে রাজনীতি করতে সমান সুযোগ দেন। বিরোধী দল এবং মতের মানুষের মতামত প্রকাশের হয়রানি বন্ধ করেন‌ । দেশের মধ্যে নির্ধারিত ৪ পত্রিকা থেকে মুক্ত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন। ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং সার্ক গঠনের অন্যতম নেতা হিসেবে বিশ্বের দরবারে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেন।

লেখক : ফেলো, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও এমফিল গবেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ট্যাগ: মতামত
ছাত্রী হলে ঢুকে পুরুষ পুলিশ কিভাবে মেয়েদের গায়ে হাত দিয়ে টে…
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
৩ জাহাজে সেন্টমার্টিন গেলেন ১৫৫৪ পর্যটক, ভাড়া বেশি হওয়ায় অস…
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকায় চালু হচ্ছে দুই মনোরেল, চলবে কোন পথে?
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস যেভাবে হলো
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
অর্ধবার্ষিকে ৯৭ শতাংশ নম্বর, ছেলেকে ৩ কোটি মূল্যের বিএমডব্ল…
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
রোনালদোবিহীন পর্তুগালের প্রথম দল ঘোষণা, দলে একাধিক চমক
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950