অসম শিক্ষাব্যবস্থা গড়ছে বৈষম্যের ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের শিক্ষা সংকট নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিকের তৃতীয় পর্ব 

১২ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৫ PM , আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২৬, ১১:৩১ AM
এক দেশ হলেও বহু ধারার শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে বাংলাদেশে

এক দেশ হলেও বহু ধারার শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে বাংলাদেশে © টিডিসি সম্পাদিত

বনানী। রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকার একটি। এখানেই একটি স্কুলের ক্লাসরুমে কয়েকজন কিশোর-কিশোরী উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের নাটক নিয়ে ইংরেজিতে তর্কে মগ্ন। যাদের উচ্চারণে নেই কোনো জড়তা, যুক্তিতেও অতি আত্মবিশ্বাস। তাদের বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য এতটাই পরিণত যে, শুনলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অধ্যাপকও হয়তো বিস্মিত হয়ে যেতে পারেন। আলাপকালেও বোঝা গেল, তারা যে শুধু বই পড়ে, তা নয়; পাঠ বিশ্লেষণ করে, প্রশ্ন তোলে, এমনকি নিজের মতকে প্রতিষ্ঠা করে। 

অথচ সেখান থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে একটি সরকারি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। ওই শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত পাঠ্যবইয়ের একটি অনুচ্ছেদ মুখস্থ করতে। অনেকটা শব্দে শব্দে পড়ে যাচ্ছে। অথচ অনুচ্ছেদের একটি বাক্যের অর্থ জানতে চাইলে নেমে আসে নীরবতা। মুখস্থ আছে, কিন্তু বোঝাপড়া নেই; উত্তর আছে, কিন্তু চিন্তার চর্চা নেই। শুধু যেন পরীক্ষায় খাতায় নাম্বার তোলার চেষ্টা। 

একই শহর, একই দেশ, একই বয়সের শিক্ষার্থী; তবু যেন দুটি আলাদা শিক্ষাব্যবস্থা। দুটি ভিন্ন বাস্তবতা এবং দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ভবিষ্যৎ। একদল প্রস্তুত হচ্ছে বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতার জন্য, আরেক দল লড়ছে শুধু পরীক্ষার খাতায় পাস নম্বর তোলার জন্য। 

শিক্ষাবিজ্ঞানীরা ও শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই ব্যবধান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি কাঠামোগত বৈষম্যের প্রতিফলন। শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে এমন এক মানচিত্র তৈরি হয়েছে, যেখানে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনেক সময় তার মেধার চেয়ে বেশি নির্ধারিত হয়—সে কোন বিদ্যালয়ে পড়ে, কী ধরনের শিক্ষাক্রম ও  পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে এবং তার শেখার পরিবেশ কেমন। 

ধারাবাহিক এই লেখার দ্বিতীয় পর্বে দেখানো হয়েছিল, কেন একের পর এক কমিশন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বদলাতে পারেনি। বাংলাদেশের নীতি-দলিলগুলো কখনো পরিষ্কারভাবে এই প্রশ্নের জবাব দেয়নি। কিন্তু যেকোনো নীতির চেয়েও আগে একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, নীতিটা আসলে কার জন্য। কবীর চৌধুরী কমিশনে বলা হয়েছিল- শিক্ষা হতে হবে ‘জনমুখী, ভারসাম্যপূর্ণ, সর্বজনীন, সুপরিকল্পিত, বিজ্ঞানমনস্ক ও মানসম্পন্ন।’ সেই নীতির অধীনে চলা শিক্ষাব্যবস্থা এসবের কোনোটাই ধারাবাহিকভাবে হয়ে উঠতে পারেনি।

কারণ বাংলাদেশে আসলে একটা নয়, পাশাপাশি চলছে অনেকগুলো শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাধারা, যাদের মধ্যে সমন্বয় বলতে গেলে নেই। দেশে আছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মাদ্রাসা শিক্ষা, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। আরও আছে  এমপিও ব্যবস্থার অধীনে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়- যেখানে সরকার শিক্ষকদের বেতন ভর্তুকি দেয় ঠিকই, কিন্তু মান বা জবাবদিহির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ প্রায় নেই বললেই চলে। এর বাইরে আছে ব্রিটিশ বা আন্তর্জাতিক শিক্ষাক্রম অনুসরণকারী বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, আর বেসরকারি ইংরেজি ভার্সনের এক আলাদা জগৎ। 

দেশে প্রাথমিক পর্যায়েই ১১টি ভিন্নধারার শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। অথচ এ সময়েই শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠার কথা। কিন্তু এই পর্যায়েই অসংখ্য শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধারার শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই, নেই শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সমন্বিত মূল্যায়ন ব্যবস্থাও।অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, দেশে প্রাথমিক পর্যায়েই ১১টি ভিন্নধারার শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। অথচ এ সময়েই শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠার কথা। কিন্তু এই পর্যায়েই অসংখ্য শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধারার শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই, নেই শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সমন্বিত মূল্যায়ন ব্যবস্থাও। 

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, প্রতিটি ধারার শিক্ষার্থীকেই আসলে কর্মমুখী দক্ষতা নিয়ে বের হওয়া উচিত। তার ভাষায়, যারা মাদ্রাসায় পড়বে তারাও কর্মমুখী হবে, যারা বাংলা মাধ্যমে পড়বে তারাও কর্মমুখী হবে, যারা ইংরেজি মাধ্যমে পড়বে তারাও কর্মমুখী হবে। কিন্তু বাস্তবে ধারাগুলোর মধ্যে এই ন্যূনতম সমতাটুকুই নেই। শিক্ষাবিদদের ভাষায় এই ফাঁকটাই বাংলাদেশের শিক্ষার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। 

ফলাফল কার্যত একটা দ্বি-স্তরীয় ব্যবস্থা। যে পরিবার বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের বেতন দিয়ে বা কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে অথবা বাড়িতে গৃহশিক্ষক রাখার সামর্থ্য রাখে তাদের সন্তানের জন্য শিক্ষা সত্যিকার অর্থেই কাজ করে। আর সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য যে ব্যবস্থা রয়েছে তা শিশুদের একের পর এক পরীক্ষার ভেতর দিয়ে ঠেলে নিয়ে যায়। কিন্তু আসলে কিছু শেখাচ্ছে কি না তার নিশ্চয়তা দেয় না। 

জাতীয় বনাম আন্তর্জাতিক, দুই ভিন্ন প্রস্তুতি
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. মনিরা জাহান বলেন, নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা এমন একটা কাঠামোর মধ্যে পড়াশোনা করে যেখানে মুখস্থনির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। বই সীমিত, সিলেবাস সীমিত, বিভিন্ন লেখকের বই পড়ার সুযোগ নেই, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচয়ও কম হয়। ফলে পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু মুখস্থ করা সম্ভব হলেও স্বাধীনভাবে চিন্তা করা বা নিজের মতামত যুক্তিসঙ্গতভাবে প্রকাশ করার দক্ষতা তৈরি হয় না। তিনি বলেন, এই সমস্যা শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, এটি দীর্ঘদিনের ভুল কাঠামোগত শিক্ষাব্যবস্থার ফল। 

এর প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে। অধ্যাপক জাহান বলেন, জাতীয় কারিকুলাম থেকে আসা শিক্ষার্থীদের নতুন একাডেমিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অনেক সময় লাগে। এটা শুধু ভাষার সমস্যা নয়, এটা নতুন শিক্ষাব্যবস্থা, নতুন শিখন-পদ্ধতি আর স্বাধীন কাজের নতুন এক সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার লড়াই। উল্টো দিকে, ক্যামব্রিজ কারিকুলাম থেকে আসা শিক্ষার্থীরা প্রায়ই বলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষে তারা তুলনামূলক কম চাপ অনুভব করে, কারণ তারা আগে থেকেই এই ধরনের বিশ্লেষণধর্মী পড়াশোনা আর স্বাধীন একাডেমিক সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত।

অনেক শিক্ষার্থী নিজের মাতৃভাষাতেই শুদ্ধভাবে বাক্য গঠন করতে পারে না। ইংরেজির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ফলে চাকরির বাজারে বা বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির সময় তারা বড় সমস্যায় পড়ে।অধ্যাপক ড. মনিরা জাহান, আইইআর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

অধ্যাপক জাহান আরও বলেন, ভাষাগত দক্ষতার ঘাটতিও একটা বড় সমস্যা। অনেক শিক্ষার্থী নিজের মাতৃভাষাতেই শুদ্ধভাবে বাক্য গঠন করতে পারে না। ইংরেজির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ফলে চাকরির বাজারে বা বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির সময় তারা বড় সমস্যায় পড়ে। 

অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আর গণমুখী উচ্চশিক্ষার প্রশ্ন 
তবে শুধু জাতীয় শিক্ষাক্রম খারাপ, আন্তর্জাতিক শিক্ষাক্রম ভালো- বিষয়টা এতটা সরল নয়। অধ্যাপক মজিবুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, আমাদের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। শহুরে শিক্ষার্থী আছে, গ্রামীণ শিক্ষার্থীও আছে। গৃহশিক্ষক, কোচিং ও অন্যান্য শিক্ষা-সহায়তায় প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে বিস্তর পার্থক্য আছে। 

তিনি বলেন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা অত্যন্ত ব্যাপক-ভিত্তিক বা গণমুখী হয়ে উঠেছে, অথচ অনেক দেশেই সবাই উচ্চশিক্ষায় যায় না, সেখানে চালু আছে সক্ষমতা-ভিত্তিক শিক্ষাক্রম। ইংল্যান্ডে যেমন সাধারণ শিক্ষা, উচ্চতর শিক্ষা, গ্রামার স্কুল আর নানা বিকল্প পথ পাশাপাশি চলে। বাংলাদেশে এই ধরনের বিকল্প সীমিত, কেউ জাতীয় পাঠ্যক্রমে, কেউ মাদ্রাসায়, কেউ ইংরেজি মাধ্যমে, কিন্তু একটা থেকে আরেকটায় সহজে যাওয়ার পথ নেই। 

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাধারাকে একীভূত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক জাহান বলেন, পুরোপুরি একীভূত করার প্রয়োজন না থাকলেও সবার জন্য একটি অভিন্ন ভিত্তি নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর মতে, শিক্ষার্থী যে ধারাতেই পড়ুক না কেন, অন্তত একটি ন্যূনতম মানের শিক্ষা অর্জন করে বের হওয়া উচিত।

তবে এর অর্থ সবাইকে একই ছাঁচে ফেলে দেওয়া নয়। অধ্যাপক জাহান বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বৈচিত্র্যকে সম্মান জানাতে হবে। শিক্ষানীতিতে একাধিক মডেলের জায়গা থাকতে পারে, কিন্তু সবার জন্য একটি অভিন্ন ভিত্তি নিশ্চিত করতেই হবে।

একই শহর, একই দেশ; তবে পাঠদানের কারিকুলাম ভিন্ন

মাদ্রাসা শিক্ষা আর অর্থনৈতিক প্রশ্ন 
বাংলাদেশে প্রায় চৌদ্দ হাজার আলিয়া মাদ্রাসা আছে, আর কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা তার চেয়ে বেশি। আলিয়া মাদ্রাসাগুলো রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত একটি শিক্ষাক্রম মেনে চলে, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ বিষয়ও পড়ানো হয়। কওমি মাদ্রাসাগুলো মূলত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে চিরায়ত পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে। দুই ধারাতেই ভর্তির সংখ্যা কম নয়, আর এর বড় অংশই আসে গ্রামীণ ও নিম্ন-আয়ের পরিবার থেকে। নানা স্পর্শকাতরতার দোহাই দিয়ে বিগত সরকারগুলোর সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষায় সংস্কার আনা যায়নি। 

শিক্ষাবিদরা বলছেন, এটা কোনো সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় প্রশ্ন নয়, মূলত অর্থনৈতিক প্রশ্ন। একটা শিশু দশ বছর কওমি মাদ্রাসায় কাটিয়ে যদি গণিত, বিজ্ঞান বা ইংরেজিতে ন্যূনতম দক্ষতা ছাড়াই বের হয়ে আসে, আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজার তাকে উৎপাদনশীলভাবে গ্রহণ করতে পারে না। জনমিতিক লভ্যাংশের মধ্যে থাকা এই তরুণ জনসংখ্যাকে বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারবে কি না, তা নির্ভর করছে তারা স্কুলে গিয়ে সত্যিই কী শিখছে তার ওপর।

চলতি ধারাবাহিকের প্রথম পর্বের সংবাদ পড়ুন: আইসিইউ প্রজন্ম: যে শিক্ষা পাস করায়, চিন্তা করতে শেখায় না 

চলতি ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্বের সংবাদ পড়ুন: পাঁচ দশকে আট নীতি ও কমিশন: অচলাবস্থায় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা

শিক্ষক সংকট, আর গ্রাম-শহরের ফারাক 
বৈষম্য সবচেয়ে বেশি প্রকট হয় শিক্ষার মানে। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক শামস্ রহমান বলেন, শহরের ও গ্রামের পার্থক্য সত্যিই বাড়ছে। আর এর সমাধান শিক্ষক নিয়োগের সংস্কার ছাড়া সম্ভব নয়। তার ভাষায়, কারিকুলাম যেটাই হোক, ফিনিশ, জাপানি বা অন্য কিছু- শেষ পর্যন্ত সেটা বাস্তবায়ন করে শিক্ষক। তাই সরকারকে শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার দিকে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। 

তিনি বলেন, অনেকে প্রশ্ন করতে পারে, আমি কেন গ্রামে গিয়ে শিক্ষকতা করব। এখানে আর্থিক প্রণোদনা দরকার। পাশাপাশি দরকার একটা রোটেশন পদ্ধতি, যেখানে একজন শিক্ষককে সারাজীবন গ্রামে থাকতে হবে না, নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে অন্যত্র বদলি হওয়ার সুযোগ থাকবে। 

শহরের ও গ্রামের পার্থক্য বাড়ছে, এর সমাধান শিক্ষক নিয়োগে সংস্কার ছাড়া সম্ভব নয়। কারিকুলাম যেটাই হোক, ফিনিশ, জাপানি বা অন্য কিছু, শেষ পর্যন্ত সেটা বাস্তবায়ন করে শিক্ষক। তাই সরকারকে শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার দিকে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।—অধ্যাপক শামস্ রহমান, উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইইউনিভার্সিটি

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাবেক উপাচার্য ইমেরিটাস অধ্যাপক এম রিজওয়ান খানও শিক্ষক সংকটকে সবচেয়ে বড় ঘাটতি বলে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৭০ হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সংকট এতটাই প্রকট যে ন্যূনতম জনবল দিয়েও প্রতিষ্ঠান চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। 

তার মতে, সংখ্যার সংকট কাটিয়ে ওঠার পরেই আসে মানের প্রশ্ন। শিক্ষকতায় সর্বোচ্চ মেধার মানুষ আসা উচিত, কিন্তু বাস্তবে সেই পরিবেশ তৈরি হয়নি, কারণ শিক্ষকতার বেতন-কাঠামো ও পেশাগত মর্যাদা অন্য সরকারি চাকরির তুলনায় পিছিয়ে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মেধাবীরা অন্য পেশার দিকে ঝুঁকে পড়ে। 

অধ্যাপক মো. মজিবুর রহমান এই সংকটকে আরও বড় প্রশ্নের সঙ্গে জুড়ে দেন। তিনি বলেন, শিক্ষা কেবল চাকরিজীবী তৈরি করলেই চলবে না, একজন মানুষকে সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল করে তোলাই শিক্ষার মূল কাজ। যদি একদিকে দক্ষ শিক্ষক তৈরির ব্যবস্থা না থাকে, অন্যদিকে যারা আছেন তাদের বেতন-কাঠামো ও মর্যাদাও যথেষ্ট না হয়, তাহলে অনেকেই বাড়তি আয়ের জন্য প্রাইভেট পড়ানোর দিকে ঝুঁকবেন, যা তাদের মূল দায়িত্ব থেকে আরও দূরে সরিয়ে রাখে। 

শিক্ষাবিদদের ভাষায়, এভাবেই তৈরি হয় একটা দুষ্টচক্র। দরিদ্র শিক্ষার্থী পায় দুর্বল শিক্ষক, দুর্বল শিক্ষক তৈরি করে দুর্বল শিখন-ফল, আর দুর্বল শিখন-ফল আরও শক্ত করে তোলে দারিদ্র্যের বেড়ি।

ভোকেশনাল বা কর্মমুখী শিক্ষার গুরুত্ব যতটা বাড়ছে, একই সঙ্গে যদি মূল্যবোধ ও মানবিক শিক্ষা অবহেলিত থাকে, তাহলে একটা ভারসাম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি হবে। শিক্ষা কেবল চাকরি তৈরির যন্ত্র নয়, শিক্ষা মানুষ তৈরির প্রক্রিয়া।অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান, উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

কর্মমুখী শিক্ষা বনাম মানবিক শিক্ষা 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান মনে করেন, শিক্ষার্থীদের অতি অল্প বয়সে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্যে ভাগ করে ফেলাটাই একটা বড় কাঠামোগত সমস্যা। তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক উন্নত শিক্ষাব্যবস্থায় দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত এই কঠোর বিভাজন করা হয় না, বরং সব শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান নিয়ে একটা মৌলিক ধারণা দেওয়ার চেষ্টা হয়। তার মতে, অন্তত দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একটা অভিন্ন শিক্ষাধারা বজায় রাখলে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মানিয়ে নেওয়া অনেক সহজ হতো। 

তিনি এটাও সতর্ক করেন, ভোকেশনাল বা কর্মমুখী শিক্ষার গুরুত্ব যতটা বাড়ছে, একই সঙ্গে যদি মূল্যবোধ ও মানবিক শিক্ষা অবহেলিত থাকে, তাহলে একটা ভারসাম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি হবে না। তার ভাষায়, শিক্ষা কেবল চাকরি তৈরির যন্ত্র নয়, শিক্ষা মানুষ তৈরির প্রক্রিয়া।

আরও পড়ুন: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার অর্থ ব্যয়ের কর্তৃত্ব নিয়ে কী হচ্ছে

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আমানুল্লাহও একই সুরে বলেন, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা জটিল কিছু না, প্রতিটা ধারার শিক্ষার্থীই যেন বাস্তব জীবনে কাজ করার মতো দক্ষতা নিয়ে বের হতে পারে, সেটাই নিশ্চিত করা দরকার।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সবার জন্য সমানভাবে ব্যর্থ হচ্ছে না। এটা সবচেয়ে নির্মমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে সবচেয়ে গরিব আর সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে। যতদিন না এই ব্যবস্থা পটভূমি বা ঠিকানা নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীকে মানসম্পন্ন শিক্ষা দিতে পারছে, ততদিন এই বৈষম্যের চক্র থামবে না।

শিক্ষাবিদরা একটা বিষয়ে প্রায় একমত, এই চার ধারার প্রতিটাই আসলে একেকটা আলাদা ভবিষ্যতের টিকিট। ইংরেজি মাধ্যম থেকে আসা শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে যায় বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি ভর্তি হয়। জাতীয় পাঠ্যক্রমের ভালো ফলাফলধারী শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি লড়াইয়ে নামে, কিন্তু বিশ্লেষণী চিন্তার প্রস্তুতি ছাড়াই। মাদ্রাসার শিক্ষার্থী প্রায়শই এমন এক দক্ষতা নিয়ে বের হয়, যা আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে সরাসরি কাজে লাগে না। আর কারিগরি ও বৃত্তিমূলক ধারার শিক্ষার্থীর সামনে উচ্চশিক্ষার পথ প্রায় বন্ধই থেকে যায়। 

এই চারটা পথ কাগজে-কলমে সমান্তরাল হলেও বাস্তবে সমান নয়। একজন শিক্ষার্থী কোন পথে হাঁটবে, সেটা তার মেধা নয়, অধিকাংশ সময়ই তার বাবা-মায়ের আয় ঠিক করে দেয়। শিক্ষাবিদদের ভাষায়, এখানেই আসল সংকট, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মেধার বদলে সামর্থ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ বণ্টন করছে।

যারা মাদ্রাসায় পড়বে তারাও কর্মমুখী হবে, যারা বাংলা মাধ্যমে পড়বে তারাও কর্মমুখী হবে, যারা ইংরেজি মাধ্যমে পড়বে তারাও কর্মমুখী হবে। কিন্তু বাস্তবে ধারাগুলোর মধ্যে এই ন্যূনতম সমতাটুকুই নেই, শিক্ষাবিদদের ভাষায় এই ফাঁকটাই বাংলাদেশের শিক্ষার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ, উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় 

শুরুর সেই দুই শ্রেণিকক্ষের ছবিতে ফিরে যাওয়া যাক। ঢাকার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থী আর কয়েক কিলোমিটার দূরের সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থী, দুজনেই বাংলাদেশের নাগরিক, দুজনেরই বয়স কাছাকাছি, কিন্তু তাদের সামনে সুযোগের পার্থক্য আকাশ-পাতাল। একজনের সামনে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়, বিদেশে পড়াশোনা আর ভালো চাকরির পথ খোলা, আরেকজনের সামনে পরীক্ষা পাসের বাইরে খুব বেশি কিছু নেই।

শিক্ষাবিদরা মনে করেন, এই ফারাকটা কোনো একটা নীতি বদলে বা একটা কমিশন গঠন করে মিটবে না, কারণ এটা মূলত শিক্ষকের সংখ্যা ও মান, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, আর ধারাগুলোর মধ্যে ন্যূনতম একটা অভিন্ন ভিত্তি না থাকার সম্মিলিত ফল। যতদিন এই তিনটা জায়গায় হাত না দেওয়া হবে, ততদিন সরকারি স্কুল, বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম, মাদ্রাসা আর বৃত্তিমূলক ধারা, এই চার পথ একই দেশে চলতে থাকবে, কিন্তু কখনো এক গন্তব্যে গিয়ে মিলবে না।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা তাই সমানভাবে ব্যর্থ হচ্ছে না। এটা সবচেয়ে নির্মমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে, আর সবচেয়ে ভালোভাবে কাজ করছে তাদের জন্য, যাদের এমনিতেও সবচেয়ে কম প্রয়োজন ছিল। যতদিন না এই ব্যবস্থা পটভূমি বা ঠিকানা নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীকে মানসম্পন্ন শিক্ষা দিতে পারছে, ততদিন এই বৈষম্যের চক্র থামবে না, আর ঢাকার সেই দুই স্কুলের মধ্যেকার কয়েক কিলোমিটার দূরত্ব আসলে থেকে যাবে দুই ভিন্ন বাংলাদেশের দূরত্ব হয়েই। 

এই ধারাবাহিকের পরবর্তী পর্বে থাকছে বাংলাদেশের শিক্ষক সংকটের অন্তরালের গল্প— কেন দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসছেন না। 

কাজী লিবানের পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি লাভ
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
৬৪ দলের বিশ্বকাপের রূপরেখা দিলেন ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
নওগাঁয় ঘর থেকে দম্পতির মরদেহ উদ্ধার
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
ময়মনসিংহে সাড়ে ১৮ হাজার ইয়াবাসহ ৪ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
বৃষ্টিতে ভিজে হাঁটু পানি মাড়িয়ে নৌকায় চড়ে কেন্দ্রে এইচএ…
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
২৪ ঘণ্টায় ৬ বিভাগে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, ঢাকায় আরও জলাবদ্…
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence