মানবকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা: পরিবেশ বিপর্যয়ের গোপন নেপথ্য কারিগর

১৯ জুন ২০২৬, ০১:৩৫ PM , আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ০২:৪০ PM
আঞ্জুমান নাহার 

আঞ্জুমান নাহার  © সংগৃহীত

আমরা প্রায় সবাই বিশ্বাস করি—শিক্ষাই একটি জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু সেই মেরুদণ্ড যদি পরিবেশ-সচেতনতা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি বিপন্ন ও অনিরাপদ পৃথিবীর দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। আজকের বাংলাদেশের শিক্ষা কাঠামোকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়—এটি এখনো পরিবেশবান্ধব বা ‘ইকোসেন্ট্রিক’ চরিত্র অর্জন করতে পারেনি।

পাঠ্যবইয়ে পরিবেশ বিষয়ক আলোচনা থাকলেও তা সীমিত, মুখস্থনির্ভর এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাহীন। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মানবকেন্দ্রিকতার ভুল দার্শনিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে। এর ফলে শিক্ষার্থীর আচরণে, চিন্তায় বা জীবনচর্চায় পরিবেশ রক্ষার প্রকৃত চেতনা তৈরি হয় না। এ দৃষ্টিভঙ্গি না বদলালে পরিবেশ বিপর্যয় অব্যাহত থাকবে।

পাঠ্যসূচিতে পরিবেশ শিক্ষার ঘাটতি :
পরিবেশ শিক্ষা আমাদের পাঠক্রমে তথ্য হিসেবে আছে, কিন্তু অভিজ্ঞতা হিসেবে নেই। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে যেসব পরিবেশ-সম্পর্কিত পাঠ রয়েছে, তা অধিকাংশই মুখস্থনির্ভর। শিক্ষার্থীরা প্রকৃতি কে বইয়ের পাতার তথ্য মনে করে, জীবনের অংশ মনে করে না। এই জ্ঞান কখনো বাস্তব প্রয়োগে যায় না—ফলে পরিবেশ সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা তাদের ভেতরে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গড়ে ওঠে না।

প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন স্কুল–কলেজ
শহরে অনেক স্কুল-কলেজে নেই খোলা মাঠ, নেই গাছপালা, নেই জীববৈচিত্র্যের স্বাভাবিক উপস্থিতি। চারদিকে সিমেন্ট–পাথরের দেয়ালে বন্দী থেকে শিক্ষা গ্রহণের ফলে শিক্ষার্থীরা প্রকৃতি থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। প্রকৃতিকে যে আপন করে নিতে হয়—এই অনুভূতিটাই তৈরি হয় না। ফলে তারা প্রকৃতির মূল্য বুঝতে পারে না; যত্ন তো দূরের কথা।

প্রযুক্তিনির্ভরতা ও ডিজিটাল দূষণ
অনলাইন শিক্ষা, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, বিদ্যুৎ খরচ এবং ই–বর্জ্যের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইলেকট্রনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো নীতিমালা নেই। বাতিল কম্পিউটার, পুরোনো যন্ত্রপাতি যত্রতত্র ফেলা হয়—মাঠ, নদী, খাল-বিল পর্যন্ত দূষিত হয়। পরিবেশ সচেতনতার অভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই হয়ে উঠছে দূষণের উৎস।

পরিবেশবান্ধব প্রকল্প–কার্যক্রমের অনুপস্থিতি
গাছ লাগানো, পানি সংরক্ষণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ব্যবহার, জীববৈচিত্র্য রক্ষার মতো প্রকল্প আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় নেই বললেই চলে। রাজনীতি নিয়ে যত উন্মাদনা—তার এক শতাংশ মনোযোগও যদি পরিবেশে দেওয়া হতো, তাহলে জলবায়ু সঙ্কট কিছুটা হলেও ধীরগতি পেত।

কাগজনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা: অদৃশ্য পরিবেশ ধ্বংস
আমাদের পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা অস্বাভাবিকভাবে কাগজনির্ভর। শিক্ষার্থীরা মনে করে যত বেশি লিখবে, তত বেশি নম্বর পাবে। ফলে অযথাই কয়েকটি অতিরিক্ত উত্তরপত্র ব্যবহার করা হয়। একটি পরীক্ষার সমগ্র উত্তরপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় অতিরিক্ত কাগজের জন্য বছরে হাজারো গাছ নিধনের সমান ক্ষতি হয়। অথচ সৃজনশীল মূল্যায়নই প্রমাণ করেছে সংক্ষিপ্ত, টু-দ্য-পয়েন্ট উত্তর দিয়েও উচ্চ নম্বর অর্জন সম্ভব।

মানবকেন্দ্রিক শিক্ষাদর্শনের দার্শনিক ভুল
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এক ধরনের অ্যানথ্রোপোসেন্ট্রিক অর্থাৎ মানুষকেন্দ্রিক দর্শনের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এখানে মানুষই সবকিছুর কেন্দ্র, আর প্রকৃতি কেবল ব্যবহারের উপাদান। শিক্ষার্থীরা নিজের অজান্তেই এই ভুল দর্শন আত্মস্থ করে ফলে তারা মনে করে প্রকৃতি মানুষের সম্পদ, মানুষ প্রকৃতির মালিক।

কিন্তু দার্শনিক প্লেটো, রুশো, হাইডেগার, অল্ডো লিওপোল্ড, হোমস রলস্টন, ক্যালিকট, সিঙ্গার, টম রেগান–সহ আধুনিক পরিবেশনীতিবিদরা স্পষ্টভাবে বলেছেন প্রকৃতি নিজেই একটি নৈতিক সত্তা। মানুষ তার অংশ, মালিক নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এই সত্যকে উপেক্ষা করছে।

জ্ঞানতাত্ত্বিক ভুল
শিক্ষা শুধু তথ্য দিলেই হয় না; অভিজ্ঞতা দিতে হয়। প্লেটো জ্ঞানকে দেখেছেন ন্যায়সঙ্গত সত্য বিশ্বাস হিসেবে। রুশো বলেছেন মানুষের সব দুর্ভোগ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতার ফল। কিন্তু আমাদের পাঠ্যসূচিতে প্রকৃতির অভিজ্ঞতা নেই। ফলে পরিবেশবোধ জন্মায় না।

নৈতিক ভুল
ইমানুয়েল কান্ট বলেছিলেন নৈতিকতা হলো এমন কাজ, যা সর্বজনীনভাবে সঠিক। প্রকৃতি ধ্বংস করে উন্নয়ন করা কখনো নৈতিক হতে পারে না। মালিক নন বলেছেন ইসলামী দার্শনিকগণও মানুষকে প্রকৃতির তত্ত্বাবধায়ক। আমাদের পাঠ্যক্রম এই নৈতিকতা শেখায় না।

আরও পড়ুন : সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতা নির্মূলের আন্তর্জাতিক দিবস আজ

সামাজিক-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ভুল
শিক্ষার্থীদের শেখানো হচ্ছে ভালো ফল = ভালো চাকরি = বেশি ভোগ = উন্নত জীবন। ফলে তারা গ্রাম, নদী, প্রকৃতি থেকে দূরে গিয়ে কংক্রিটের শহরে আকৃষ্ট হয়। নগরায়ন বাড়ে ফলে বন উজাড়, নদী ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়। মার্কসবাদী তত্ত্বও বলে এই শিক্ষাব্যবস্থা পুঁজিবাদী ভোগবাদকে শক্তিশালী করে, যার কেন্দ্রে আছে প্রকৃতির শোষণ।

পরিবেশ নীতিবিদ্যার আলোকে সমস্যার গভীরতা
আলডো লিওপোল্ড বলেছেন, যে কাজ জীবজগতের সামগ্রিকতা, স্থিতি ও সৌন্দর্য রক্ষা করে—সেটাই সঠিক। আমাদের শিক্ষা এই দর্শন শেখায় না। হোমস রোলস্টন বলেছিলেন প্রত্যেক জীবের নিজস্ব মূল্য আছে। টম রেগান বলেছেন প্রাণীরা সাবজেক্ট অফ এ লাইফ—তাদের অধিকার আছে।
পল টেলর বলেছেন, প্রত্যেক জীব একেকটি টেলিওলজিক্যাল সেন্টার অফ লাইফ। কিন্তু আমাদের পাঠ্যক্রমে এগুলোর কোনো ছাপ নেই।

ইকোফেমিনিজম ও উপনিবেশোত্তর দৃষ্টিভঙ্গি
নারী-প্রকৃতি উভয়ই শোষণের শিকার কিন্তু আমাদের শিক্ষা এসব বিশ্লেষণ শেখায় না। উপনিবেশিক শিক্ষা মডেলও প্রকৃতিকে রিসোর্স হিসেবে দেখায়, কমিউনিটি সদস্য হিসেবে নয়।

রাষ্ট্রের প্রতি সরাসরি বার্তা
রাষ্ট্র যদি টেকসই উন্নয়ন চায়, তাহলে শুধু পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল বা উঁচু ভবন নির্মাণ যথেষ্ট নয়। শিক্ষাব্যবস্থার ভিতরেই পরিবেশ-নৈতিকতা, পরিবেশ-জ্ঞান ও পরিবেশ-চরিত্র গড়ে তুলতে হবে। নইলে সব উন্নয়নই হবে ক্ষণস্থায়ী, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উত্তরাধিকার পাবে একটি ধ্বংসপ্রায় পৃথিবী।

রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে— আমরা কি এমন শিক্ষা চাই, যা মানুষকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে? নাকি এমন শিক্ষা চাই, যা মানুষকে প্রকৃতির অংশ হিসেবে নৈতিক ও সহানুভূতিশীল করে গড়ে তোলে? পরিবেশবান্ধব শিক্ষা আর বিলাসিতা নয়—এটি আজ বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার মৌলিক শর্ত।

লেখক, প্রভাষক, দর্শন বিভাগ, সরকারি ইয়াসিন কলেজ, ফরিদপুর। 

নেত্রকোনায় ইয়াবা-গাঁজাসহ দুই মাদক কারবারি আটক
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জাতীয় ছাত্রশক্তির
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
মেসির হাতে ফের উঠবে কি বিশ্বকাপের শিরোপা, কী বলছে সুপারকম্প…
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
যবিপ্রবির প্রথম বর্ষের ওরিয়েন্টেশন ১৫ জুলাই
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
মাদ্রাসার ৫৬ শিক্ষক-কর্মচারীর নামের বানান ও সনদ নিয়ে জরুরি …
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
নতুন জুয়া আইনে মামলা: গ্রেপ্তার দুই আসামি চার দিনের রিমান্ডে
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence