আইসিইউ প্রজন্ম: যে শিক্ষা পাস করায়, চিন্তা করতে শেখায় না

বাংলাদেশের শিক্ষা-সংকট নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিকের প্রথম পর্ব

প্রতীকী গ্রাফিক

প্রতীকী গ্রাফিক © টিডিসি সম্পাদিত

স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পরও বাংলাদেশের কার্যকর কোনো জাতীয় শিক্ষানীতি নেই। আছে শুধু একের পর এক কমিশনের প্রতিবেদন। ১৯৭২ সালের কুদরাত-ই-খুদা কমিশন থেকে শুরু করে ২০১০ সালের কবির চৌধুরী কমিশন— মোট আটটি কমিশন শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সুপারিশ দিয়েছে। প্রতিটি কমিশনেই ছিলেন আন্তরিক ও দায়িত্বশীল মানুষ। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই তাদের সুপারিশ ধুলায় চাপা পড়েছে। কোনোটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হয়েছে, কোনোটি নতুন সরকার বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নীরবে হারিয়ে গেছে। ২০১০ সালের নীতিটি শুধু একটি অর্থে ব্যতিক্রম। সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হয়নি, কিন্তু পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িতও হয়নি।

২০২৬ সালের শুরুতে বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় নির্বাচনে জয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষাকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার দিয়েছে। সেখানে জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ, পাঠ্যক্রম সংস্কার, মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, সর্বজনীন কারিগরি শিক্ষা এবং নারীদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

গত মে মাসে লন্ডনে অনুষ্ঠিত এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ফোরামে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সরকারের ‘আনন্দময় শিক্ষা’ মডেলের অঙ্গীকার তুলে ধরেন। দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১২ দফা সংস্কার পরিকল্পনাও প্রকাশ করেছে। চিহ্নিত করা হয়েছে ৪৩টি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র। প্রণয়ন করা হচ্ছে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

এ সকল অঙ্গীকারের আন্তরিকতা নিয়ে কারও প্রশ্ন নেই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে— আগের প্রতিটি উদ্যোগকে যে একই কাঠামোগত সমস্যাগুলো ব্যর্থ করেছে, সেগুলোর মুখোমুখি হয়েও এবার সংস্কারের উদ্যোগ টিকে থাকবে কিনা। এক্ষেত্রে অবশ্য বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আসলে কী, এটি কোন উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয়েছিল এবং ইতিহাসজুড়ে কার স্বার্থ রক্ষা করেছে— তা পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখন আইসিইউতে, না হলেও অন্তত সিসিইউতে— অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

দেশের শিক্ষার মান ও ব্যবস্থাপনাগত সংকট নিয়ে দীর্ঘ হতাশা রয়েছে শিক্ষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে। তারা বলছেন, শিক্ষার দর্শন ও জাতীয় লক্ষ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে শিক্ষানীতি, শিক্ষাক্রম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষাদান, শিখন ও মূল্যায়ন পদ্ধতি ও ব্যবস্থা সাজানো হয়নি। সময়ের চাহিদা, দেশীয় ও বৈশ্বিক অগ্রগতি এবং জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত হালনাগাদ হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা সনদ পাচ্ছে বটে, তবে প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন হয়নি। গড়ে উঠেনি প্রয়োজনীয় মানবিক গুণাবলীও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশিদের মতে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখন আইসিইউতে, না হলেও অন্তত সিসিইউতে। তার কণ্ঠে ফুটে ওঠে বহু বছর ধরে নিজের ভালোবাসার এই ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে দেখার ক্লান্তি। তবে এমন মূল্যায়ন কেবল অধ্যাপক মনিনুর রশিদের নয়। বাংলাদেশের যেকোনো শিক্ষাবিদের সঙ্গে কথা বললেই একই ধরনের উদ্বেগের কথা শোনা যায়। তাদের মতে, রোগী সংকটাপন্ন, কিন্তু তার চিকিৎসা কী হবে, সে বিষয়ে কারও মধ্যে ঐকমত্য নেই।

এমকি পরিসংখ্যানও এক ধরনের বৈপরীত্যের চিত্র তুলে ধরে। শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। ভর্তির হার বেড়েছে, বেড়েছে সাক্ষরতার হার। আগের তুলনায় অনেক বেশি শিশু এখন স্কুলে যাচ্ছে। কিন্তু সুযোগ বাড়লেই যে শিক্ষার মান বাড়ে, বাস্তবতা তা বলছে না।

সংখ্যাগুলো আসলে কী বলছে
২০২৫ সালের হিসাবে বাংলাদেশের সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। শুনতে এটি অগ্রগতির চিত্রই মনে হয়, এবং প্রকৃত অর্থেও তা-ই। ১৯৮১ সালে এই হার ছিল ২৯ শতাংশ। কিন্তু বেশির ভাগ জাতীয় জরিপে ব্যবহৃত সাক্ষরতার সংজ্ঞা অত্যন্ত সীমিত। সেখানে সাক্ষরতা বলতে সাধারণত একটি ছোট বাক্য পড়তে পারাকেই বোঝানো হয়। একজন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পর্যায়ের গণিত করতে পারে কিনা, সুসংগত যুক্তি লিখতে পারে কিনা বা সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারে কিনা— এসবের কোনো মূল্যায়ন এতে নেই। সেই মানদণ্ডে বাংলাদেশের চিত্র অনেক বেশি উদ্বেগজনক।

ব্র্যাক গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের (বিআইজিডি) গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪৩ শতাংশ শিক্ষার্থীর ইংরেজিতে প্রাথমিক সাক্ষরতাও নেই। মাত্র ৫৭ শতাংশ ইংরেজি বর্ণমালা চিনতে পারে। সরকারি বিদ্যালয়ের মাত্র ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী একটি সাধারণ ইংরেজি বাক্যের অর্থ বুঝতে পারে। আর মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, ২০১৭ সালের মূল্যায়নের পরও এই চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। অর্থাৎ, পাঁচ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ফলাফলে বাস্তব কোনো অগ্রগতি হয়নি।

সবাই সবাইকে দোষ দিচ্ছে। কিন্তু দোষারোপ কোনো সমাধান নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছি? আমরা কি যথাযথ সংস্কার বাস্তবায়ন করছি, নাকি শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতা দিচ্ছি?— অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মাধ্যমিক পর্যায়ের চিত্রও খুব একটা ভিন্ন নয়। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ স্তরে ঝরে পড়ার হার ৩৩ শতাংশ। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীদের তুলনায় মাধ্যমিকে ভর্তির হার কমেছে ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। আবার ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার কমেছে ৭ শতাংশ। ঝরে পড়ার পেছনেও রয়েছে পরিচিত কিছু কারণ। মোট ঝরে পড়ার ৯ দশমিক ২ শতাংশের জন্য দায়ী শিশুশ্রম। আর মেয়েদের ঝরে পড়ার ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশের পেছনে রয়েছে বাল্যবিবাহ।

এডুকেশন ওয়াচের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এক অর্থবছরের প্রথমার্ধেই পরিবারগুলোর নিজস্ব শিক্ষা ব্যয় মাধ্যমিক পর্যায়ে ৫১ শতাংশ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ২৫ শতাংশ বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে দেশের সংবিধানে প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার লক্ষণ।

দেশের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স স্কোর ০ দশমিক ৪৮, যা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক গড়ের নিচে। এমনকি নেপালেরও নিচে। টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাঙ্কিংস ২০২৫-এর শীর্ষ ৮০০-তে বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও নেই। একই তালিকায় ভারতের ২২টি এবং পাকিস্তানের ৯টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। এটি শুধু সম্পদের ঘাটতির চিত্র নয়; সুশাসন ও অগ্রাধিকার নির্ধারণের সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন।

শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ৭ থেকে ২ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করে, যেখানে ইউনেস্কোর সুপারিশ ৪ থেকে ৬ শতাংশ। সংশোধিত বাজেটে জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ ২০২০ অর্থবছরের ১ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৫২ শতাংশে।

২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা ব্যয়ে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে নিচের তিন দেশের একটি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের চেয়ে কম ব্যয় করে শুধু হাইতি ও সোমালিয়া। অথচ মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক হওয়া সত্ত্বেও একই সময়ে সেনেগাল শিক্ষায় ব্যয় করেছে জিডিপির ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।

আমরা প্রায়ই দেখি, অনেক শিক্ষার্থী নিজের মাতৃভাষায় সুন্দর করে লিখতে পারে না। তাদের মৌলিক বাক্যগঠনেই সমস্যা। প্রত্যাশিত মানের বাক্যও তারা গঠন করতে পারে না— অধ্যাপক মনিরা জাহান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)

মোট সরকারি ব্যয়ের অনুপাতে শিক্ষা খাতের বরাদ্দও কমেছে। ২০২৪ সালে যা ছিল প্রায় ১২ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশে। অর্থাৎ, শুধু বরাদ্দের পরিমাণই কমছে না, প্রবণতাও নিম্নমুখী। বাজেট বাস্তবায়নের চিত্র আরও উদ্বেগ বাড়ায়। শিক্ষা খাতে উন্নয়ন ব্যয়ের বাস্তবায়ন হার ২০১০ অর্থবছরে ছিল ১০২ শতাংশ। ২০২৩ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৯ শতাংশে। অর্থাৎ, যে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে, তারও পুরোটা ব্যয় করা যায়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটিই বাংলাদেশের শিক্ষা-সংকটের বাস্তব চিত্র। এই সংকট সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে তখন, যখন একজন শিক্ষার্থী স্কুল পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় এবং বুঝতে পারে, উচ্চশিক্ষার বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদা পূরণের জন্য সে মোটেই প্রস্তুত নয়। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) অধ্যাপক এম রিজওয়ান খান বলছেন, আমরা এমন শিক্ষার্থী তৈরি করছি, যারা পরীক্ষায় পাস করতে পারে, কিন্তু চিন্তা করতে পারে না। তারা পাঠ্যবই হুবহু মুখস্থ বলতে পারে, কিন্তু একটি অনুচ্ছেদও সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে না।

দোষারোপের খেলা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা হিমশিম খায় কেন— কোনো অধ্যাপককে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি দোষ দেবেন কলেজব্যবস্থাকে। একজন কলেজ অধ্যক্ষ বলবেন, সমস্যার শুরু মাধ্যমিক স্তরে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক দায় চাপাবেন প্রাথমিক শিক্ষার ওপর। আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বলবেন, অভিভাবকেরা তাদের দায়িত্ব পালন করছেন না। এভাবে সবাই একে অন্যের দিকে আঙুল তুলছেন। কিন্তু দায় নিচ্ছেন না কেউ।

এই চিত্রের প্রতিধ্বনি শোনা গেল অধ্যাপক মনিনুর রশিদের বক্তব্যে। তিনি বলেন, আমরা একটা দোষারোপের খেলায় আটকে আছি। সবাই সবাইকে দোষ দিচ্ছে। কিন্তু দোষারোপ কোনো সমাধান নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছি? আমরা কি যথাযথ সংস্কার বাস্তবায়ন করছি, নাকি শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতা দিচ্ছি?

তবে শিক্ষাবিদদের মতে, এই চিত্র নতুন নয়। একজন শিক্ষার্থী বারো বছর কাটায় এমন এক ব্যবস্থায়, যেখানে মুখস্থবিদ্যা পুরস্কৃত হয়, কৌতূহল নয়। সেখানে শেখানো হয় পুনরাবৃত্তি করতে, বোঝার চেষ্টা করতে নয়। গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে, কিন্তু সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা হয় না। তারপর সেই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে এমন এক পরিবেশে পড়ে, যেখানে তার কাছে স্বাধীনভাবে চিন্তা করা, বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করা এবং নিজের যুক্তি গড়ে তোলার প্রত্যাশা করা হয়। ফলাফল— এক বুদ্ধিবৃত্তিক ধাক্কা।

অধ্যাপক মনিনুর রশিদ বলেন, শিক্ষার্থীদের দোষ দেওয়া ঠিক নয়। এটি দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত ব্যবস্থার ফল। অনেক শিক্ষার্থী বুঝতেই পারে না, একটি বিষয় নিয়ে কীভাবে চিন্তা করতে হয় বা নিজের ভাষায় নিজেকে কীভাবে প্রকাশ করতে হয়।

দুই ব্যবস্থা, দুই নিয়তি 
বিভিন্ন শিক্ষা-পটভূমি থেকে আসা শিক্ষার্থীদের তুলনা করলে দেখা যায়, দেশে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আসা শিক্ষার্থীরা সাধারণত প্রথম বর্ষেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। কারণ, তারা আগে থেকেই বিভিন্ন উৎস থেকে পড়তে, প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে এবং যুক্তিনির্ভর বক্তব্য গড়ে তুলতে অভ্যস্ত। ইংলিশ মিডিয়ামে ক্যামব্রিজসহ অন্য পাঠ্যক্রমগুলোতে বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষা ও স্বাধীন চিন্তাকে গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়। অন্যদিকে, জাতীয় পাঠ্যক্রম থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সেই ব্যবধান কাটিয়ে উঠতে প্রায়ই দুই থেকে তিন বছর লেগে যায়— যদি তারা শেষ পর্যন্ত তা কাটিয়ে উঠতে পারেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, ক্যামব্রিজ পাঠ্যক্রম থেকে আসা শিক্ষার্থীরা প্রায়ই বলে, প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষে তারা তুলনামূলক কম চাপ অনুভব করে। কারণ তারা আগে থেকেই বিশ্লেষণধর্মী ও স্বাধীন শিক্ষার পরিবেশে অভ্যস্ত।

আমরা শিক্ষাক্রম নিয়ে কথা বলি, নীতি নিয়ে কথা বলি; কিন্তু শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য কী, সেটিই কখনো নির্ধারণ করি না— অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু ভাষাগত দক্ষতার প্রশ্ন নয়; এটি চিন্তার ধরন ও শেখার পদ্ধতিরও প্রশ্ন। বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের মাতৃভাষাতেও ঠিকমতো লিখতে পারে না। তাদের বাক্যগঠন দুর্বল, বানানে ভুল থাকে, প্রকাশভঙ্গিও অস্পষ্ট। ইংরেজির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এ বিষয়ে অধ্যাপক মনিনুর রশিদ বলেন, অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজি বই পড়তে বা রেফারেন্স উপকরণ ব্যবহার করতে চায় না। চাকরির বাজারে প্রবেশের সময় কিংবা বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করতে গিয়ে এটি তাদের বড় বাধার মুখে ফেলে।

নিজের ভাষাতেই সংকট
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পর্যবেক্ষণটি এসেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) অধ্যাপক মনিরা জাহানের কাছ থেকে। তিনি একটি মৌলিক বৈপরীত্যের কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে অনেক শিক্ষার্থী নিজের মাতৃভাষাতেই ভাব প্রকাশে হিমশিম খায়। তিনি বলেন, আমরা প্রায়ই দেখি, অনেক শিক্ষার্থী নিজের মাতৃভাষায় সুন্দর করে লিখতে পারে না। তাদের মৌলিক বাক্যগঠনেই সমস্যা। প্রত্যাশিত মানের বাক্যও তারা গঠন করতে পারে না।

শিক্ষাবিদদের মতে, এটি কোনো সামান্য সমস্যা নয়। ভাষাই চিন্তার ভিত্তি। নিজের ভাব স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা না গেলে স্পষ্টভাবে চিন্তা করাও কঠিন। তবে সমস্যা এখানেই শেষ নয়। অনেক শিক্ষার্থী অপেক্ষাকৃত কঠিন পাঠ্য এড়িয়ে চলে। তারা গাইড বই বা সরলীকৃত নোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। মুখস্থ করে, পরীক্ষায় লিখে আসে, কিন্তু পাঠ্যবস্তুর সঙ্গে প্রকৃত অর্থে সম্পৃক্ত হয় না। এর ফলে তাদের চাকরি কিংবা বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আবেদনের ক্ষেত্রেও অনেক বেশি সংগ্রাম করতে হয় বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক মনিরা জাহান।

দিকনির্দেশনাহীন ব্যবস্থা
এই সংকট এত দিন ধরে টিকে আছে কেন? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর উত্তর আরও গভীর একটি সমস্যার দিকে নিয়ে যায়। বাংলাদেশ এখনো স্পষ্টভাবে ঠিক করতে পারেনি, শিক্ষা দিয়ে কী ধরনের মানুষ গড়ে তুলতে চায়। অধ্যাপক মনিনুর রশিদ বলেন, আমরা এখনও স্পষ্টভাবে ঠিক করতে পারিনি, কী ধরনের শিক্ষার্থী আমরা তৈরি করতে চাই।

ঢাবি আইইআরের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে বলেন, আমরা শিক্ষাক্রম নিয়ে কথা বলি, নীতি নিয়ে কথা বলি; কিন্তু শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য কী, সেটিই কখনো নির্ধারণ করি না।

তার মতে, এটি নিছক একাডেমিক বিতর্ক নয়। একটি স্পষ্ট জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া প্রতিটি সংস্কারই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে পরিণত হয়। সিলেবাস বদলায়, পাঠ্যবই বদলায়, পরীক্ষা পদ্ধতি বদলায়; কিন্তু মৌলিক সমস্যাগুলো থেকে যায়। অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, আমাদের একাধিক কমিশন হয়েছে, একাধিকবার পাঠ্যক্রম পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি নতুন সরকার আগের সরকারের উদ্যোগ বাতিল করেছে। ফলে কোনো ধারাবাহিকতা গড়ে ওঠেনি।

এই বিশৃঙ্খলার মানবিক মূল্য প্রতিদিন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শ্রেণিকক্ষে দৃশ্যমান। একজন শিক্ষার্থীকে বছরের পর বছর শেখানো হয়েছে, সাফল্য মানে সঠিক উত্তর মুখস্থ করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে হঠাৎ তাকে বলা হচ্ছে, প্রশ্ন করতে হবে। সেখানেই সে থমকে যায়। সে জানে না কীভাবে চিন্তা করতে হয়। জানে না কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়। কারণ, তাকে কখনো তা শেখানোই হয়নি। এটি কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। এটি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা। অধ্যাপক মজিবুর রহমানের ভাষায়, ‘শিক্ষার্থীদের দোষ নেই, দোষ আমাদের।’

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
তাহলে একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হতে পারে? অধ্যাপক মনিনুর রশিদের মতে, শিক্ষার্থীদের শুরু থেকেই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। উচ্চশিক্ষায় গিয়ে তারা যেন নতুন বাস্তবতার মুখে হতভম্ব হয়ে না পড়ে। এর অর্থ শুধু মুখস্থ করানো নয়; চিন্তা করতে শেখানো। কৌতূহলকে দমন না করে উৎসাহিত করা এবং পুনরাবৃত্তির চেয়ে বোঝাপড়াকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। তবে এর জন্য প্রয়োজন বাংলাদেশের শিক্ষা-দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক পরিবর্তন— যা স্পষ্ট জাতীয় নেতৃত্ব ছাড়া সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, আমাদের একটি স্পষ্ট জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবসম্পদ পরিকল্পনা দরকার। তবেই আমরা পুরো শিক্ষাব্যবস্থা নতুন করে গড়ে তোলা শুরু করতে পারব।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের অলসতা বা শিক্ষকদের অযোগ্যতার কারণে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ব্যর্থ হচ্ছে না। বরং এটি ব্যর্থ হচ্ছে, কারণ এই ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল অনুগত মুখস্থবিদ তৈরির জন্য; স্বকীয় চিন্তা ধারণ করতে পারে এমন মানুষ গড়ে তোলার জন্য এটি গড়ে তোলা হয়নি। ফলে এই ব্যবস্থা এখনো অতীতের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করছে। অথচ যে পৃথিবীর জন্য এটি তৈরি হয়েছিল, সেই পৃথিবী আর নেই।

আমাদের একাধিক কমিশন হয়েছে, একাধিকবার পাঠ্যক্রম পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি নতুন সরকার আগের সরকারের উদ্যোগ বাতিল করেছে। ফলে কোনো ধারাবাহিকতা গড়ে ওঠেনি— অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমত নেই কারো। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশ্নটি এই নয় যে— শিক্ষা সংস্কার প্রয়োজন কিনা। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, সেই সংস্কার বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা বাংলাদেশের আছে কিনা।

অধ্যাপক মজিবুর রহমানের ভাষায়, কারিগর যদি ঠিক না হয়, তাহলে ভালো কিছু তৈরি করা অসম্ভব। এখন আমাদের শিক্ষকরা স্বল্প বেতনে অতিরিক্ত পরিশ্রম করছেন, অথচ তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। কারিগরকে গড়ে না তুললে ভালো পণ্যও তৈরি হবে না।

এই ধারাবাহিকের পরবর্তী পর্ব: পাঁচ দশকে আটটি শিক্ষা কমিশন শত শত সুপারিশ করেও কেন বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারেনি, সেই ইতিহাস।

শিশু ও পরিবারের স্বাস্থ্যসেবায় নগর এলাকায় ‘আলো ক্লিনিক’ মডে…
  • ০৯ জুলাই ২০২৬
১৫ জুলাই প্রতিটি বিদ্যালয়ে ৫টি গাছ লাগাতে হবে, অতি জরুরি নি…
  • ০৯ জুলাই ২০২৬
স্বতন্ত্র কোডের দাবি: আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা শেকৃবি …
  • ০৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয় পরিবেশ পদক পেলেন ৬ জন
  • ০৯ জুলাই ২০২৬
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি, আবেদন ২৮ জুল…
  • ০৯ জুলাই ২০২৬
স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন: নির্ধারিত সময়ে হয়নি খসড়া, কমিটির মেয়…
  • ০৯ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence