বিদেশে শিক্ষায় বাংলাদেশিদের ব্যয়ের রেকর্ড, এক বছরে ৮২ হাজার কোটি টাকা

২৪ মে ২০২৬, ০৯:২১ PM , আপডেট: ২৪ মে ২০২৬, ১০:১৩ PM
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

বিগত দুই দশকে বিদেশে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা তীব্র হারে বেড়েছে। সেই সাথে বেড়েছে শিক্ষার্থীপ্রতি পরিবারের ব্যয়ও। কেবল ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই বিদেশে শিক্ষায় বাংলাদেশিদের খরচ হয়েছে রেকর্ড ৮২ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। যা আগের বছরের তুলনায় ২২ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেশি। এই পরিসংখ্যানের আড়ালেই লুকিয়ে আছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের সুযোগ-সুবিধার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে একটি প্রজন্ম। আর তাই মাত্র ২৩ বছরের ব্যবধানে বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীর হার বেড়েছে প্রায় ৯ গুণ।

২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশি পরিবারগুলো সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটাতে বিদেশে পাঠিয়েছিল ২৬৩ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন ডলার। যা তৎকালীন বিনিময় হার অনুযায়ী ২২ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে সেই অঙ্কটি বিশাল আকারে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৬৬৭ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলার, বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী যা প্রায় ৮২ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে ব্যয় বৃদ্ধির হার ১৫৩ শতাংশ। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একক বছরে বিদেশে শিক্ষার পেছনে সর্বোচ্চ ব্যয়ের রেকর্ড।

অর্থবছর ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত— এই পাঁচ অর্থবছরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে শিক্ষার জন্য বিদেশে ২ হাজার ৪৩৩ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। সংশ্লিষ্ট বছরগুলোর বিনিময় হার অনুযায়ী রূপান্তরিত করলে, এই পাঁচ বছরের মোট ব্যয় ২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কোনো একক নীতিগত ব্যর্থতা বা অর্থনৈতিক ধাক্কা দিয়ে এই প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষার্থীদের মতে, এর কারণগুলো কাঠামোগত ও প্রজন্মগত। যার মূল ভিত্তি হলো অভ্যন্তরীণ চাকরির বাজার— যা শিক্ষার বিপরীতে ক্রমহ্রাসমান প্রতিদান দিচ্ছে এবং সুযোগের ক্রমবর্ধমান অসম বণ্টন তৈরি করছে।


যা আছে পরিসংখ্যানে
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পরিসংখ্যানে কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাংকিং মাধ্যমে শিক্ষা-সংক্রান্ত বিদেশে মুদ্রার বহির্গমনের হিসাব রাখা হয়েছে। বছরভিত্তিক চিত্রটি তুলে ধরা হলো;

অর্থবছর ব্যাংকিং লেনদেনের সংখ্যা ব্যয় (মার্কিন ডলার) ব্যয় (আনুমানিক বাংলাদেশি টাকা)
অর্থবছর ২০২০-২১ ৪৪,৪০৭ ২৬৩.৮৬ মিলিয়ন ২২,৩৭৫ কোটি টাকা
অর্থবছর ২০২১-২২ ৭১,১৯৭ ৪৩০.৬১ মিলিয়ন ৩৭,১৪২ কোটি টাকা
অর্থবছর ২০২২-২৩ ৯৩,২৬৩ ৫২৬.১২ মিলিয়ন ৫৭,৭৪৪ কোটি টাকা
অর্থবছর ২০২৩-২৪ ৮৭,৮৫৯ ৫৪৫.২৭ মিলিয়ন ৬৫,১৬০ কোটি টাকা
অর্থবছর ২০২২-২৫ ১০৯,২৯০ ৬৬৭.৭৭ মিলিয়ন ৮২,০৮৯ কোটি টাকা

টাকায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বছরের বিনিময় হার ব্যবহার করা হয়েছে : অর্থবছর-২৪-২৫ (১২২.৯০ টাকা/ডলার), অর্থবছর-২৩-২৪ (১১৯.৫০ টাকা/ডলার) অর্থবছর-২২-২৩ (১০৯.৭৫ টাকা/ডলার), অর্থবছর-২১-২২ (৮৬.৩০ টাকা/ডলার), অর্থবছর ২০-২১ (৮৪.৮০ টাকা/ডলার)। সোর্স : বাংলাদেশ ব্যাংক।

অর্থবছর ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ এর মধ্যে এই বড়ো ব্যবধানটি শুধু শিক্ষার্থী বাড়ার কারণেই ঘটেনি। বরং শিক্ষার্থীদের পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টিউশন ফি বৃদ্ধি পাওয়া, বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়াও এর অন্যতম কারণ। ফলে চার বছর আগের তুলনায় এখন বাংলাদেশি পরিবারগুলোর ডলারের বিপরীতে অনেক বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। ২০২১ সালে একজন শিক্ষার্থীর জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে বার্ষিক ১১ হাজার ৭৯২ ডলার খরচের বিপরীতে তৎকালীন বিনিময় হার অনুযায়ী পরিবারের প্রয়োজন হতো ১০ লাখ টাকা। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী সেই একই ১০ লাখ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮ হাজার ১৩৭ ডলার। অর্থাৎ বিদেশে প্রকৃত খরচ, টাকার অবমূল্যায়নের তুলনায় অনেক দ্রুত গতিতে বেড়ে চলছে। ফলে পরিবারগুলোকে উভয় মুদ্রার হিসেবেই এখন বেশি অর্থ গুণতে হচ্ছে।

শিক্ষার্থীর পরিমাণ বৃদ্ধি ও উচ্চ ব্যয় 
বিগত দুই দশকে বিদেশে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা তীব্রভাবে বেড়েছে। ইউনেস্কোর (UNESCO) 'গ্লোবাল ফ্লো অফ টারশিয়ারি লেভেল স্টুডেন্টস' এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে ৮ হাজার ৭৩৯ জন শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে গিয়েছিলেন। ২০২৩ সালের মধ্যে সেই সংখ্যা পৌঁছেছে ৭৬ হাজার ৩২৮ জনে। অর্থাৎ তেইশ বছরে বিদেশে শিক্ষার্থী যাওয়ার হার প্রায় নয় গুণ বেড়েছে। ২০১৩ সালের পর থেকে এই গতি আরও লক্ষণীয় : সে বছর মাত্র ৩৭ হাজার ৩৩২ জন শিক্ষার্থী বিদেশে গিয়েছিলেন, যা ২০২৩ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে ৭৬ হাজার ৩২৮ জনে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিলেও, শিক্ষার্থী-প্রতি ব্যয় অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের লেনদেনের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছর ২০২০-২১-এ ৪৪ হাজার ৪০৭টি ব্যাংকিং লেনদেনের প্রতিটিতে গড় ব্যয় ছিল প্রায় ৫ হাজার ৯৪০ ডলার। অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ এসে ১ লাখ ৯ হাজার ২৯০টি লেনদেনের প্রতিটিতে গড় ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজার ১১০ ডলারে। তবে এর মধ্যে আবার হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম এবং শিক্ষার্থী ও পরিবারের ব্যক্তিগতভাবে বহন করা নগদ অর্থ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অর্থাৎ এর প্রকৃত ব্যয় আরও অনেক বেশি।

ঢাকাভিত্তিক একটি শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক কাজী হামিদ এই ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘২০১৫ সালের দিকে ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি সিডনির মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বার্ষিক টিউশন ফি ছিল ২০ হাজার থেকে ৩২ হাজার ৫০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার। ২০২৬ সালের মধ্যে সেই অঙ্কটি প্রোগ্রাম ভেদে প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৫৫ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলারে উন্নীত হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার জন্য জনপ্রিয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক মন্দা এই বোঝাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ‘কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ অর্থনৈতিক চাপ এবং চাকরির সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা এখন আগের চেয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় ও টিউশন ফি নিয়ে বেশি হিমশিম খাচ্ছে— তাই নিজেদের টিকিয়ে রাখতে শিক্ষার্থীদের এখন বাংলাদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি টাকা বিদেশে নিয়ে যেতে হচ্ছে।’

কোথায় যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা?
উচ্চশিক্ষার গন্তব্যের তালিকায় শীর্ষস্থানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৩ সালে ৮ হাজার ৫২৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আমেরিকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছেন— যা ২০২২ সালের ৮, হাজার ৬৬৫ জনের চেয়ে কিছুটা কম। এছাড়া যুক্তরাজ্যে ৬ হাজার ৫৮৬ জন, কানাডায় ৫ হাজার ৮৩৫ জন, মালয়েশিয়ায় ৫ হাজার ৭১৪ জন এবং জার্মানিতে ৫ হাজর ৪৬ জন শিক্ষার্থী গিয়েছেন। ইউনেস্কোর ২০২৩ সালের ডেটাসেটে থাকা মোট ৫২ হাজার ৭৯৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে অর্ধেকের বেশি এই পাঁচটি দেশ বেছে নিয়েছেন।

কাজী হামিদ এক্ষেত্রে এক ধরনের বৈচিত্র্যের কথা উল্লেখ করেছেন। ‘আগে বিদেশে পড়াশোনা করাটা কেবল ধনী পরিবারগুলোর সামর্থ্যের মধ্যে ছিল এবং তারা সাধারণত ইংরেজিভাষী দেশগুলোকেই বেছে নিত। এখন অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারও তাদের সন্তানদের জন্য এটি সম্ভব করে তুলছে একটু ভিন্নভাবে। তারা দক্ষিণ কোরিয়া, ডেনমার্ক, মালয়েশিয়া ও সুইডেনের মতো তুলনামূলক সাশ্রয়ী বিকল্প দেশগুলোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।’

জাপানের প্রতি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহের ক্ষেত্রে বড়ো ধরনের উত্থান দেখা গেছে। কাজী হামিদ উল্লেখ করেন, ‘মজুরি কাঠামোর কারণে জাপানি ভাষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের সংখ্যা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। জাপানে থাকা অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নিজেদের টিউশন ফি দেওয়ার পাশাপাশি দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতেও সক্ষম হচ্ছেন।’

কেন তারা দেশ ছাড়ছে : সংকটে চাকরির বাজার
আর্থিক এই পরিসংখ্যানটি আসলে এক গভীর অসন্তোষের প্রতিফলন। বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষার্থী উভয়েই এই ব্যাপক বহির্গমনের প্রধান কারণ হিসেবে দেশের ভেঙে পড়া চাকরির বাজারকে চিহ্নিত করেছেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইইআর)-এর অধ্যাপক ড. মনিরা জাহান নিয়োগ প্রক্রিয়ার ত্রুটিকে একটি মূল সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘পড়াশোনা শেষ করার পর শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজারে বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়। কখনো কখনো একটি পদের বিপরীতে ৩ হাজার আবেদনকারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং অনেকে বছরের পর বছর চেষ্টা করেও চাকরি পেতে ব্যর্থ হন। বিদেশে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার সুযোগ রয়েছে— তারা একই সাথে শিখতে ও উপার্জন করতে পারে।’

তিনি উচ্চশিক্ষার একটি মৌলিক অমিল বা অসংগতির দিকেও ইঙ্গিত করেন। ‘আমাদের অনেকগুলো সাবজেক্ট বা বিষয় রয়েছে, যেগুলো চাকরির বাজারমুখী নয়। শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। শিক্ষা যদি কর্মসংস্থানের সাথে আরও বেশি সংগতিপূর্ণ হতো এবং উপযুক্ত কোর্স ও প্রোগ্রাম তৈরি করা যেত, তবে হয়তো শিক্ষার্থীরা দেশেই থাকার ব্যাপারে উৎসাহ পেত।’

ড. মনিরা জাহান ভর্তুকি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন ‘বাংলাদেশে অনার্স পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা কার্যত বিনামূল্যে দেওয়া হয় কারণ সরকার এতে ভর্তুকি দেয়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা যদি এরপর দেশ ছেড়ে চলে যায়, তবে দেশ সেই বিনিয়োগের সুফল ধরে রাখতে পারে না। বিশ্বের অন্য অনেক দেশে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য ঋণ নেয় এবং চাকরি পাওয়ার পর তা পরিশোধ করে। এখানে আমরা যা দিচ্ছি তা প্রায় বিনামূল্যে— আর এরপরই মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে।’

ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মোস্তফা আলম এই হতাশার কথাটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমি যদি বাংলাদেশে থাকতাম, তবে আমার জন্য হয়তো সবচেয়ে ভালো পরিণতি হতো একজন বিসিএস ক্যাডার হওয়া। কিন্তু একজন সৎ ক্যাডার কর্মকর্তাও মাসে ২ লাখ টাকার বেশি আয় করতে পারেন না। এই প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ ও অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ, এবং আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার তুলনায় এটা যথেষ্ট নয়।’ তিনি উল্লেখ করেন যে, একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে পার্ট-টাইম বা খণ্ডকালীন কাজ করেও অনেকে দেশে তাদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিতে পারছেন, যা বাংলাদেশে থাকলে সম্ভব হতো বলে তিনি বিশ্বাস করেন না।

নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং জীবনযাত্রার মান
কিছু শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এই হিসাব-নিকাশটি কেবলই অর্থনৈতিক নয়। ২০২০ সাল পরবর্তী সময়ে বিদেশে পড়াশোনা এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্তের পেছনে নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বড়ো নিয়ামক হয়ে উঠেছে।

মেলবোর্নের সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে অধ্যয়নরত সায়রা হক জানান, তার এই সিদ্ধান্তটি কেবল ক্যারিয়ার পরিকল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বলেন, ‘পড়াশোনা ও চাকরির পাশাপাশি আমি দৈনন্দিন জীবনে এক ধরনের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা চেয়েছিলাম, যা দেশে সবসময় পেতাম না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দুর্বল অবস্থা এবং এর সাথে নারী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর সাম্প্রতিক মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির ঘটনাগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিদেশে থাকাটাই এখন তুলনামূলক নিরাপদ এবং আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি বলে মনে হয়।"

তবে সায়রা হক বিদেশে পড়াশোনার জন্য প্রথমদিকে বড় অঙ্কের আর্থিক বোঝার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘অনেক শিক্ষার্থী স্কলারশিপ বা বৃত্তি পায়, কিন্তু শুরুর দিকে দেশ ছাড়ার জন্য তাদের একটি বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়। আমাকেও সেভাবে বাংলাদেশ থেকে টাকা নিয়ে আসতে হয়েছিল। তাছাড়া গত কয়েক বছরে শিক্ষার খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।’

দেশ ছাড়তে চাওয়া এক প্রজন্ম
দেশ ছাড়ার এই প্রবল ইচ্ছা কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, যাদের যাওয়ার সামর্থ্য রয়েছে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের 'নেক্সট জেনারেশন বাংলাদেশ ২০২৪' গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সি ৫৫% বাংলাদেশি বিদেশে স্থানান্তরিত হতে চান। এর আগে ২০১৮ সালের ব্র্যাকের (BRAC) এক জরিপে দেখা গিয়েছিল যে, ২০% তরুণ উন্নত জীবন ও ক্যারিয়ারের জন্য বিদেশে যেতে আগ্রহী। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সন্তানের বিদেশে শিক্ষার খরচ জোগাতে ক্রমেই তাদের আর্থিক সামর্থ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করায় যারা দেশ ছাড়তে চায় এবং যাদের সেই সামর্থ্য আছে— এই দুইয়ের মধ্যকার ব্যবধানটি কমে এসেছে।

প্রজন্মের এই আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তনকে কাজী হামিদ এভাবে তুলে ধরেছেন : ‘একবার এক শিক্ষার্থী আমাকে বলেছিল, 'স্নাতক শেষ করতে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা খরচ করে কেউ মাসে ২০ হাজার টাকার চাকরি করতে চায় না।' এটি হলো ভুল ভেঙে যাওয়ার একটি গাণিতিক হিসাব, যা কোনো ভিসা নীতি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংঙ্কিংয়ের মতোই এই প্রবণতাকে তীব্রভাবে বাড়িয়ে তুলছে।’

শিক্ষাবিদরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীর দেশ ছাড়ার এমন কিছু ফলাফল রয়েছে যা কেবল বিদেশে মুদ্রার পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। করের টাকায় ভর্তুকিপ্রাপ্ত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা নেওয়া একজন শিক্ষার্থী যখন তার দক্ষতাকে কোনো বিদেশি অর্থনীতিতে বিলিয়ে দেয় এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে, তখন বাংলাদেশ শুধু খরচটাই বহন করে, আর অন্য একটি দেশ তার সুফল ভোগ করে। এটি যত দীর্ঘ সময় ধরে বড় পরিসরে চলতে থাকবে, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা ততটাই কঠিন হয়ে পড়বে।

পরিকল্পনার মাধ্যমে যা করা যেতে পারে
ড. মনিরা জাহান বেশ কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন যা এই বহির্গমন কমাতে পারে। তিনি বলেন, ‘সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বাজারমুখী এবং কর্মসংস্থানের সাথে সংযুক্ত করতে হবে। যদি উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায় এবং একটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে বসানো সম্ভব হয়, তবে এই প্রবণতা কিছুটা হলেও কমে আসতে পারে।’

তিনি এর মনস্তাত্ত্বিক দিকটির ওপরও জোর দেন। ‘কোভিডের কারণে শিক্ষার্থীরা প্রায় দুই বছর হারিয়েছে এবং অনেক তরুণ-তরুণী এখন তাদের মনে এক গভীর অনিশ্চয়তা বয়ে বেড়াচ্ছে। স্নাতক শেষ করার পরও অনেকে কয়েক বছর চেষ্টা করেও চাকরি পাচ্ছে না। সরকারকে এই অনিশ্চয়তা দূর করতে হবে। কেবল কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমেই নয়, বরং সুযোগ সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেও। সত্যি বলতে, কেউ হয়তো কঠোর পড়াশোনা করে বারবার ইন্টারভিউ দিচ্ছে, তাও সুযোগ পাচ্ছে না। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, তবে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।’

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- বাংলাদেশ ব্যাংকের ডাটায় এই তথ্য উল্লেখ নেই যে, দেশ ছাড়া এই শিক্ষার্থীরা শেষ পর্যন্ত কোথায় স্থায়ী হচ্ছে। কেউ কেউ ফিরে আসে; তবে অনেকেই আর ফেরে না। এক অর্থে, অর্থবছর ২০২৪-২৫-এর ৮২ হাজার ৮৯ কোটি টাকার এই বহির্গমন হলো বাংলাদেশি পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে এমন এক ভবিষ্যতে বিনিয়োগ, যা তারা নিজের দেশে খুঁজে পাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর ধরে যে নীতিগত সুপারিশগুলো করে আসছেন— যেমন নিয়োগ প্রক্রিয়ার সংস্কার, পাঠ্যক্রমকে বাজারের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং মেধাভিত্তিক মূল্যায়নের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা— বাংলাদেশ সেগুলোর ওপর কার্যকর পদক্ষেপ নেয় কি-না, তার ওপরেই নির্ভর করবে এই শিক্ষার্থীদের কতজন শেষ পর্যন্ত তাদের সেই বিনিয়োগের সুফল দেশে ফিরিয়ে আনবে।

তথ্যের উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক (অর্থবছর ২০২০-২১ থেকে অর্থবছর ২০২৪-২৫ পর্যন্ত শিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশে মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ); ইউনেস্কো গ্লোবাল ফ্লো অব টারশিয়ারি লেভেল স্টুডেন্টস ২০২৩; ব্রিটিশ কাউন্সিল নেক্সট জেনারেশন বাংলাদেশ ২০২৪; ব্র্যাক যুব জরিপ ২০১৮। বিনিময় হার : বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক গড় এবং সমাপনী হিসাব।

সেবার মান না বাড়ালে বাস কোম্পানির রুট পারমিট বাতিল: যোগাযোগ…
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাধারণ সেবাগ্রহীতার বেশে ভূমি অফিসে ডিসি ফরিদা
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, ২ দিন ধরে অ…
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কোচিংয়ে ক্লাসের সময় শুধু ভাবতাম, চারপাশে কত স্মার্ট-ট্যাল…
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অফিসার নিয়োগ দেবে আবুল খায়ের গ্রুপ, আবেদন ৫ অক্টোবর পর্যন্ত
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এশিয়ান গেমস থেকে ছিটকে গেলেন শান্ত
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬