চট্টগ্রাম বন্দরে দ্বিতীয় দিনের মতো কর্মবিরতি পালন করছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা © টিডিসি ফটো
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি অপারেটর ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-কে দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দরে দ্বিতীয় দিনের মতো কর্মবিরতি পালন করছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। রোববার টানা ৮ ঘণ্টার কর্মবিরতির ফলে বন্দরের বিভিন্ন জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও খোলা পণ্য ওঠানামার কাজ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে বন্দরের নিয়মিত কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
কর্মবিরতির কারণে বন্দরে পণ্য ডেলিভারির জন্য কভার্ড ভ্যান, লরি ও ট্রেলার প্রবেশ বন্ধ রয়েছে। এতে করে বন্দর পরিচালন কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। দাবি আদায় না হওয়ায় সোমবারও (২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।
বদলি ১১ কর্মচারী
এনসিটি ইজারার বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে দুই দিনে চট্টগ্রাম বন্দরের ১১ জন কর্মচারীকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরের চিফ পারসোনেল অফিসারের সই করা এক আদেশে আরও সাত কর্মচারীকে বদলি করা হয়। আদেশে বলা হয়, জরুরি দাপ্তরিক ও অপারেশনাল প্রয়োজনে তাদের বদলি করা হয়েছে।
বদলি হওয়া সাতজন হলেন, পরিবহন বিভাগের উচ্চ বহিঃসহকারী মোহাম্মদ শফি উদ্দিন ও রাশিদুল ইসলাম, পরিকল্পনা বিভাগের স্টেনো টাইপিস্ট মো. জহিরুল ইসলাম, বিদ্যুৎ বিভাগের এসএস পেইন্টার হুমায়ুন কবির, প্রশাসন বিভাগের উচ্চমান সহকারী মো. শাকিল রায়হান, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মানিক মিঝি এবং প্রকৌশল বিভাগের মেসন মো. শামসু মিয়া।
তাদের মধ্যে চারজনকে ঢাকার কমলাপুর কনটেইনার ডিপোতে এবং তিনজনকে কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনালে বদলি করা হয়। এর আগে, গত ৩১ জানুয়ারি কর্মবিরতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে আরও চার কর্মচারীকে বদলি করা হয়।
তারা হলেন, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগের অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবির, নৌ বিভাগের ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম খোকন, অর্থ ও হিসাব বিভাগের উচ্চ হিসাব সহকারী মো. আনোয়ারুল আজিম এবং প্রকৌশল বিভাগের এসএস খালাসী মো. ফরিদুর রহমান। তাদের মধ্যে প্রথম দুজন বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক এবং অন্য দুজন সংগঠনটির নেতা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বার্থ অপারেটর জানান, রোববারও বন্দর জেটিতে কাজের জন্য শ্রমিক বুকিং দেওয়া সম্ভব হয়নি। কোনো জাহাজেই পণ্য বা কনটেইনার ওঠানামার কাজ হয়নি। সোমবারও কর্মসূচির ঘোষণা শুনেছেন তারা।
একাধিক পরিবহন মালিক ও চালকরা জানান, বন্দর জেটিতে শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মবিরতির কারণে পণ্য ওঠানামা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। তারা পণ্য ডেলিভারি করতে এসে ভোগান্তিতে পড়ছি, যানবাহনও বন্দরের মধ্যে প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে গ্রাহক ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে বন্দর কার্যক্রম স্বাভাবিক করবে বলে জানান তিনি।
প্রথম দিনের কর্মবিরতির পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারী চারজনকে চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিক বদলির পাশাপাশি এক দিনের কর্মবিরতিতে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে ছয় সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করেছে।
আরও পড়ুন: ঢাকার বাতাস আজ খুবই অস্বাস্থ্যকর, বিশ্বে অবস্থান দ্বিতীয়
এদিকে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) শনিবার রাত ১২টা থেকে পরবর্তী এক মাসের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ও আশপাশের এলাকায় সব ধরনের সভা, সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে। নিষেধাজ্ঞার পর শনিবার রাতে আন্দোলনকারীরা বন্দর এলাকায় মিছিল করলেও রোববার কোনো প্রকাশ্য কর্মসূচি পালন করেননি।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘দুই দিনের কর্মসূচির পরও কর্তৃপক্ষ বা সরকার আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। উল্টো আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের চট্টগ্রাম থেকে পানগাঁও আইসিটিতে বদলি ও স্ট্যান্ড রিলিজ করা হচ্ছে। এতে আন্দোলন আরও তীব্র হবে।’
সংগ্রাম পরিষদের আরেক সমন্বয়ক ও শ্রমিক দল নেতা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমাদের দুই দিনের কর্মসূচি সফল হয়েছে। সকাল থেকে কোনো জেটিতেই কাজ হয়নি, কোনো গাড়িও বন্দরের ভেতরে ঢোকেনি। শ্রমিক-কর্মচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলেই কোনো মিছিল-সমাবেশ করছি না। এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে কর্মসূচি বন্ধ হবে না।’