ইনসেটে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা পুলিশ কনস্টেবল আব্দুর রহমান রানু © টিডিসি ফটো
সংসারের অশান্তি, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন থেকে আত্মহত্যার পথ বেঁছে নেয়া এক গৃহবধুকে মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে ফিরিয়ে আনতে নিজের জীবনাবাজি রাখার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এক পুলিশ কনস্টেবল।
বুধবার পাবনার ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে এ ঘটনা ঘটে। ওই পুলিশ কর্মীর নাম আব্দুর রহমান রানু। ঈশ্বরদীর জিআরপি থানার কনস্টেবল তিনি।
আর আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকারী গৃহবধুর নাম তন্নী। তিনি পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার আলোবাগ মহল্লার ওয়াজেদ আলী বিশ্বাসের মেয়ে। তার বিয়ে হয় টাঙ্গাইল সদর উপজেলার আকুর টাকুর পাড়ার মাহবুব হাসান তন্ময়ের সঙ্গে।
জানা যায়, অল্প বয়সেই বিয়ে হয় তন্নীর (৩০)। সংসারে দুটি সন্তানও রয়েছে। তবে স্বামী তন্ময় মাদকাসক্ত হওয়ায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সইতে হচ্ছে অনেক বছর ধরে। জীবনের প্রতি তার এখন চরম বিরক্তি। স্বজনদের প্রতি তার অনেক অভিমান।
এর আগেও সাংসারিক নানা ঝামেলায় সম্প্রতি তার গর্ভের ৪ মাসের একটি সন্তানও নষ্ট হয়ে যায়। সব কিছু মিলিয়ে তিনি নিজের জীবনের ঘানি আর টানতে চাননি। ট্রেনের নিচে মাথা দিয়ে আত্মহত্যা করতে হাজির হন ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে।
বুধবার (১২ নভেম্বর) বেলা ১১টায় প্লাটফর্মে বসে ছিলেন। এ সময় রহমপুর থেকে মহানন্দা এক্সপ্রেস আসছিল। ওই ট্রেনের নিচেই মাথা দেয়ার পরিকল্পনা ছিলো তন্নীর। প্লাটফর্মে ট্রেন ধীর গতিতে আসছিল। এ সময় তন্নী প্লাটফর্ম থেকে নিচে নেমে যান। মাথা নিচু করে ট্রেনের চাকার দিকে চলেও যান।
মাত্র ৫ সেকেন্ডের মধ্যে ঘটতে পারতো একটি জীবনের নির্মম পরিণতি। কিন্তু এমন সময় সেখানে উপস্থিত হন ঈশ্বরদীর জিআরপি থানার কনস্টেবল আব্দুর রহমান রানু। চোখের নিমিষে তন্নীকে হেঁচকা টানে রেললাইন থেকে বের করে আনেন রানু। আত্মহত্যার মতো মহাপাপ থেকে বেঁচে যান তন্নী। ভাগ্য খারাপ হলে দু’জনকেই বরণ করতে হতো মৃত্যু নামক করুণ পরিণতি।
এ সময় তন্নীকে অসুস্থ অবস্থায় বুধবার ঈশ্বরদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বৃহস্পতিবার (১২ নভেম্বর) পাবনা জেনারেল হাসপাতালে রেফার্ড করেন।
এদিকে, রানুর এমন কৃতিত্বে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সহকর্মীরা বেজায় খুশি। তারা রানুর এ বীরত্বপূর্ণ কাজকে সাধাবাদ জানান।
শুক্রবার (১৩ নভেম্বর) সকালে তন্নীর মা ফরিদা খাতুন জানান, ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় তন্ময়ের সঙ্গে বিয়ে হয় তন্নীর। তাদের ঘরে দুটি সন্তান রয়েছে। কিন্তু শুরু থেকেই সংসারে দাম্পত্য কলহ লেগেই থাকতো তাদের।
ফরিদা খাতুন জানান, তন্ময় মাদকাসক্ত হওয়ায় শুরুতেই শ্বশুরবাড়ি থেকে যৌতুক নিত। দিনে দিনে তার সে চাহিদা বাড়তেই থাকে। এক সময়ে এসে চাহিদা মেটাতে না পারায় তন্নীর উপর নেমে আসে নির্যাতন। তন্নী বেশিরভাগ সময়ই বাবার বাড়ি বা অন্যান্য স্বজনদের বাড়িতে থাকতেন।
এ সময় তন্নী বলেন, আমি সবার বাড়ি গিয়েছি, কোথাও ভালো মুখ পাইনি। সবাই আমাকে অবহেলা করেছেন, সবাই রাগারাগি করেন।
তন্নীর মা ফরিদা খাতুন জানান, তন্নী ঘটনার দিন কাউকে কিছু না বলেই স্টেশনে গিয়েছিল। এত বড় ঘটনার পরও তার জামাই তন্নীর খোঁজ নেননি।
তন্নীকে ফেরানো আব্দুর রহমান রানু বলেন, তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন শুধুই একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য। ঘটনার সময় তার সাত-পাঁচ ভাবার সময় ছিল না। তাকে টান দিয়ে নিয়ে আসতে সফল হই।
ঈশ্বরদী জিআরপি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রঞ্জন কুমার বিশ্বাস জানান, আব্দুর রহমান রানুর ভূমিকাটি ছিলো তার জীবনের জন্যও খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। একদিকে তার উপস্থিত বুদ্ধিতে অসহায় এক নারী আত্মহত্যা থেকে রক্ষা পেয়েছেন অন্যদিকে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে উদ্ধার কাজটি সম্পন্ন না হলে দু’জনই ট্রেনে কাটা পড়তেন।
তবে দু’জনই অক্ষত থাকায় তারা খুশি এবং আব্দুর রহমান রানুর প্রশংসনীয় কাজের জন্য গর্বিত বলে জানান তিনি।