বিবৃতিতে শিক্ষক নেটওয়ার্ক
দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনাগুলোর ছবি © টিডিসি ফটো
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা মব-সহিংসতা ও উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনাগুলোর প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮ জন শিক্ষকের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। শিক্ষকদের মতে, নবনির্বাচিত সরকার মব কালচার বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তারা মব-সন্ত্রাসীদের দমনে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। তবে এই মব-সহিংসতা চিরতরে নির্মূলে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার করতে হবে বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়।
বিবৃতিতে শিক্ষকরা উল্লেখ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ‘মব কালচার শেষ’ করার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। বিশেষ করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখসংগ্রামী শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিকে গ্রেপ্তার এবং ৭-ই মার্চের ভাষণের জেরে তাঁর ওপর হামলার ঘটনাকে গণতন্ত্রের জন্য এক অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন তাঁরা। ইমিকে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বিনা কারণে বন্দি রাখাকে আইনের শাসনের চরম বরখেলাপ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের পর্যবেক্ষণে গত সপ্তাহে তিনটি বড় ধরনের মব-সহিংসতার চিত্র উঠে এসেছে। ১০ এপ্রিল রাজধানীর শাহবাগের একদল অধিকারকর্মী ও শিক্ষকের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। দুঃখজনক বিষয় হলো, শাহবাগ থানার সামনে এই ঘটনা ঘটলেও পুলিশ নীরব ভূমিকা পালন করে এবং আক্রান্তদের মামলা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। একই দিনে রংপুরের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ও দোকানে হামলা চালানো হয়। শিক্ষকদের মতে, এটি ছিল সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সাম্প্রদায়িক উস্কানি।
সবচেয়ে বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটেছে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে। সেখানে ফিলিপনগর ইউনিয়নের এক দরগার প্রধান সাধক ও শিক্ষক শামীম রেজাকে ‘ধর্ম অবমাননার’ ঠুনকো অজুহাতে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একটি রাজনৈতিক নেতার নেতৃত্বে এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে বলে বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়। শিক্ষকদের মতে, এটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার মাজার ও দরগায় হামলার ধারাবাহিকতা মাত্র।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই এই উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোকে ‘প্রেসার গ্রুপ’ হিসেবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। সে সময় ধানমণ্ডি-৩২ নম্বর ভাঙচুর, শিক্ষকদের ওপর হেনস্তা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের বিচার না হওয়ায় আজ মব-সন্ত্রাসীরা আরও সাহসী হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে নির্বাচিত সরকারের আমলেও যদি এই অপশক্তিকে কঠোর হাতে দমন করা না হয়, তবে বাংলাদেশ একটি অসহিষ্ণু রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক স্পষ্ট করে বলেছে, গত নির্বাচনে সাধারণ মানুষ ভোটাধিকারের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে তারা দেশকে আফগানিস্তানের পথে দেখতে চায় না। তাই মুক্তিযুদ্ধের স্পিরিট সমুন্নত রাখতে সরকারকে অবশ্যই মব-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
বিবৃতিতে শিক্ষক নেটওয়ার্ক চারটি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করেছে। এরমধ্যে রয়েছে- শাহবাগ, রংপুর ও কুষ্টিয়ার হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে; শেখ তাসনিম আফরোজ ইমির বিনাশর্তে মুক্তি এবং বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী সাহারা চৌধুরি রেবিলের ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেওয়া; দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জরুরি উন্নয়ন; সমাজে সহিষ্ণুতা বজায় রাখতে উগ্রপন্থি শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
শিক্ষকরা আশা প্রকাশ করেন, সরকার অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে জনমনে স্বস্তি ফেরাতে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় অনতিবিলম্বে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে।