প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলায় চুরির অভিযোগে ১২ বছরের এক শিশুকে উল্টো ঝুলিয়ে নির্যাতনের ঘটনায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো—নির্যাতনের শিকার হওয়া শিশুটি বর্তমানে কারাগারে, অথচ অভিযুক্ত নির্যাতনকারীরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
শনিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় উপজেলার চরবয়েড়া গ্রামের জলিল সিকদারের মুদি দোকানে এ ঘটনা ঘটে। পরদিন সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, এক শিশুকে রশি দিয়ে হাত-পা বেঁধে দোকানের সিলিং থেকে উল্টো ঝুলিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, দোকানের ক্যাশবক্স থেকে টাকা চুরির অভিযোগে শিশুটিকে আটক করে দোকান মালিক ও স্থানীয় কয়েকজন। এরপর তার হাত-পা বেঁধে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই শিশুকেই আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
এ বিষয়ে দুমকি থানার এসআই নুরুজ্জামান বলেন, `চুরির অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্যাতনের বিষয়টি তদন্তাধীন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।' তবে পুলিশের পক্ষ থেকে শিশুটিকে হেফাজতে নেওয়ার আগেই তার উপর ঘটে যাওয়া সহিংস নির্যাতন নিয়ে তৎক্ষণাৎ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
আরও পড়ুন: আংশিক মেঘলা থাকবে ঢাকার আকাশ, হতে পারে বৃষ্টি
অন্যদিকে, দুমকি থানার ওসি জাকির হোসেন বলেন, `স্থানীয়রা শিশুটিকে চুরির সময় হাতেনাতে ধরে আমাদের জানালে পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়। পরে লিখিত অভিযোগ পেলে তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।' নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, `বিষয়টি আমাদের জানা নেই। কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা তদন্ত করবো।'
পুলিশের এই ভিন্নমতপূর্ণ বক্তব্যকে `দায় এড়ানোর কৌশল' হিসেবে উল্লেখ করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
মানবাধিকার কর্মী বন্যা চৌধুরী বলেন, `একজন শিশুকে উল্টো ঝুলিয়ে পেটানো কোনো সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না। ভিডিও থাকা সত্ত্বেও পুলিশ বলছে তারা কিছু জানে না, এটা দায়িত্ব এড়ানোর চরম উদাহরণ। ওই শিশুকে হেফাজতে নেওয়া এবং পরে আদালতে পাঠানো হলেও, নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। এটা শিশু অধিকারের চরম লঙ্ঘন।'
তিনি আরও বলেন, `শিশুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটির তদন্ত হবে আইন অনুযায়ী। কিন্তু সেই শিশুকে গায়ে হাত তোলা, উল্টো ঝুলিয়ে নির্যাতন করা একধরনের বর্বরতা। এই ঘটনায় শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তিরাই নয়, দায়িত্বহীন আচরণের জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধেও শিশু সুরক্ষা আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।'
স্থানীয় শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকরা জানিয়েছেন, `আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। চুরির অভিযোগ থাকলেও একটি শিশুকে এভাবে নির্যাতন করা অনৈতিক এবং অবৈধ। প্রশাসনের উচিত ছিল, আগে শিশুটির চিকিৎসা ও সুরক্ষার ব্যবস্থা করা, অপরাধের প্রমাণ থাকলে পরে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।'
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, শিশুটি ভয় ও যন্ত্রণায় চিৎকার করছে, কিন্তু উপস্থিত কেউ তাকে বাঁচানোর উদ্যোগ নেয়নি। বরং ভিডিও ধারণকারীসহ আশেপাশে থাকা ব্যক্তিরা ঘটনাটি নীরব দর্শকের মতো দেখেছেন। এমন নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে এখনো কেউ স্বপ্রণোদিতভাবে থানায় অভিযোগ করেনি।