আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস
রোহিঙ্গা ক্যাম্প © সংগৃহীত
আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে আবারও আলোচনায় এসেছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রিত রোহিঙ্গা সংকট, যেখানে ২০১৭ সালের পর থেকে শুরু হওয়া বৃহৎ এই মানবিক বিপর্যয়ের সমাধান এখনো অধরা। টানা ৯ বছর পার হলেও একজন রোহিঙ্গাও স্বেচ্ছায় বা পরিকল্পিতভাবে নিজ দেশে ফেরত যেতে পারেনি।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সশস্ত্র বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তখন থেকে উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি এলাকা এবং ক্যাম্পগুলোতে অবস্থান করছে তারা। মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দিন কাটালেও দীর্ঘ এই সময়ে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কার্যত অগ্রগতি পায়নি।
স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের উপস্থিতিতে টেকনাফের সামাজিক কাঠামো, অর্থনীতি ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন দাবি করেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্যের কারণে প্রায় ৩০০ একর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৮ হাজার একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যে দেখা যায়, ক্যাম্পভিত্তিক অপরাধ পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। মাদক পাচার, মানবপাচার এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকলেও হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমছে। ২০২৩ সালে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৬৬টি খুনের ঘটনা ঘটলেও ২০২৪ সালে তা কমে ৪৯টি এবং ২০২৫ সালে ৩৫টিতে নেমে আসে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই ৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মোহাম্মদ সিরাজ আমীন বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের অনেকেই নিরীহ। তবে অধিকাংশ অপরাধ ঘটে তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে। ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।’
দীর্ঘ সময় ধরে প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত থাকায় ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের মধ্যেও হতাশা বাড়ছে। একসময় শিগগিরই স্বদেশে ফেরার আশা থাকলেও এখন অনেকেই আর নিশ্চিতভাবে তা বলছেন না। উখিয়া-টেকনাফের পাহাড়ে আশ্রিত অনেক রোহিঙ্গার মধ্যেই দেশে ফেরা নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: ইউএস নিউজ বেস্ট গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংয়ে দেশসেরা রাবি
রোহিঙ্গা সংকটের সূচনা হয় ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট, যখন মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে প্রাণ বাঁচাতে কয়েক লাখ মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে বিশাল শরণার্থী শিবির গড়ে ওঠে।
স্থানীয় ও সীমান্ত পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে এখন শুধু নাফ নদ নয়, উখিয়া ও পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন পথ দিয়েও রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। গবেষকদের মতে, মিয়ানমার থেকে আসা অনেক রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে স্থায়ী হওয়ার প্রবণতাও তৈরি করেছে, যা পরিবেশ ধ্বংস, পাহাড় কাটা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে প্রত্যাবাসন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পর্যায়ে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও কার্যকর ফল এখনো মেলেনি। গত বছরের শেষদিকে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থা, শিক্ষাবিদ এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তবে ওই সম্মেলনের পরও প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি।
উখিয়া-টেকনাফ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী কয়েক মাস আগে বলেছিলেন, ২০২৭ সালের মধ্যে রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরা নিশ্চিত হবে। তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ও গবেষক ড. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আগমন নতুন নয়, স্বাধীনতার আগে ও পরে এ দেশে একাধিকবার রোহিঙ্গারা শরণার্থী হয়ে এসেছে। তখন অনেকে বিদেশেও চলে গেছে। কিন্তু ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের বড় ঢল নামে। তারা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নিয়েছে। একসময় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার পথ হিসেবে নাফ নদ হয়ে টেকনাফকে বেছে নিলেও এখন উখিয়া ও পার্বত্য এলাকা দিয়ে একাধিক পথ সৃষ্টি হয়েছে। মায়ানমার থেকে আসা অনেক রোহিঙ্গা এ দেশে স্থায়ী হয়েছে। তারা আমাদের পরিবেশ নষ্ট করছে, পাহাড় কাটছে, অপরাধমূলক কাজে জড়াচ্ছে।’
উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা যুবনেতা মো. মুসা বলেন, ‘মায়ানমার বাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালিয়ে ক্ষান্ত হয়নি, তারা রোহিঙ্গাদের নির্যাতন করে ভিটেমাটি কেড়ে নিয়েছে। সেখানে আমরা বড় ধরনের জুলুমের শিকার হয়েছি। নির্যাতনের মুখে এ দেশে আশ্রয় নিয়েছি। আমরা বারবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দাবি তুলেছিলাম, দ্রুত রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি।’
আরেক রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা মো. ইউসুফ বলেন, ‘বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে আমরা দাবি রেখেছিলাম, রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে ফিরে যাওয়ার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য। কয়েক দফা উদ্যোগ নেওয়া হলেও এ পর্যন্ত কোনো উদ্যোগই সফলতার আলো দেখেনি। এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের মায়ানমার ফেরা অনেক কঠিন হয়ে গেছে।’
বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক রোহিঙ্গা নারী সখিনা খাতুন জীবদ্দশায় একবার রাখাইনে ফিরে যেতে চান। তিনি বলেন, ‘বড় মেয়েটার বিয়ে দিয়েছিলাম মায়ানমারে থাকতে। কত ধুমধাম আয়োজন করেছিলাম। আশা ছিল ছোট মেয়েকেও আরো বড় আয়োজনে বিয়ে দেব। অথচ শরণার্থী হয়ে এখানে এসে আমার যে একটা মেয়ে আছে সেটিও প্রকাশ করতে পারছি না।’
সব মিলিয়ে বিশ্ব শরণার্থী দিবসে রোহিঙ্গা সংকট আবারও নতুন করে মানবিক, রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও পরিবেশগত বাস্তবতার প্রশ্ন সামনে এনেছে, যেখানে প্রত্যাবাসনের দীর্ঘ প্রতীক্ষা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে গেছে।