অভিযুক্ত জমির উদ্দীন সরকার জনি © টিডিসি ফটো
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে যৌতুক না পেয়ে স্ত্রীকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যার চেষ্টা এবং সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে বটি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মারাত্মক জখম করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) এক নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় দুই সন্তানের জননী শ্রাবণী আক্তার (২৩) গুরুতর আহত হয়েছেন । মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক সেলাই নিয়ে তিনি এখনো পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।
অভিযুক্ত স্বামী জমির উদ্দীন সরকার জনি (৩২) ঘটনার পর পালিয়ে রয়েছেন। তার শ্বশুর ছামছুল ইসলাম বাদী হয়ে পলাশবাড়ী থানায় মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জাসাসের পলাশবাড়ী উপজেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক জনিকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। রবিবার বিকেলে গাইবান্ধা জেলা জাসাসের আহ্বায়ক বজলুর করিম রপু ও সদস্যসচিব খান মো. কাওসার ওয়াহিদ সুদান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে গত ৯ আগস্ট রাতে পলাশবাড়ী পৌরসভার গৃধারীপুর গ্রামে। প্রতিদিনের মতো রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন শ্রাবণী ও জনি দম্পতি। গভীর রাতে কথা কাটাকাটি শুরু হয়, একপর্যায়ে প্রথমে বালিশ চাপা দিয়ে স্ত্রীকে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করেন জনি। তা ব্যর্থ হলে ঘরে থাকা ধারালো বটি দিয়ে মাথা, হাত ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মারাত্মক জখম করেন তিনি।
শ্রাবণীর বাবা ছামছুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় চার বছর আগে পলাশবাড়ী পৌরসভার আমবাড়ী গ্রামের আমছার আলীর ছেলে জনি মিয়ার সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করে জনি। সংসার টিকিয়ে রাখার আশায় বিভিন্ন সময়ে ছামছুল ইসলাম জামাইকে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার দিয়েছেন। কিন্তু কিছুদিন পরপরই পুনরায় যৌতুক দাবি করতেন জনি। সর্বশেষ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই ঘটে এই নৃশংস হত্যাচেষ্টা।’
পরদিন সকাল সাড়ে ৬টায় শ্রাবণীকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে অটোরিকশায় পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন। এরপর জনি সড়ক দুর্ঘটনার কথা বলে শ্রাবণীকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান।
সেখানে তিন দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর কৌশলে আহত শ্রাবণীকে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেন জনি এবং পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। স্থানীয়দের ধারণা, ঘটনা প্রকাশ পাবে বলে প্রথমে তাকে পলাশবাড়ী হাসপাতালে না নিয়ে সরাসরি রংপুরে নেওয়া হয়েছিল।
বর্তমানে শ্রাবণী পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আমিন অলিভ জানান, গৃহবধূ শ্রাবণীর অবস্থা খুব খারাপ। তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক সেলাই দেওয়া হয়েছে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। তিনি পরিবারকে উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্রে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
আরও দেখুন: নিখোঁজের একদিন পর কলেজ শিক্ষকের মরদেহ উদ্ধার
শ্রাবণীর বাবা ছামছুল ইসলাম তার মেয়ে ও নাতি-নাতনির সুচিকিৎসার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন এবং পাষণ্ড জামাই জনিকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
জানা গেছে, অভিযুক্ত জনি মিয়া পলাশবাড়ী উপজেলা জাসাসের যুগ্ম আহ্বায়ক পদে ছিলেন। ঘটনার পর দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে জেলা নেতৃবৃন্দ এ ধরনের নৃশংস ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। স্থানীয়রা জনি মিয়ার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
পলাশবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সরোয়ারে আলম খান বলেন, ‘যৌতুকের জন্য নির্যাতন ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে পলাশবাড়ী থানায় জনিকে একমাত্র আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন শ্রাবণীর বাবা। তদন্ত শুরু হয়েছে এবং আসামি গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
নারী নির্যাতন ও যৌতুক প্রথা বাংলাদেশে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে রয়ে গেছে। সম্প্রতি বিভিন্ন জেলায় এমন নৃশংস ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের সচেতন অংশকেও এ ব্যাধি দূর করতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।