জেলের জীবন © টিডিসি ফটো
সাগরে মাছের অভাব, জ্বালানি তেলের চড়া দাম আর জলদস্যু আতঙ্কের মধ্যেই শুরু হয়েছে সরকারি নিষেধাজ্ঞা। মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে কার্যকর হওয়া এই ৫৮ দিনের মৎস্য আহরণ বন্ধের ঘোষণায় কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলের লক্ষাধিক জেলে ও তাদের পরিবার এখন দিশেহারা। দীর্ঘ সময়ের এই কর্মহীনতায় উপকূলজুড়ে নেমে এসেছে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তা।
নিষেধাজ্ঞা শুরুর পর থেকেই কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর তীরে সারি সারি ফিশিং ট্রলার অলসভাবে নোঙর করে আছে। অনেক জেলে পরবর্তী মৌসুমের আশায় বুক বেঁধে বাড়ি ফিরে গেছেন, আবার অনেকে জীবিকার চিন্তায় বিষণ্ন মনে ঘাটে বসেই সময় পার করছেন।
শহরের চেয়ারম্যান ঘাটের প্রবীণ জেলে আবদুর রহমান তার দীর্ঘ ৩৫ বছরের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “এত বছর ধরে সাগরে মাছ ধরছি, কিন্তু আজও একটি জেলে কার্ড কপালে জোটেনি। গত পাঁচ মাস ধরে ধার-দেনা করে কোনোমতে সংসার চালিয়েছি। এখন নিষেধাজ্ঞা শুরু হলো, পরিবার নিয়ে কী খেয়ে বাঁচব তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না।” কার্ড না থাকায় তার মতো অনেক প্রকৃত জেলেই সরকারি চাল সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জেলেদের পাশাপাশি ট্রলার মালিকরাও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। তাদের দাবি, একটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে জ্বালানি ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে প্রায় ৪ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু মাছের আকালের কারণে অনেক সময় মাত্র ৪০ হাজার টাকার মাছ নিয়ে ফিরতে হচ্ছে। এতে করে ঋণের বোঝা আরও ভারী হচ্ছে তাদের।
জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক নাছির উদ্দিন বাচ্চু বলেন, সাগরে অবৈধ ট্রলিং জালের বেপরোয়া ব্যবহার মাছের প্রজনন নষ্ট করছে, যার মাশুল দিতে হচ্ছে বৈধ জেলেদের। অন্যদিকে, সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন নিষেধাজ্ঞার সময়সূচি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, এখন মাছ ধরার ভরা মৌসুম। এমন সময়ে সাগরে যাওয়া বন্ধ করে দেওয়ায় মৎস্য খাত অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানিয়েছেন, জেলায় নিবন্ধিত ৬৪ হাজার ৪২৮ জন জেলে পরিবারকে প্রতি মাসে ৪০ কেজি করে চাল সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কার্ডবিহীন জেলেদের বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তবে নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবর্তনের বিষয়টি পুরোপুরি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
মৎস্যজীবীদের দাবি, কেবল চাল সহায়তা দিয়ে এই বিশাল সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। ঋণগ্রস্ত ও কর্মহীন এই লক্ষাধিক মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় রুখতে দ্রুত কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ প্রয়োজন।