শ্যামবাজারে রাতের বেলা সারিবদ্ধ ট্রাক © সংগৃহীত
বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে শতাব্দীপ্রাচীন যে বাজারটির নাম আজও একইভাবে উচ্চারিত হয় রাজধানীর মানুষের মুখে মুখে, সেটি হলো শ্যামবাজার। পুরান ঢাকার অন্যতম ব্যস্ততম ও প্রাচীন এই পাইকারি বাজারটি আজও ধরে রেখেছে তার ঐতিহ্য, গতি ও গৌরব। দিনের আলো ফোটার আগেই জমে ওঠে এ বাজারের রকমারি বেচাকেনা—আদা, রসুন, পেঁয়াজ, মরিচ থেকে শুরু করে সব ধরনের কাঁচাবাজার, শাকসবজি, ফলমূল ও গুঁড়া মসলা।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৭৪০ সালে ঢাকার নায়েবে নাজিম নওয়াজিশ মোহাম্মদ খানের অনুমতিক্রমে ফরাসি বণিকরা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে একটি ছোট 'গঞ্জ' বা 'বাজার' প্রতিষ্ঠা করেন। কালের পরিক্রমায় সেই ছোট্ট গঞ্জটি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে আজকের বৃহৎ শ্যামবাজারে। আজও এটি রাজধানীর ঢাকার অন্যতম পুরাতন ও ব্যস্ত বাজার হিসেবে টিকে আছে। বর্তমানে বাজারটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে পরিচালিত হয়। শত শত মানুষের জীবিকা ও গল্প জড়িয়ে আছে এই বাজারকে ঘিরে—যেখানে ক্লান্তি নেই, আছে কেবল গতিময়তা ও জীবনের স্পন্দন।
রাতেও প্রাণচঞ্চল থাকে শ্যামবাজারে
শ্যামবাজারে রাতের আঁধারেও থেমে নেই কর্মচাঞ্চল্য মানুষ। ট্র্যাকে ও নদীপথে সদরঘাটের লঞ্চ টার্মিনালের মাধ্যমে দেশবিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রাতেও আসে নানান রকমের তাজা সবজি এবং বিভিন্ন ধরনের মশলা। আড়তদার ও হাজারো কর্মীদের হাঁকডাকে প্রাণচঞ্চল এই শ্যামবাজারে রাতভর চলতে থাকে মানুষের আনাগোনা ও কর্মযজ্ঞ।
ফরাশগঞ্জের মোহনী মোহন দাস লেনের পথ ধরে একটু এগিয়ে গেলে, মাওলা বক্স হাসপাতাল পার হতেই চোখে পড়ে বিবেক দাস রোডে সারিসারি ট্রাক। প্রতিটি ট্র্যাকে বোঝাই করা পেঁয়াজ, রসুন , আদা। একদল শ্রমিক নিরলসভাবে সেই মালামাল নামিয়ে গোডাউনে রাখছে। ফজরের আজানের আগ পর্যন্ত এই কর্মযজ্ঞ চলতেই থাকে।
বিবেক দাস রোড ধরে বামদিকে একটু সামান্য এগিয়ে গেলেই কাঁচা বাজারের আড়ত। কাছাকাছি যেতেই নানান জাতের লেবুর মনভোলানো ঘ্রাণ নাকে আসে—এলাচি, কাগজি সহ নানা রকমের লেবু ঝুড়িভর্তি সাজানো। সঙ্গে লাউ,পেঁপে ও অন্যান্য শাকসবজিও পাইকারি বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ভোরবেলা বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকারেরা এসে এসব লেবু কিনে নিয়ে যায়। এছাড়াও, রাস্তার দুই পাশে টাল দিয়ে সাজানো বিভিন্ন রকমের সবজিও চোখে পড়ে।
সন্ধ্যা নামতেই রাস্তার পাশে ছোট একটি টিনের চালার দোকানে জমে ওঠে খিচুড়ি আর তেহারি আসর। দোকানের নাম— ফিরোজ কাকার দোকান। এখানে ৩০ টাকায় পাওয়া যায় ভর্তা খিচুড়ি, ৫০ টাকায় ডিম খিচুড়ি, ৬০ টাকায় মুরগির তেহারি আর ১০০ টাকায় পরিবেশন করা হচ্ছে বিশেষ পাকিস্তানি মুরগির খিচুড়ি, সঙ্গে থাকছে সালাদ ও চাটনি। রাতভর শামবাজারে আনাগোনা চলতে থাকে, আর এই জমজমাট দোকানটি খোলা থাকে ফজরের নামাজের আগপর্যন্ত।
সারাদিনের হুড়োহুড়ি, ছোটাছুটি, দৌড়াদৌড়ি আর হাজার রকমের শব্দের ভিড় শেষে রাতের বুড়িগঙ্গায় নেমে আসে এক ভিন্ন রকম আবহ। রাতভর বুড়িগঙ্গার আকাশজুড়ে চলে চাঁদ-তারার ছুটাছুটির খেলা। সেখানে নেই তীব্র শব্দ , চারিধারে হিমেল হাওয়া বইছে। লঞ্চ টার্মিনালের প্লাটফর্মগুলোও প্রায় খালি, তবে কিছু কিছু লঞ্চে আলোর দেখা পাওয়া যায়, বাকিগুলো যেন গভীর ঘুমে। তবে থেমে নেই ছোট নৌকাগুলো। ছোট ছোট আলো জ্বালিয়ে দু-একজন যাত্রী নিয়ে ছুটে চলছে দিনের মতোই।
মো. হাসান নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, প্রতিদিন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আড়ৎতে আসি। সারাদিনই চলে বেচাকেনা। সন্ধ্যার পরে সব গুছিয়ে বাসায় ফিরে যাই, তারপর ঘুম। এভাবেই কেটে যাচ্ছে প্রতিদিন। ঈদে কয়েকদিন ছুটি পেয়েছিলাম একটু ঘুরে আসছি। এখন আর ছুটি নেই, সপ্তাহে প্রতিদিন এই দোকান-বাজার খোলা থাকে।
সোহেল নামের এক ব্যক্তি জানান, রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী শ্যামবাজার বিস্তৃত এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। কিন্তু বর্তমানে বাজারের কিছু অংশ দখলদারদের কবলে পড়েছে। রাস্তা দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য দোকানপাট, ফলে বাজারে দেখা দিয়েছে চরম যানজট।
তিনি আরও জানান, সিটি কর্পোরেশনের অবহেলার ফলে নদীর পাড় মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা নদীর পাড়ে সমানে ময়লা-আবর্জনা ফেলছে , যার ফলে এলাকাজুড়ে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ এবং পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।
হাজারো ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে আজও ফরাশগঞ্জের বুকে স্বগৌরবে টিকে আছে প্রাচীন শ্যামবাজার। তবে এই ঐতিহ্য বহাল রাখতে প্রয়োজন যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, সিটি কর্পোরেশনের নজরদারি এবং সকলের সচেতনতা যাতে শ্যামবাজার ভবিষ্যতেও গৌরব নিয়ে টিকে থাকতে পারে।