শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় © সংগৃহীত
পুরোনো বাণিজ্য মেলার জমিতে নতুন সচিবালয় গড়ে তোলার সরকারি উদ্যোগে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) প্রাঙ্গণে। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য প্রতীক্ষিত এই জমি হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় রাজপথে নামার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার।
গবেষণার সুযোগ রক্ষা ও ক্যাম্পাস সংলগ্ন জমি পুনর্বহালের দাবিতে আজ বুধবার (১৪ অক্টোবর) তারিখে প্রকাশিত এক অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আগামীকাল বৃহস্পতিবার কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে গবেষণা মাঠ পুনরুদ্ধার স্টিয়ারিং কমিটি। একই সঙ্গে ঢাকার তীব্র যানজট এড়ানো এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার স্বার্থে এই পরিকল্পনা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবিদরা।
শেকৃবির গবেষণা মাঠ পুনরুদ্ধার স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এম. সালাহউদ্দিন মাহমুদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে জানানো হয়, আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০ টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্রেস কনফারেন্স ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হবে। এরপর প্রেস কনফারেন্স শেষে প্রধানন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপি প্রদান করা হবে। এই কর্মসূচি সফল করতে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯ টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকবৃন্দকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে উপস্থিত থাকার জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানানো হয়েছে।
এছাড়াও প্রতিবাদ সভা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার লক্ষ্যে আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ধরনের ক্লাস ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। তবে পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষাগুলো এই কর্মসূচির বাইরে থাকবে বলে নোটিশে স্পষ্ট করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মাত্র ৮৬.৯২ একরের ক্ষুদ্র ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন ধরেই চরম জমি ও গবেষণার জায়গা সংকট চলছে। কৃষি শিক্ষার মান বৃদ্ধি এবং ব্যবহারিক গবেষণার পরিধি বাড়াতে পাশেই অবস্থিত পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠটি চেয়ে আসছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে কৃষির গবেষণায় জমিটি না দিয়ে সেখানে সচিবালয় সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ প্রাঙ্গণজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট বক্তব্য—গবেষণার অধিকার কেড়ে নিয়ে এখানে অন্য কোনো স্থাপনা গড়ে তুলতে দেওয়া হবে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যান্ট প্যাথলজি বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক জানান, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল প্রাণই হলো মাঠপর্যায়ের প্রায়োগিক গবেষণা। নতুন জাত উদ্ভাবন কিংবা ফসলের রোগবালাই নিয়ে পর্যালোচনার জন্য প্রয়োজনীয় জমি তাদের নেই। মেলার মাঠটি পেলে এই সংকট দূর হতো। কিন্তু সেখানে প্রশাসনিক ভবন নির্মিত হলে অ্যাকাডেমিক পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি সরকারকে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার অনুরোধ জানান।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. তানভীর আহমেদ বলেন, এটি সাধারণ কোনো জমির আন্দোলন নয়, এটি কৃষি শিক্ষার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। ল্যাবরেটরির পাশাপাশি ব্যবহারিক কাজের জন্য উন্মুক্ত জমি অত্যাবশ্যক। তাদের তোয়াক্কা না করে নেওয়া এমন সিদ্ধান্ত তারা কোনোভাবেই মেনে নেবেন না।
একই কথা বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী সৈয়দ নাজমুল আলম। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কাজের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, কৃষি ও কৃষি গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এখানে সচিবালয় নির্মিত হলে পুরো এলাকা স্থবির হয়ে পড়বে এবং পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ নষ্ট হবে। রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমেই দাবি আদায় করা হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শেরেবাংলা নগরের মতো ব্যস্ত এলাকায় সচিবালয়ের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললে পুরো ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা ধসে পড়তে পারে। উপরন্তু, স্থপতি লুই আই কানের মূল নকশার নান্দনিকতা ও সবুজ পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে এই পরিকল্পনা পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।
এর আগে, ২০১৫ সালে যখন প্রথম শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তখন শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ জানান। পরবর্তীতে এই দাবি নিয়ে ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মিলে ‘টেক ব্যাক শেকৃবি ল্যান্ড’ (Take Back SAU Land) শীর্ষক একটি বড় কর্মসূচি পালন করেন এবং মাঠটি ফেরত চান।