কলেজে ছিলেন পেছনের সারির স্টুডেন্ট, কোচিংয়েও পেতেন কম নম্বর, সেই মুনাদই ভর্তি পরীক্ষায় ফার্স্ট

১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২০ PM , আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২১ PM
মেহেরাব হোসাইন মুনাদ

মেহেরাব হোসাইন মুনাদ © টিডিসি সম্পাদিত

কলেজে ছিলেন পেছনের সারির শিক্ষার্থী। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় কোচিংয়ের মডেল টেস্টেও নম্বর পেতেন কম। একপর্যায়ে নিজের ওপর আত্মবিশ্বাসও হারিয়ে ফেলেছিলেন। তবে হতাশ হয়ে হাল ছাড়েননি মেহেরাব হোসাইন মুনাদ। ধারাবাহিক চেষ্টা, ভুল থেকে শেখা আর নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার মাধ্যমে সেই মুনাদই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের (সি ইউনিট) মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। শুধু সি ইউনিটেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বি ইউনিটে ৬১৭তম ও ডি ইউনিটে ১৪১তম স্থান অর্জন করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায়ও ৬৭৪তম হয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।

ভর্তি পরীক্ষায় নিজের সাফল্য, প্রস্তুতি ও নতুন ভর্তিচ্ছুদের জন্য কিছু টিপস নিয়ে তিনি মুখোমুখি হয়েছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের। তার কথাগুলো শুনেছেন— চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক আব্দুল্লাহ আল নাঈম।

আপনার সাফল্যের খবর পাওয়ার মুহূর্তটি কেমন ছিল? প্রথম কাকে জানিয়েছিলেন?
সেদিন সকাল থেকেই অপেক্ষা করছিলাম, কখন রেজাল্ট প্রকাশ করা হবে। নিজের পরীক্ষা ভালো হয়েছিল বলে একটা আত্মবিশ্বাস ছিল, তবে ফলাফল প্রকাশের আগপর্যন্ত মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা তো কাজ করছিলই। সম্ভবত বেলা ১১টার দিকে রেজাল্ট দেখতে পাই। 

যখন দেখলাম আমার মেধাক্রম ১ম, তখন প্রথমে নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সঙ্গে সঙ্গেই মাকে জানাই। এরপর বাসার অন্যদের বলি। সবাই খুব খুশি হয়েছিল, আমিও ভীষণ আনন্দিত ছিলাম। কলেজে অনেকটা পেছনের সারির স্টুডেন্ট ছিলাম। তাই আমার রেজাল্ট জেনে সবাই একটু চমকে গিয়েছিল। অনেকে হয়তো মনে মনে বলেছে ‘এই ছেলে কীভাবে ভালো রেজাল্ট করলো?’

তবে আমার কাছে ওই মুহূর্তটা শুধু প্রথম হওয়ার আনন্দ ছিল না। ফলাফলটা দেখার পর মনে হচ্ছিল, প্রস্তুতির সময়ের সেই দুশ্চিন্তা, খারাপ মডেল টেস্ট দিয়ে মন খারাপ করা, নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলাসবকিছুর একটা অর্থ খুঁজে পেলাম। আমি মনে করি, সাফল্যের মুহূর্তে মানুষ শুধু নিজের অর্জনটাই দেখে না; সেই অর্জনের পেছনে থাকা কঠিন সময়গুলোও নতুন করে উপলব্ধি করে। আমার কাছেও মুহূর্তটা তেমনই ছিল।

ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি কত দিন আগে থেকে শুরু করেছিলেন এবং কীভাবে পরিকল্পনা করেছিলেন?
সত্যি বলতে, এইচএসসির আগে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা সম্পর্কে আমার খুব বেশি ধারণা ছিল না। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি কীভাবে নিতে হয়, প্রতিযোগিতাটা কতটা কঠিন এসব বিস্তারিত জানতে পারি এইচএসসির পর।

তখন সময় খুব বেশি ছিল না। তাই শুরুতেই বুঝেছিলাম, শুধু অনেক পড়লেই হবে না; অল্প সময়ের মধ্যে কীভাবে সবচেয়ে কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া যায়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

আমি নিজের জন্য একটা রুটিন তৈরি করি এবং পড়াশোনাকে একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসি। তবে একটা বিষয় আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল পরিকল্পনা যেন শুধু পরিকল্পনাই হয়ে না থাকে, সেটাকে প্রতিদিনের কাজে বাস্তবায়ন করতে হবে।

আমার মনে হয়, ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে অনেকেই শুরুতে বিশাল একটা পরিকল্পনা করে ফেলে। কিন্তু কয়েক দিন পর সেটা অনুসরণ করতে না পেরে হতাশ হয়ে যায়। আমার মতে, এমন রুটিন করা উচিত, যেটা নিজের বাস্তব অবস্থা অনুযায়ী নিয়মিত অনুসরণ করা সম্ভব।

সময় কম থাকলে হতাশ না হয়ে বরং সময়টাকে আরও সচেতনভাবে ব্যবহার করতে হবে। কারণ, কত দিন আগে প্রস্তুতি শুরু করেছেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো যতটুকু সময় পেয়েছেন, সেটাকে কতটা কাজে লাগাতে পেরেছেন।

প্রতিদিন গড়ে কত ঘণ্টা পড়াশোনা করতেন? আপনার পড়ার রুটিন কেমন ছিল?
আমার পড়াশোনার নির্দিষ্ট কোনো সময় ছিল না। আমি প্রতিদিন সকালে উঠে ঠিক করতাম, আজ কোন কোন টপিক শেষ করব। এরপর সেগুলো শেষ করার জন্য পড়াশোনা করতাম।

আমার কাছে প্রতিদিন কত ঘণ্টা পড়লাম, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল দিনের কাজ কতটুকু শেষ করতে পারলাম। আমি মনে করতাম, শুধু বইয়ের সামনে অনেকক্ষণ বসে থাকলেই প্রস্তুতি ভালো হবে না, সেই সময়টাতে আসলে কতটুকু শিখতে পারছি, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটা বিষয় অনুসরণ করতাম সব বিষয়ে সমান সময় দিতাম না। যে বিষয়ে আমার দুর্বলতা বেশি ছিল, সেটার পেছনে তুলনামূলক বেশি সময় ব্যয় করতাম।

এখানে একটা বিষয় বলতে চাই, আমরা অনেক সময় যে বিষয়টা ভালো পারি, সেটাই বারবার পড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কারণ, সেখানে নিজের ভালো করার অনুভূতিটা পাওয়া যায়। কিন্তু যে বিষয়টা কঠিন লাগে, সেটাকে এড়িয়ে যাই। আমার মনে হয়, প্রস্তুতির সময় এই অভ্যাসটা বদলানো খুব জরুরি।

যে বিষয়টা পড়তে সবচেয়ে বেশি অনীহা কাজ করে, অনেক সময় নিজের উন্নতির জন্য ঠিক সেই বিষয়টাকেই সবচেয়ে বেশি সময় দেওয়া প্রয়োজন।

ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় কোন বিষয়টি সবচেয়ে কঠিন মনে হয়েছে? সেটি কীভাবে মোকাবিলা করেছেন?
আমার কাছে সবচেয়ে কঠিন মনে হয়েছে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। কারণ, প্রতিদিন একই রকম আগ্রহ নিয়ে পড়াশোনা করা সম্ভব হয় না। কখনো ভালো লাগে, কখনো ক্লান্ত লাগে, কখনো আবার অনেক পড়ার পরও মনে হয় তেমন কিছুই হচ্ছে না। এসব পরিস্থিতিতে নিজেকে নিয়মিত পড়াশোনার মধ্যে ধরে রাখাটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

আমি একটা নির্দিষ্ট রুটিন অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি। রুটিনের বাইরে খুব বেশি কিছু না করে পড়াশোনাকে প্রাধান্য দিয়েছি। এতে প্রতিদিন কী করতে হবে, সেটা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতো না। আমার কাছে ধারাবাহিকতার একটা বিশেষ দিক হলো প্রতিদিন সমান পরিমাণ পড়তেই হবে, এমন নয়। কিন্তু নিজের প্রস্তুতির সঙ্গে যোগাযোগটা যেন একেবারে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়।

কোনো দিন হয়তো অনেক পড়া সম্ভব হবে, কোনো দিন তুলনামূলক কম। কিন্তু এক দিন খারাপ গেলেই যেন পরের দিনটাও নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমার মনে হয়, ধারাবাহিকতা মানে প্রতিদিন নিজের সেরাটা দেওয়া নয়; বরং যেদিন নিজের সেরাটা দেওয়া সম্ভব হয় না, সেদিনও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।

প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতিটি সবচেয়ে বেশি কাজে দিয়েছে?

কোচিংয়ের পাশাপাশি নিজে পড়াশোনার পেছনে অনেক সময় দিয়েছি। আমার কাছে কোচিং ছিল দিকনির্দেশনা পাওয়ার একটা মাধ্যম, কিন্তু নিজের দুর্বলতা খুঁজে বের করে সেগুলো ঠিক করার দায়িত্বটা ছিল নিজের। আমার প্রস্তুতিতে সবচেয়ে বেশি কাজে দিয়েছে মডেল টেস্টের ভুলগুলো বিশ্লেষণ করা। প্রতিটি মডেল টেস্টের পর শুধু নম্বর দেখে থেমে থাকতাম না। কোন প্রশ্নে ভুল হয়েছে, কেন ভুল হয়েছে, বিষয়টা না জানার কারণে ভুল হয়েছে নাকি জানা সত্ত্বেও অসাবধানতার কারণে এসব বোঝার চেষ্টা করতাম।

একসময় বুঝতে পারি, সব ভুল একই ধরনের নয়। কিছু ভুল হয় কোনো বিষয় ভালোভাবে না জানার কারণে, কিছু হয় প্রশ্ন ঠিকমতো না পড়ার কারণে, আবার কিছু হয় উত্তর নিয়ে অযথা দ্বিধায় থাকার কারণে। ভুলের ধরন বুঝতে পারলে সেটার সমাধান করাও সহজ হয়।

আমি শিক্ষার্থীদের একটা বিষয় বিশেষভাবে বলতে চাই- মডেল টেস্ট দেওয়ার পর শুধু সঠিক উত্তরগুলো দেখে নিলে হবে না, নিজের ভুলের কারণ খুঁজে বের করতে হবে। ধরো, তুমি একটা পরীক্ষায় ১০টি প্রশ্ন ভুল করলে। পরের পরীক্ষায়ও যদি একই ধরনের ভুল করো, তাহলে শুধু পরীক্ষা দেওয়ার সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু প্রস্তুতির মান হয়তো বাড়ছে না। আমার কাছে মডেল টেস্টের আসল মূল্য ছিল এখানেই যে এটা আমাকে শুধু আমার অবস্থান জানায়নি, বরং কোথায় পরিবর্তন আনতে হবে, সেটাও বুঝতে সাহায্য করেছে।

ভর্তি পরীক্ষার কোন অংশে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন এবং কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?
আমার কাছে সাধারণ জ্ঞান বা জিকে অংশটা তুলনামূলক কঠিন মনে হয়েছিল। তাই এই অংশের জন্য কয়েকটি বই পড়েছি এবং যতটা সম্ভব মডেল টেস্ট ও প্রশ্ন সমাধান করার চেষ্টা করেছি। জিকে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছে, শুধু তথ্য পড়লেই হবে না। কতটুকু মনে রাখতে পারছি এবং পরীক্ষার সময় সেগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারছি কি না, সেটাও যাচাই করা প্রয়োজন। এ জন্য বারবার পরীক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এতে কোন অংশগুলো ভালোভাবে মনে আছে, কোনগুলো বারবার ভুলে যাচ্ছি, আর কোন বিষয়গুলোতে আরও পড়তে হবে সেগুলো বুঝতে পেরেছি।

আমার মতে, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর নিজের প্রস্তুতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। শুধু অন্যরা কোন বই পড়ছে, কতগুলো বই শেষ করেছে, কত নম্বর পাচ্ছে এসব দেখে নিজের প্রস্তুতি নির্ধারণ করা উচিত নয়। একজন শিক্ষার্থীর জন্য পাঁচটি বই শেষ করার চেয়ে দুটি বই ভালোভাবে পড়ে সেগুলোর বিষয়বস্তু মনে রাখতে পারা বেশি কার্যকর হতে পারে। মূল বিষয় হলো, নিজের প্রস্তুতির ঘাটতি কোথায়, সেটা বুঝে সেই অনুযায়ী কাজ করা।

পরীক্ষার হলে সময় ব্যবস্থাপনা ও প্রশ্ন বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আপনার কৌশল কী ছিল?
পরীক্ষার হলে আমি একটা বিষয় মাথায় রাখতাম সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে নিজের নিশ্চিত প্রশ্নগুলো ঠিকভাবে উত্তর করা জরুরি। প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পর যেগুলোর উত্তর ভালোভাবে জানতাম, সেগুলো দিয়ে শুরু করি। যেগুলো কঠিন মনে হয়েছিল, যেগুলোর উত্তর নিয়ে দ্বিধা ছিল কিংবা যেগুলো নিয়ে বেশি ভাবতে হতো, সেগুলো প্রথমবারে বাদ দিয়ে সামনে এগিয়ে যাই।

প্রথমেই পুরো প্রশ্নপত্রের সহজ ও পরিচিত প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার পর আবার ফিরে আসি। এতে সময় দিয়েছিলাম ২৫ মিনিট। তখন দ্বিধায় থাকা প্রশ্নগুলো নিয়ে চিন্তা করি ২০ মিনিট। কিছু প্রশ্ন, যেগুলো প্রথমবার কঠিন মনে হয়েছিল, পরে ঠান্ডা মাথায় ভেবে সেগুলোর উত্তর দিতে পেরেছিলাম। 

প্রায় ৮৫ শতাংশ প্রশ্নের উত্তর করার পরও আমার হাতে ১৫ মিনিট সময় ছিল। তখন পুরো প্রশ্নপত্র আরেকবার পড়ে দেখি। যখন বুঝতে পারি আমার চান্স নিশ্চিত তখন আর রিস্ক না নিয়ে উত্তরপত্র জমা দিয়ে দিই। যদি মনে হতো চান্স হবেনা তাহলে ৫০ শতাংশ যেসব প্রশ্ন সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো সেগুলো উত্তর করতাম।

এই অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয়েছে, পরীক্ষার হলে প্রশ্নের উত্তর জানার পাশাপাশি নিজের সময় ও মনোযোগ কোথায় ব্যয় করতে হবে, সেটাও জানতে হয়।

একটা প্রশ্নের পেছনে পাঁচ মিনিট ব্যয় করে যদি আরও কয়েকটা প্রশ্নের জন্য সময় হারিয়ে ফেলি, তাহলে সেটা সব সময় ভালো সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের বলব, মডেল টেস্ট দেওয়ার সময় থেকেই প্রশ্ন বাছাইয়ের অভ্যাস তৈরি করতে হবে। কোন প্রশ্ন আগে উত্তর করবেন, কোনটা পরে করবেন, আর কোনটা ছেড়ে আসা ভালো এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুশীলন পরীক্ষার হলের আগেই করে রাখা উচিত।

পরীক্ষার হলে মাথা ঠান্ডা রেখে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য কী কৌশল অবলম্বন করেছিলেন?
আমার মনে হয়, পরীক্ষার হলে মাথা ঠান্ডা রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দুশ্চিন্তা অনেক সময় আমাদের জানা বিষয়ও ভুলিয়ে দিতে পারে। আমি চেষ্টা করতাম প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পর কোনো কঠিন প্রশ্ন দেখে যেন ঘাবড়ে না যাই। একটা প্রশ্ন কঠিন হওয়া মানে এই নয় যে বাকি প্রশ্নগুলোর উত্তরও কঠিন হবে। তাই একটি প্রশ্নে আটকে না থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতাম।

আরেকটি বিষয় হলো, পরীক্ষার হলে অন্যদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করা উচিত নয়। পাশের শিক্ষার্থী কত দ্রুত উত্তর দিচ্ছে, সে কতগুলো প্রশ্ন শেষ করেছে এসব ভাবতে গেলে নিজের মনোযোগ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পরীক্ষার সময় নিজের পানির বোতল রাখাও ভালো বলে মনে করি। এতে প্রয়োজনমতো পানি পান করা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরীক্ষার হলে প্রবেশ করার পর নিজের প্রস্তুতির ওপর আস্থা রাখা এবং প্রশ্নপত্র অনুযায়ী পরিকল্পনা করে এগিয়ে যাওয়া।

প্রস্তুতির সময় কখনো হতাশা বা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল? হলে কীভাবে নিজেকে সামলে নিয়েছেন?
অবশ্যই হয়েছিল। বিশেষ করে প্রস্তুতির শুরুর দিকে কোচিংয়ের মডেল টেস্টে নম্বর কম পেলে খুব হতাশ হয়ে যেতাম। অনেক পড়াশোনা করার পরও যখন প্রত্যাশা অনুযায়ী নম্বর আসত না, তখন মনে হতো, এত কিছু পড়েও যদি ভালো করতে না পারি, তাহলে ভর্তি পরীক্ষায় কীভাবে ভালো করব? একটা সময় নিজের ওপর বিশ্বাসও অনেকটা হারিয়ে ফেলেছিলাম। কয়েকদিন পড়াশোনার প্রতিও আগ্রহ হারিয়ে যায়।

পরে একটা বিষয় উপলব্ধি করি আমি তখন মডেল টেস্টের নম্বরকে নিজের যোগ্যতার চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে ধরে নিচ্ছিলাম। অথচ মডেল টেস্টের উদ্দেশ্যই হলো, আসল পরীক্ষার আগে নিজের ভুলগুলো খুঁজে বের করার সুযোগ পাওয়া।

তখন নিজেকে বলি, চেষ্টা না করেই যদি হাল ছেড়ে দিই, তাহলে অন্তত নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার সুযোগটুকুও থাকবে না। চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেও অন্তত জানতে পারব, আমি কতটা করতে পেরেছি এবং কোথায় আরও ভালো করার সুযোগ ছিল। এই ভাবনাটাই আমাকে আবার পড়াশোনায় ফিরিয়ে আনে। আমি এখন মনে করি, প্রস্তুতির সময় খারাপ নম্বর পাওয়াটা যতটা না সমস্যা, তার চেয়ে বড় সমস্যা হলো সেই নম্বর দেখে নিজের সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা।

একটা মডেল টেস্টে কম নম্বর পাওয়া মানে তুমি খারাপ শিক্ষার্থী, এমন নয়। এর অর্থ হতে পারে, তোমার প্রস্তুতির কিছু জায়গায় আরও কাজ করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের বলব, নিজের খারাপ ফলাফলকে নিজের পরিচয় বানিয়ে ফেলো না। সেটাকে তথ্য হিসেবে নাও, ভুলগুলো খুঁজে বের করো, তারপর আবার চেষ্টা করো।

আপনার সাফল্যের পেছনে পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুদের ভূমিকা কতটা ছিল?
আমার সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার মায়ের। প্রস্তুতির সময় যখনই হতাশ হয়েছি, মা আমাকে সাহস দিয়েছেন। যখন নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারিনি, তখন তাঁর অনুপ্রেরণা আমাকে আবার চেষ্টা করার শক্তি দিয়েছে। আমার কাছে পরিবারের সমর্থন মানে শুধু ভালো ফলাফল করার পর আনন্দ ভাগ করে নেওয়া নয়; বরং যখন ফলাফল ভালো হয় না, তখনও কেউ পাশে আছে এই বিশ্বাসটা পাওয়া।

আমার কিছু বন্ধু ছিল, যারা আমাকে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে অনুপ্রাণিত করেছে। শিক্ষকেরাও আমাদের ভালো ফলাফলের জন্য নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। আমি বিশ্বাস করি, একজন শিক্ষার্থীর সাফল্যের পেছনে তার নিজের পরিশ্রমের পাশাপাশি এমন মানুষদের অবদান থাকে, যারা কঠিন সময়েও তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সি ইউনিটে প্রথম, ডি ইউনিটে ১৪১তম, বি ইউনিটে ৬১৭তম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বি ইউনিটে ৬৭৪তম স্থান অর্জন করতে পেরেছি। এই ফলাফল নিয়ে আমি আনন্দিত, কিন্তু এর পেছনে যারা আমাকে সহযোগিতা করেছেন, তাদের অবদানও আমার কাছে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও আইন বিভাগকে বেছে নেওয়ার বিশেষ কারণ কী?
আইন নিয়ে পড়ার ইচ্ছা আমার আগে থেকেই ছিল। আইন এমন একটা বিষয়, যার সঙ্গে মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক রয়েছে। এসব বিষয়ে জানার আগ্রহ থেকেই আইন বিভাগে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বর্তমানে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যয়ন করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২,৩০০ একরের বিশাল ক্যাম্পাস এবং এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও আমাকে মুগ্ধ করেছে।

আমার কাছে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের সময় নয়; বরং নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার, চিন্তাভাবনাকে বিস্তৃত করার এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার সুযোগ। আমি চাই, আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে শুধু একাডেমিক জ্ঞান অর্জন করব না, বরং একজন দায়িত্বশীল ও সচেতন মানুষ হিসেবেও নিজেকে গড়ে তুলব।

 আগামী বছরের ভর্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কী?
 আমি তাদের প্রথমেই বলব, ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিকে শুধু পড়াশোনার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখো না। এটাকে নিজের উন্নতির একটা প্রক্রিয়া হিসেবে দেখো। অন্য কেউ কত ঘণ্টা পড়ছে, কত নম্বর পাচ্ছে, কতগুলো বই শেষ করেছে এসব দেখে নিজের প্রস্তুতি বিচার করতে গেলে অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হতে পারে। বরং প্রতিদিন নিজের কাছে জানতে চাও, আজ আমি কী শিখলাম? গতকালের যে ভুলটা ছিল, সেটা কি আজ ঠিক করতে পেরেছি?

দ্বিতীয়ত, হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়ো না। প্রস্তুতির সময় এমন দিন আসতেই পারে, যখন নিজের পরিশ্রমের ফল দেখতে পাবে না। কিন্তু সেই মুহূর্তের ফলাফল দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে ফেলো না। তৃতীয়ত, শুধু বেশি পড়ার দিকে নয়, কীভাবে পড়ছ, সেদিকেও নজর দাও। পড়া শেষ করার পর নিজেকে যাচাই করো, মডেল টেস্ট দাও, ভুলগুলো বিশ্লেষণ করো এবং যেসব জায়গায় সমস্যা আছে, সেগুলো নিয়ে কাজ করো।

আর একটা কথা বলতে চাই যে নিজের জন্য এমন একটা পদ্ধতি তৈরি করো, যেটা তোমার দুর্বলতা অনুযায়ী তোমাকে উন্নতি করতে সাহায্য করবে। সবার প্রস্তুতির ধরন এক হবে না। কারও জন্য যে পদ্ধতি কার্যকর, তোমার জন্যও সেটি একই রকম কার্যকর হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে অন্যের অগ্রগতি তোমাকে অনুপ্রাণিত করতে পারে, কিন্তু তোমার পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা উচিত নিজের দুর্বলতা ও উন্নতির জায়গাগুলো দেখে।

একজন ভর্তি পরীক্ষার্থীকে যদি মাত্র তিনটি বিষয় মেনে চলার পরামর্শ দিতে হয়, তাহলে সেগুলো কী হবে?

প্রথমত, ধারাবাহিকতা। প্রতিদিন অনেক পড়তে হবে, এমন নয়; কিন্তু নিয়মিত পড়াশোনার অভ্যাস ধরে রাখতে হবে। যেদিন মন খারাপ থাকবে বা পড়তে ইচ্ছা করবে না, সেদিনও যতটুকু সম্ভব, নিজের প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট রুটিন।  নিজের সময় ও সক্ষমতা অনুযায়ী বাস্তবসম্মত রুটিন তৈরি করতে হবে। রুটিনের কাজ শুধু দিনের সময় ভাগ করে দেওয়া নয়, বরং কী পড়তে হবে, কোন বিষয়ে বেশি সময় দিতে হবে এবং কতটুকু কাজ শেষ হয়েছে, তা বুঝতে সাহায্য করা।

তৃতীয়ত, ভুল থেকে শেখা। আমার কাছে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভুল না করার চেষ্টা করার পাশাপাশি ভুল হলে কেন হলো, সেটা বোঝার মানসিকতাও থাকতে হবে। একই ভুল বারবার না করে প্রতিবার কিছু না কিছু শিখতে পারলে প্রস্তুতির মান উন্নত হবে।

তবে এই তিনটি বিষয় অনুসরণ করলেই যে সাফল্য নিশ্চিত, তা বলব না। ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। কিন্তু এই অভ্যাসগুলো একজন শিক্ষার্থীকে আরও গোছানো, সচেতন ও কার্যকরভাবে প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

সবশেষে আমি একটা কথাই বলব যে নিজের সঙ্গে নিজের প্রতিযোগিতা করো। অন্য কেউ তোমার চেয়ে এগিয়ে থাকলে হতাশ না হয়ে দেখো, নিজের কোথায় উন্নতি করার সুযোগ রয়েছে। আজকের তুমি যেন গতকালের তোমার চেয়ে একটু ভালো হতে পারো, সেই চেষ্টা করো। কারণ, আমার কাছে সাফল্য শুধু মেধাতালিকায় একটি অবস্থান নয়। সাফল্য হলো, কঠিন সময়েও নিজের লক্ষ্য থেকে পুরোপুরি সরে না যাওয়া, ভুল থেকে শেখা এবং নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। 

লম্বা সময়ের জন্য ছিটকে যাচ্ছেন সাদমান
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
একই যোগ্যতা, ভিন্ন সুযোগ: পদোন্নতিতে বৈষম্যের শিকার গ্রন্থা…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
আজ রাত ৮টায় শেষ হচ্ছে এইচএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
সিঙ্গেলদের বিনামূল্যে ভ্রমণের সুযোগ দিচ্ছে ফিনল্যান্ড, আবেদ…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
চট্টগ্রামের সেই অনুষ্ঠান থেকে আউট পরীমনি
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
‘প্রতিমন্ত্রী কোনো চা বাগান ভিজিটে যাননি, আর আমিও উনাকে কোন…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950