‘ইন্টারমিডিয়েটের প্রথম বর্ষ থেকেই মেডিকেলকে লক্ষ্য রাখতে হবে’

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৭ PM , আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৮ PM
সুরাইয়া ফেরদৌস ঋতু

সুরাইয়া ফেরদৌস ঋতু © টিডিসি সম্পাদিত

প্রতিবছরই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী। তবে এই ভর্তি পরীক্ষায় আসনসংখ্যার তুলনায় প্রতিযোগিতা বেশি হওয়ায় এখানে ভালো করতে শুরু থেকেই সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়মিত পড়াশোনা গুরুত্বপূর্ণ। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও কৌশলের কথা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানিয়েছেন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সুরাইয়া ফেরদৌস ঋতু।

মেডিকেলে পড়াশোনার অনুপ্রেরণা কীভাবে এলো? কখন থেকে এই স্বপ্ন দেখেছেন?
ডাক্তার হওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছিলাম প্রাইমারিতে পড়ার সময়। আসলে এই স্বপ্নটা প্রথম দেখেছিলেন আমার আব্বু। ছোটবেলায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে তিন-চারবার ডাক্তার দেখানোর পরও আমার ঠান্ডা কিছুতেই সারছিল না। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কম বয়সী নারী চিকিৎসকের প্রেসক্রাইব করা ওষুধ খেয়ে আমার ঠান্ডা সেরে যায়। তখন আব্বু আমাকে বলেছিলেন, ‘তোকে এরকম একজন ডাক্তার হতে হবে।’ সেই ঘটনা থেকেই আমার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নের শুরু।

আপনার সফলতার গল্প জানতে চাই।
এইচএসসিতে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস থাকলেও আমি জীববিজ্ঞানের পুরো বই পড়েছিলাম। কোচিং শুরু করার প্রায় দেড় থেকে দুই মাস আগে থেকেই ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞান পড়া শুরু করি। কোচিং শুরু হওয়ার পর কোচিংয়ের পড়াশোনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়মিত রিভিশন চালিয়ে যাই। কোচিংয়ের কোনো পরীক্ষাই আমি মিস করিনি। প্রস্তুতির সময় ঘুমও কমিয়ে দিয়েছিলাম। প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা ঘুমাতাম। প্রায় সময়ই চোখ লাল থাকত। কোচিংয়ের ভাইয়ারা মজা করে বলতেন, ‘তুমি কি রাতে ঘুমাও না?’ ডেইলি পরীক্ষাগুলোতে সাধারণত ৩৫ থেকে ৪৫ নম্বর পেতাম। সাপ্তাহিক পরীক্ষায় পেতাম ৭০ থেকে ৮৪। মাত্র দুবার ৯০ নম্বর পেয়েছিলাম। তবে এসব নিয়ে কখনো হতাশ হইনি। হতাশা শুরু হয় পেপার ফাইনাল ও সাবজেক্ট ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর। তখন নম্বর ৭০-এর নিচে নেমে যায়।

পরীক্ষা দিয়ে এসে অনেক মন খারাপ হতো। কখনো কখনো টানা দুই দিন ঘুমাতাম, পড়াশোনা করতাম না। পড়তে ইচ্ছা করত না। মনে হতো, ‘এত পড়েও পারছি না। আমার দ্বারা তো এর চেয়ে বেশি পড়া সম্ভব না। ধুর, পড়বই না।’ এভাবে দুই দিন যাওয়ার পর আবার নিজেকে সামলে পড়তে বসতাম। আবার কোনো সময় পড়াশোনা ছেড়ে দিতাম, পরে সাহস নিয়ে আবার শুরু করতাম।

আরও পড়ুন: নানার ‘ডাক্তার’ ডাক থেকেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন, মেডিকেলে ভর্তির পেছনের গল্প বললেন রুকাইয়া

এই সময়ে আমার প্রধান মেন্টর ভাইয়া আমাকে অনেক সাহস দিতেন। তিনি বলতেন, ‘তোদের মার্কস ভালো, কনসিসটেন্সি আছে। টেনশন নিস না, পড়।’ তার বোনের সঙ্গে আমি খুব ভালো বন্ধু। ভাইয়া আমাদের দুজনকেই সমানভাবে গাইড করেছেন। শেষ পর্যন্ত আমরা দুজনই মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার মতো ভাষা আমার জানা নেই। আমার পরিবারও সবসময় আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছে। পরিবারের সবাই বলেছে, ‘চালিয়ে যাও, আল্লাহ ভরসা।’

আমি চারজন সিনিয়রের গাইডেন্সে ছিলাম। এর মধ্যে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের একজন ভাইয়া ছিলেন আমার প্রধান মেন্টর। এ ছাড়া রেটিনা ফরিদপুর শাখার পরিচালক ভাইয়া, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের একজন সিনিয়র, যিনি আমার গ্রামের কাকু হন, এবং স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের একজন ভাইয়াও আমাকে গাইড করেছেন। আমি কোনো বিষয়ে দ্বিধায় পড়লে একই প্রশ্ন চারজনের কাছেই করতাম। তাদের পরামর্শ থেকে যেটা আমার কাছে সবচেয়ে ভালো ও কার্যকর মনে হতো, সেটাই অনুসরণ করতাম। মডেল টেস্টগুলোতেও ভালো নম্বর পেতাম, সাধারণত ৭৫ থেকে ৮৫-এর মধ্যে।

কোচিংয়ের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর যখন নিজের মতো করে রিভিশন শুরু করি, তখন আরেক ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হই। সব বই একবার রিভিশন দেওয়ার পর দ্বিতীয়বার পড়তে আর মন চাইত না। মনে হতো, ‘এগুলো তো দুই দিন আগেই পড়লাম, আবার কী পড়ব?’ বারবার একই জিনিস পড়তে ভালো লাগত না। তখন অনুশীলনী পড়তাম এবং বিভিন্ন প্রশ্ন সমাধান করতাম।

ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞানের প্রস্তুতির জন্য ১০ম থেকে ৪৬তম বিসিএস পর্যন্ত গত ৩৬ বছরের প্রশ্ন সমাধান করেছি। বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক দুই ধরনের সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্নই করেছি। আন্তর্জাতিক বিষয়গুলো পরে প্রস্তুতিতে যুক্ত করলেও সেগুলোও অনেক পড়েছি। আমার কোনো ব্যাকআপ ছিল না, প্ল্যান বি-ও ছিল না। মেডিকেল ছাড়া অন্য কোথাও ভর্তির ফরমও তুলিনি। আল্লাহর কাছে চেয়েছি, পাশাপাশি নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা ও পরিশ্রম করেছি। আল্লাহ তার ফল দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ।

মেডিকেলে পড়তে চাইলে প্রস্তুতি ঠিক কখন ও কীভাবে শুরু করা উচিত?
আমার মনে হয়, মাত্র তিন-চার মাসের প্রস্তুতি নিয়ে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করা সম্ভব নয়। ব্যতিক্রমী কেউ পারলে সেটা অবশ্যই প্রশংসনীয়, কিন্তু ‘এক্সেপশন ইজ নট অ্যান এক্সাম্পল’। যারা পারে, তাদের স্যালুট। তবে সাধারণভাবে ইন্টারমিডিয়েটের প্রথম বর্ষ থেকেই মেডিকেলকে লক্ষ্য রেখে এগিয়ে যাওয়া উচিত। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি তখন থেকেই ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিও শুরু করা দরকার।

এই সময়ে এসে মেডিকেল ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের কোন বিষয়গুলোতে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে?
মূল বই পড়ার পাশাপাশি বিগত বছরগুলোতে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলো সমাধান করতে হবে। নিয়মিত পরীক্ষা দিয়ে নিজের অবস্থান যাচাই করা জরুরি। পরীক্ষায় যেসব প্রশ্নে ভুল হবে, সেগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পড়তে হবে, যাতে একই ভুল আবার না হয়।

আরও পড়ুন: শেষ সময়ে কাজ দুটি—এক. বারবার রিভিশন, দুই. প্রশ্ন সমাধান

যাদের প্রস্তুতি কম, তাদের জন্য এই সময়ে করণীয় কী?
যাদের প্রস্তুতি তুলনামূলক কম, তাদের এখন আগের বছরগুলোর ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন বেশি করে সমাধান করা উচিত। পাশাপাশি অনুশীলনীর প্রশ্ন প্র্যাকটিস করতে হবে। ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞানের প্রস্তুতির জন্য বিসিএসের প্রশ্ন সমাধান করা যেতে পারে। একই সঙ্গে মূল বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ লাইনগুলোতে বেশি ফোকাস করতে হবে।

আপনার পড়ার রুটিন কেমন ছিল? দিনে কতক্ষণ পড়তেন?
সকাল ৮টায় আমার কোচিং থাকত। কোচিংয়ে যাওয়ার আগে প্রায় ৩০ মিনিট পড়তাম। কোচিং শেষ হতো সকাল সাড়ে ১০টায়। এরপর সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বিশ্রাম, খাওয়া, গোসল, নামাজ ও ঘুমের জন্য সময় রাখতাম।

বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পড়তাম। এরপর রাত ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা ঘুমাতাম। রাত ১০টা থেকে ২টা বা ৩টা পর্যন্ত আবার পড়তাম। ফজরের পরও ঘুমাতাম। যদিও সবাই বলত, ভোরের পড়া বেশি কার্যকর, কিন্তু আমার পড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘুম আসত না। তবে কখনো ঘণ্টা ধরে পড়াশোনা মাপিনি। একসময় হঠাৎ মনে হলো, আসলে আমি দিনে কত ঘণ্টা পড়ি? তখন একদিন হিসাব করে দেখেছিলাম, দিন-রাত মিলিয়ে প্রায় ১২ ঘণ্টা পড়া হতো।

প্রস্তুতির জন্য নিজের দুর্বলতা কীভাবে চিহ্নিত করেছেন?
কোচিংয়ের পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করেছি। পরীক্ষায় কোন জায়গায় ভুল হচ্ছে বা কোন বিষয়ে তুলনামূলক কম নম্বর পাচ্ছি, সেগুলো দেখে দুর্বল জায়গাগুলো বুঝতে পেরেছি।

Faridpur Medical College... - Faridpur Medical College

যারা টপ করতে চায়, তাদের জন্য বিশেষ করণীয় কী?
আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। ভর্তি পরীক্ষার সময় যখন কোচিংয়ে সবাই নতুন করে পড়বে, তখন যারা আগে থেকে প্রস্তুতি নেবে তারা কোচিংয়ের পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রিভিশন দিতে পারবে। অর্থাৎ অন্যরা যখন প্রথমবার পড়বে, তখন টপ করতে চাওয়া শিক্ষার্থীদের একই বিষয় রিভিশন দেওয়া চলবে।

এই সময়টায় কোচিংয়ের সঙ্গে নিজের পড়া কীভাবে সমন্বয় করা উচিত?
আমার মনে হয়, কোচিংয়ের পড়াটাকেই মূল পড়া হিসেবে নিতে হবে। আলাদা করে অতিরিক্ত পড়ার প্রয়োজন হয় না। আগে থেকেই পড়া হয়ে থাকলে কোচিংয়ের পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রিভিশনও হয়ে যাবে। তাই কোচিংয়ের ফ্লোতে থাকলেই চলে। আমার অভিজ্ঞতায় বাড়তি পড়ার প্রয়োজন হয় না।

প্রশ্নব্যাংক কীভাবে সমাধান করতে হয়?
প্রশ্ন সমাধানের পাশাপাশি প্রশ্নের ব্যাখ্যাও পড়তে হবে। শুধু সঠিক উত্তর জানলেই হবে না। অন্য অপশনগুলো কেন সঠিক নয়, কোন পরিস্থিতিতে সেগুলো সঠিক হতে পারত এসবও বিস্তারিত জানতে হবে। এতে একটি প্রশ্ন থেকেই অনেক কিছু শেখা যায় এবং একই ধরনের প্রশ্নে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও কমে।

পরীক্ষার আগে মডেল টেস্ট দেওয়ার উপকারিতা কেমন?
মডেল টেস্টের মাধ্যমে নিজের প্রস্তুতি ও অবস্থান যাচাই করা যায়। বেশি বেশি পরীক্ষা দেওয়ার অভ্যাস পরীক্ষাভীতি দূর করতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে প্রস্তুতিকে আরও শানিত করে এবং পরীক্ষার্থীর মধ্যে দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করে।

কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ…
  • ২০ অক্টোবর ২০২৬
ইন্টার্নশিপ করুন জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ে, আবেদন ১ নভেম্বর পর…
  • ২০ অক্টোবর ২০২৬
পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, দুই পক্ষ এক হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
  • ২০ অক্টোবর ২০২৬
২২ বলের ফিফটিতে ভাঙলেন ১১ বছরের রেকর্ড
  • ২০ অক্টোবর ২০২৬
এইচএসসি পরীক্ষার ফল দেখবেন যে ৩ উপায়ে
  • ২০ অক্টোবর ২০২৬
যে ভুলে বাতিল হবে এনআইডির আবেদন
  • ২০ অক্টোবর ২০২৬