নানার ‘ডাক্তার’ ডাক থেকেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন, মেডিকেলে ভর্তির পেছনের গল্প বললেন রুকাইয়া

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৫ AM , আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৫ AM
রুকাইয়া জাহান

রুকাইয়া জাহান © টিডিসি সম্পাদিত

২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ঘিরে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা। হাতে রয়েছে আর মাত্র দু-তিন মাস। এই সময়টুকু কাজে লাগাতে শুধু দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করাই যথেষ্ট নয়, দরকার পরিকল্পিত প্রস্তুতি ও নিয়মিত অনুশীলন। কোন বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত, কীভাবে পড়ার সময় ভাগ করে নিতে হবে এবং প্রস্তুতির দুর্বলতাগুলো কীভাবে কাটিয়ে উঠতে হবে—এসব কৌশলই শেষ মুহূর্তে ভালো প্রস্তুতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় সফল হয়ে বর্তমানে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন রুকাইয়া জাহান। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি, সাফল্যের কৌশল এবং নিজের অভিজ্ঞতার নানা দিক নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

মেডিকেলে পড়াশোনার অনুপ্রেরণা কীভাবে এলো? কখন থেকে এই স্বপ্ন দেখেছেন?
মনের মধ্যে মেডিকেলে পড়ার একটি সুপ্ত ইচ্ছা অনেক আগে থেকেই ছিল। ছোটবেলা থেকেই নানাভাই আমাকে ‘ডাক্তার ডাক্তার’ বলে ডাকতেন। হয়তো খেলাচ্ছলেই সেই ইচ্ছার শুরু। এ ছাড়া বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনের প্রত্যাশাও এমনই ছিল। এইচএসসির সময়ে ছুটিতে বাড়িতে গেলে আম্মু মাঝেমধ্যে অনেক অসুস্থ হয়ে পড়তেন। তখন আমরা অনেকটা নিরুপায় হয়ে যেতাম। কী করতে হবে, কোথায় সমস্যা হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারতাম না।

তখন মনে হতো, অন্তত আম্মুর কোথায় সমস্যা হচ্ছে সেটা যেন বুঝতে পারি, এ বিষয়ে কিছুটা জ্ঞান অর্জন করতে পারি এবং তার কষ্টটা দূর করতে পারি। সেখান থেকেই মনে হয়েছে, তার জন্য মেডিকেলে পড়াই সবচেয়ে ভালো পছন্দ। এ ছাড়া ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় মেডিকেলের প্রস্তুতিটা অন্যগুলোর তুলনায় আমার কাছে কিছুটা সহজ মনে হয়েছিল। এটাও মেডিকেল বেছে নেওয়ার অন্যতম বড় কারণ।

আপনার সফলতার গল্প জানতে চাই।
আমার মনে হয়, আল্লাহ আমাকে সফল হওয়ার একটি সুযোগ দিয়েছেন। আমি যতটা পরিশ্রম করেছি, তিনি তার চেয়েও অনেক বেশি দিয়েছেন। আমি খুবই মধ্যম মানের একজন শিক্ষার্থী। সপ্তাহে পাঁচ দিন পড়াশোনা করলে দুদিনই কোনো না কোনোভাবে নষ্ট হয়ে যেত। অপ্রয়োজনীয় রিলস দেখা, ডুমস্ক্রলিং এসবেও আমার অনেক সময় চলে গেছে।

এ ছাড়া আমরা ছিলাম এইচএসসি ২০২৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী। বোর্ড পরীক্ষার সময়ই জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ফলে আমার প্রস্তুতি মোটেও ভালো ছিল না। এইচএসসি পরীক্ষার আগে শুধু সংক্ষিপ্ত সিলেবাস পড়েছিলাম, কিন্তু মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ছিল পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস। বিষয়টি আমার জন্য যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং ছিল।

ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় আমি কোচিংয়ে যুক্ত ছিলাম। কোচিংয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পড়াশোনা শেষ করার চেষ্টা করেছি। অনেকবার পরীক্ষায় কম নম্বর পেয়েছি, আবার পড়েছি। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছি এই সান্ত্বনা দিয়ে যে, ‘এই ৩-৪টা মাস কষ্ট করো। এরপর মুক্তি!’ তবে এখন মনে হচ্ছে, আসল লড়াইটা কেবল শুরু হয়েছে। তাই মেডিকেলে চান্স পাওয়াটাকে আমি সফলতা বলতে চাই না। বরং এটাকে আমার জন্য সফল হওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে দেখতে চাই।

পরীক্ষার পূর্বে মডেল টেস্ট দেওয়ার উপকারিতা কেমন?
অনেক বেশি। প্রথমত, মডেল টেস্ট পরীক্ষা ভীতি দূর করতে সাহায্য করে। দ্বিতীয়ত, একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় নিজের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে প্রস্তুতিতে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, সেটি চিহ্নিত করে সময় থাকতেই তা পূরণ করা সম্ভব।

আমার ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে একটি প্লাস পয়েন্ট ছিল আমি উন্মেষে যুক্ত ছিলাম। উন্মেষের প্রশ্নের ধরন, স্ট্যান্ডার্ড এমনকি প্রশ্নপত্রের আকার, রং ও উপস্থাপনাও মূল পরীক্ষার মতোই ছিল। ফলে মূল পরীক্ষার দিন আমার মনেই হয়নি যে আমি ভিন্ন কোনো প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিচ্ছি। বরং মনে হচ্ছিল, আমি উন্মেষেরই কোনো একটি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছি।

শেষ সময়ে মডেল টেস্ট, রিভিশন ও ঘুম-প্রস্তুতি কীভাবে সাজানো উচিত?
কিছুটা সময় ও অর্থের অপচয়ও হতে পারে। যাদের পড়াশোনা ও রিভিশন শেষ, তারা বিভিন্ন কোচিংয়ের মডেল টেস্ট দিতে পারে। তবে যাদের প্রস্তুতিতে এখনো ঘাটতি রয়েছে, তাদের আগে নিজের পড়াশোনা শেষ করার দিকে নজর দেওয়া উচিত। তা না হলে একের পর এক পরীক্ষায় খারাপ ফল আসতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার্থীকে হতাশ করে ফেলতে পারে।

আরও পড়ুন: ভর্তি পরীক্ষার জন্য আমি কোনো কোচিং সেন্টারে যাইনি

শেষ সময়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে রিভিশন, নিয়মিত পরীক্ষা দেওয়া এবং ভুলগুলো সংশোধনের ওপর। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুমও জরুরি। এই সময়ে প্রতিদিন অন্তত ছয় ঘণ্টা ঘুমানো উচিত।

পরীক্ষার আগে মানসিক চাপ কমাতে কী পরামর্শ দিবেন?
সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য চাইতে হবে। পাশাপাশি বাবা-মা ও পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে হবে, তাদের সঙ্গে গল্প করতে হবে এবং নিজের মানসিক অবস্থার কথা শেয়ার করতে হবে।

নিজের বন্ধু বা কোচিংয়ের অন্যদের ফলাফলের সঙ্গে নিজের ফলাফল তুলনা করা উচিত নয়। কোনো পরীক্ষায় নম্বর কম এলে কান্নাকাটি বা মন খারাপ না করে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, সেটি খুঁজে বের করে তা পূরণ করার চেষ্টা করতে হবে। আমি বলব, ‘Love yourself more every time you fall.’

ভালো প্রস্তুতি নিয়েও প্রত্যাশিত ফল না পেলে বা পরীক্ষার আগে কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে?
ভালো প্রস্তুতি নেওয়ার পরও পরীক্ষার হলে নার্ভাসনেস, মানসিক চাপ কিংবা ওএমআর ভুলভাবে পূরণ করার কারণে প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল নাও আসতে পারে। আবার কখনো হয়তো আপনার ভাগ্যে অন্য কিছু আরও ভালো লেখা আছে।

তাই পরীক্ষার আগের রাত ও কেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের নার্ভ ঠিক রাখা। এ সময়ে বই-খাতা নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করার প্রয়োজন নেই। আগে থেকেই একটি রিভিশন খাতা তৈরি করে রাখতে হবে। পরীক্ষার আগের রাত ও সকালে নতুন কিছু পড়ার পরিবর্তে ওই খাতায় চোখ বুলিয়ে নেওয়াই ভালো।

পরীক্ষার কেন্দ্রে টাইম ম্যানেজমেন্ট কেমন হওয়া জরুরি?
পরীক্ষার কেন্দ্রে অবশ্যই সঠিক সময়ে পৌঁছাতে হবে। এজন্য আগে থেকেই কেন্দ্রের লোকেশন দেখে নিতে হবে এবং সেখানে পৌঁছাতে কত সময় লাগতে পারে, রাস্তায় যানজটের সম্ভাবনা কেমন এসব বিষয় মাথায় রেখে সময় হাতে নিয়ে বের হতে হবে।

পরীক্ষার হলে ৬০ মিনিট নার্ভ কুল রেখে পরীক্ষা দিতে হবে। এ জন্য আগে থেকেই নিয়মিত প্র্যাকটিস পরীক্ষা দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে রাখতে হবে। এতে নির্ধারিত সময়ে পুরো পরীক্ষা শেষ করার পাশাপাশি পরীক্ষার হলে নার্ভাসনেসও নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে।

প্রস্তুতির বাইরে কোনো প্রশ্ন এলে কী করা উচিত?
প্রস্তুতির বাইরে থাকা প্রশ্নগুলো সবার শেষে দেখা উচিত। এ ক্ষেত্রে ‘এলিমিনেশন অ্যাপ্রোচ’ অনুসরণ করে উত্তর করা যেতে পারে। এলিমিনেশন অ্যাপ্রোচ হলো সম্ভাব্য ভুল উত্তরগুলো ধাপে ধাপে বাদ দিয়ে সঠিক উত্তর বেছে নেওয়ার পদ্ধতি।

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা এমসিকিউ পদ্ধতিতে হয়। চারটি অপশনের মধ্যে সঠিক উত্তরটি বেছে নিতে হয়। কোনো প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে প্রথমে কনসেপ্ট কাজে লাগিয়ে যেসব অপশন কোনোভাবেই সঠিক হতে পারে না, সেগুলো বাদ দিতে হবে। এরপর দুটি অপশনের মধ্যে ৫০-৫০ সম্ভাবনা থাকলে উত্তর করা যেতে পারে। তবে কোনো প্রশ্নের উত্তর একেবারেই জানা না থাকলে সেটি স্কিপ করাই ভালো। কারণ পরীক্ষায় নেগেটিভ মার্কিং রয়েছে।

প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়িয়ে পড়লে একজন শিক্ষার্থীর করণীয় কী?
সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রেখে নিজের প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে হবে। কোনো অবস্থাতেই নিজের নৈতিকতা বিসর্জন দেওয়া যাবে না। প্রশ্ন ফাঁসের গুজব বা এ ধরনের কথাবার্তায় কান দিলে শুধু সময়ই নষ্ট হবে, প্রস্তুতিরও ক্ষতি হবে। তাই এসব বিষয়ে মনোযোগ না দিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগী থাকাই উচিত।

আরও পড়ুন: মায়ের অসমাপ্ত স্বপ্ন, নীলার ছয় বছরের লড়াই আর একটি থিসিস ডিফেন্সের গল্প

প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন? এর সঙ্গে সম্পৃক্তদের শাস্তি সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
অবশ্যই বিষয়টি অত্যন্ত ক্ষতিকর। অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে অনৈতিকতা দেখা গেলেও মেডিকেলের মতো সংবেদনশীল একটি খাতে প্রশ্ন ফাঁসের মতো বিষয়গুলো শক্ত হাতে দমন করা উচিত। এর কারণে প্রথমত যোগ্য শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয়। পাশাপাশি অযোগ্য শিক্ষার্থীরাও চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়ার সুযোগ পেয়ে যেতে পারে।

আমার মনে হয়, অসততার মাধ্যমে কেউ কখনো ভালো চিকিৎসক হয়ে উঠতে পারবে না। দিনশেষে এটি দেশের মানুষের সঙ্গে এক ধরনের বেইমানি। কারণ এর ফলে তারা যোগ্য ও সৎ চিকিৎসক পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এতে ভবিষ্যতে অযোগ্য ব্যক্তিদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। পাশাপাশি সামাজিকভাবে তাদের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

ব্যাটে-বলে ব্যর্থ সাকিব, হারল দলও
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নির্যাতনের চিহ্ন, কোথাও পোড়ানো— ‘একই কায়দায়’ ফেলে রাখা ৯ না…
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এআইয়ের ভুলে চীনা যুদ্ধজাহাজে হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিল যুক্ত…
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কুয়েটের রোকেয়া হলে আবাসন সংকট চরমে, গণরুমে তৃতীয় বর্ষের শিক…
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এআই-অটোমেশনে বদলাচ্ছে বৈশ্বিক শ্রমবাজার, বাংলাদেশেও কর্মহীন…
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছুটি শেষে কর্মস্থলে যোগদান না করায় ইবি শিক্ষককে চাকরিচ্যুত 
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬