মায়ের অসমাপ্ত স্বপ্ন, নীলার ছয় বছরের লড়াই আর একটি থিসিস ডিফেন্সের গল্প

০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪৪ AM , আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:০০ AM
নীলা সরকার ঐশী

নীলা সরকার ঐশী © টিডিসি ফটো

একের পর এক ব্যক্তিগত শোক, আর্থিক সংকট আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও থেমে যাননি নীলা সরকার ঐশী। ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর ২০২০ সালে মায়ের আকস্মিক মৃত্যু, পরিবার ছেড়ে একা পথচলা, টিউশনির আয়ে পড়াশোনা চালানো, এমনকি অর্থাভাবে টানা দুই সেমিস্টার ড্রপ—সব বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট থিসিস ডিফেন্সে অর্জন করেন ‘এ’ প্লাস। দীর্ঘ সংগ্রামের পর এই অর্জন শুধু একটি একাডেমিক সাফল্য নয়, বরং আত্মনির্ভরশীল হওয়ার প্রতিশ্রুতি ধরে রেখে প্রতিকূলতাকে জয় করার এক অনন্য গল্প বলেছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে। 

শৈশবেই বাবাকে হারিয়েছিলেন ঐশী। এরপর মা-ই ছিলেন তার পুরো পৃথিবী। একমাত্র সন্তান হিসেবে বাবার অনুপস্থিতি কখনো অনুভব করতে দেননি মা। কিন্তু ২০২০ সালের ১২ এপ্রিল হঠাৎ করেই বদলে যায় সবকিছু। সেদিন ভোর সাড়ে ৫টায় ব্রেইন স্ট্রোকে করেন তার মা। মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে, বিকেল সাড়ে ৫টায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। একটি দিনের মধ্যেই ভেঙে পড়ে ঐশীর সাজানো জীবন।

মায়ের মৃত্যুর পর চারদিকে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। সামনে কী করবেন, কোথায় যাবেন কোনো উত্তরই যেন ছিল না। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়টি পার করতে গিয়ে বারবার মনে পড়ত মায়ের বলা কথাগুলো। জীবিত থাকতেই মা তাকে বলেছিলেন, ‘বাবু, ধরো আমার হুট করে কিছু হয়ে গেল, তখন কিন্তু তোমাকেই শক্ত থেকে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। তুমি কখনো পরিবারের সাহায্যের আশা করো না। নিজের জন্য নিজেই দাঁড়াবে। তোমার নিজের একটা পরিচয় থাকতে হবে।’

ঐশী বলেন, ‘মায়ের এই কথাগুলোই তখন আমার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল। আমি নিজেকে শুধু একটি কথাই বলতাম এখন ভালো থাকার চেয়ে যেকোনোভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখাটা বেশি জরুরি। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমি এগিয়ে গেছি।’

সংগ্রামের আরও গল্প পড়ুন: ক্লাস সিক্সে ফেল করে কান্না করা মেয়েটিই আজ গোল্ড মেডেলিস্ট

পরিবার ছেড়ে নিজের স্বপ্নের পথে
মায়ের মৃত্যুর পর আরেকটি কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হয়েছিল তাকে। নিজের স্বপ্ন ও ক্যারিয়ার গড়ার পথে মতপার্থক্যের কারণে পরিবার ছেড়ে একাই পথচলা শুরু করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘একজন মেয়ের মা নেই, বাবাও নেই ,এমন অবস্থায় কেউ সহজে পরিবার ছেড়ে চলে যেতে চায় না। কিন্তু ওই সময় আমার জীবনের জন্য এটাই ছিল সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত। আমি আমার ক্যারিয়ারটা নিজের মতো করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরিবার চেয়েছিল তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী আমার ভবিষ্যৎ ঠিক করতে। সেই মতের অমিল থেকেই একা পথ চলার সিদ্ধান্ত নিই। আজও সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই।’

No photo description available.

নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি মওকুফ (ওয়েভার), মায়ের সামান্য সঞ্চয় এবং নিজের টিউশনি থেকে পাওয়া আয়ে কোনোমতে শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ টিউশনিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নেমে আসে চরম আর্থিক সংকট। সেই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে টানা দুই সেমিস্টার ড্রপ দিতে হয় তাকে ।

তিনি বলেন, ‘দুই সেমিস্টার পর ড্রপ দিতে হয়েছিল মূলত ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইসিসের কারণে। আমার পরিবার থেকে কোনো ধরনের ফিন্যান্সিয়াল ব্যাকআপ ছিল না। পড়াশোনার খরচ আমাকে নিজেকেই চালাতে হতো। মায়ের কিছু সেভিংস ছিল, আমি টিউশন করাতাম এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওয়েভার পেতাম। সব মিলিয়ে মোটামুটি চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই আমার টিউশনিটা চলে যায়। তখন আর উপায় ছিল না। বাধ্য হয়েই পরের সেমিস্টারটা ড্রপ দিতে হয়েছিল।’

স্বপ্নের জন্য ত্যাগ, টিকে থাকার লড়াই
মায়ের মৃত্যুর পর শুধু মানসিক নয়, অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গেও প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়েছে নীলা সরকার ঐশীকে। পড়াশোনা চালিয়ে যেতে গিয়ে নিজের স্বাভাবিক ছাত্রজীবন, অবসর কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ সবকিছুর সঙ্গে আপস করতে হয়েছে তাকে।

ঐশী বলেন, ‘অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে গিয়ে সবচেয়ে বড় ত্যাগ ছিল আমার আগের সেই রঙিন জীবনটা। মা বেঁচে থাকতে যে জীবনটা ছিল, সেটা আর থাকেনি। ঢাকার মতো শহরে একজন মেয়ের পক্ষে একা থেকে নিজের খরচ চালিয়ে জীবনযাপন করা খুব কঠিন। একদিকে চাকরি করেছি, অন্যদিকে পড়াশোনা। বিশ্ববিদ্যালয় শেষে বন্ধুরা কোথাও ঘুরতে যেত, কিন্তু আমাকে অফিসে যেতে হতো। কারণ জানতাম, চাকরিটা চলে গেলে আমার সবকিছু থেমে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, “সারাদিন বিশ্ববিদ্যালয় ও অফিস শেষে বাসায় ফিরে নিজের রান্না করতাম, তারপর আবার পড়তে বসতাম। আমি আসলে জীবনে ‘আরাম’ বলে কোনো জিনিসই রাখিনি। মানুষ ভালো চাকরি পাওয়ার জন্য পড়াশোনা করে, আর আমি চাকরি করেছি পড়াশোনাটা চালিয়ে যাওয়ার জন্য। তখন আমার মাথায় একটাই কথা ছিল যেভাবেই হোক আমাকে টিকে থাকতে হবে। সৃষ্টিকর্তার ওপর আমার বিশ্বাস ছিল, একদিন নিশ্চয়ই ভালো সময় আসবে। এখন শুধু টিকে থাকাটাই জরুরি।”

No photo description available.

কঠিন সময়গুলোতে পরিবার নয়, বরং শিক্ষক ও বন্ধুদের কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি সাহস পেয়েছেন ঐশী। তিনি বলেন, ‘আমার শিক্ষাজীবনের সংকটকালে পরিবারের বাইরে অনেক মানুষ আমাকে সাহস জুগিয়েছেন। মোস্তাকিম স্যার, হাবিব স্যার, আবিদ স্যার, রুবা ম্যামসহ অনেক শিক্ষক আমার পাশে ছিলেন। আমার বন্ধু জুনায়ের, নাফিসা, রিয়া, নাদিয়াসহ সবাই আমাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছে। আসলে সবার নাম বলে শেষ করতে পারব না। আজ আমি নিজের একটা অবস্থান তৈরি করতে পেরেছি, আর আমার মনে হয়, আমার চেয়ে এই মানুষগুলোই বেশি খুশি।’

থিসিসে ‘এ’ প্লাসের আনন্দে প্রথম মনে পড়েছে মায়ের কথা
আন্ডারগ্র্যাজুয়েট থিসিস ডিফেন্সে এ প্লাস পাওয়ার পর আনন্দের মুহূর্তেও প্রথমে মনে পড়েছিল মায়ের কথা। ঐশী বলেন, ‘ফল জানার পর সবার আগে আমার মায়ের কথা মনে পড়েছে। এরপর মনে পড়েছে আমার শিক্ষক মোস্তাকিম স্যার, আবিদ স্যার, আশিক স্যার এবং আমার বন্ধু জুনায়েরের কথা।’

নিজের সাফল্যের পেছনে একজনের নয়, বরং অনেক মানুষের অবদানের কথা জানান ঐশী। তবে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানান তার আইইএলটিএস শিক্ষক ও বর্তমান কর্মস্থলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মোস্তাকিম স্যার এবং হাবিব ভাইয়ার প্রতি। 

তিনি বলেন, ‘আমার সাফল্যের পেছনে একজন মানুষের অবদানের কথা বলতে পারব না। কাছের প্রতিটি মানুষই আমার জন্য সর্বোচ্চটা দিয়েছে। তবে মোস্তাকিম স্যার আর হাবিব ভাইয়া আমার জীবনের গেম চেঞ্জার। মোস্তাকিম স্যার সবসময় বলতেন, নীলা, আপনি শুধু লেগে থাকুন। আমি বলছি, আপনি সফল হবেন। আর হাবিব ভাইয়া বলতেন, নীলা, কোনোভাবেই হাল ছাড়বেন না। আমাকে নিয়ে আমার চেয়েও বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন তারা।’

আরও পড়ুন: ১৪ বড় চাকরির পরীক্ষায় ফেলের পর হলেন ম্যাজিস্ট্রেট, জানুন আস্থার সাফল্যের ৪ টোটকা

নিজের মতো সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাওয়া তরুণ-তরুণীদের উদ্দেশ্যে ঐশী বলেন, ‘আমার মতো সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাওয়া সব তরুণ-তরুণীকে বলতে চাই কখনো হাল ছাড়বেন না। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন। শুধু এই বিশ্বাসটা রাখতে হবে যে, আমি পারব। নিজের স্বপ্ন আর ক্যারিয়ার নিয়ে কোনো আপস করা যাবে না। সাহস আর ধৈর্য দুটোই রাখতে হবে। সফল না হওয়া পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। অবশ্যই সৎ থাকতে হবে। আমি টানা ছয় বছর সংগ্রাম করে আজ এখানে এসেছি। এখন আমি একটি প্রতিষ্ঠানের সেন্ট্রাল ম্যানেজারের দায়িত্বে আছি। এখনও অনেক পথ বাকি। চেষ্টা করলে সবাই পারে। শুধু সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ঐশী জানান উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা ছিল। এখন সেটিতেই মনোযোগ দিচ্ছি। সুযোগ পেলে বিদেশে পড়াশোনা করব। পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে আসতে চাই। তখন সুযোগ হলে অবশ্যই দেশের জন্য কিছু করতে চাই।’

কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতিকে সরিয়ে এমপির স্ত্রীকে নিয়োগের আদে…
  • ০৪ আগস্ট ২০২৬
অফিসে ৮ ঘণ্টা বসে কাজ করলেই কি ভুঁড়ি বাড়ে, জানুন বিশেষজ্ঞদে…
  • ০৪ আগস্ট ২০২৬
অ্যাসোসিয়েট অফিসার নিয়োগ দেবে আড়ং, আবেদন ১৫ আগস্ট পর্যন্ত
  • ০৪ আগস্ট ২০২৬
২০২৫ সালের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় বৃ…
  • ০৪ আগস্ট ২০২৬
ভাত খেলেই কী ভুঁড়ি বাড়ে? যা জানালেন পুষ্টিবিদ
  • ০৪ আগস্ট ২০২৬
মায়ের অসমাপ্ত স্বপ্ন, নীলার ছয় বছরের লড়াই আর একটি থিসিস ডিফ…
  • ০৪ আগস্ট ২০২৬