দুই বছর বয়সে হাম রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর অচল হয়ে যায় দুই পা। সেই থেকে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে হাঁটা হয়নি মো. রুবেল মিয়ার। কখনো হামাগুড়ি দিয়ে, কখনো বাবার কাঁধে চড়ে চলতে হয়েছে জীবনের পথ। শারীরিক এই প্রতিবন্ধকতাই তার সামনে তৈরি করেছে একের পর এক বাধা। কিন্তু থামাতে পারেনি শিক্ষার প্রতি তার অদম্য আগ্রহ। প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তিনি। অবশেষে ২০২৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স সম্পন্ন করেছেন রুবেল।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার কলসপাড় ইউনিয়নের পূর্ব ঘুঘরাকান্দী গ্রামের বাসিন্দা রুবেল। তার বাবা ইব্রাহিম মিয়া ও মা প্রয়াত ময়না বেগম। নিজ বাড়ির পাশের ব্র্যাক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন তিনি। এরপর ২০১৮ সালে উত্তর নাকশী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০২০ সালে হাজী নূরুল হক নন্নী-পোড়াগাঁও মৈত্রী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। সর্বশেষ নালিতাবাড়ী সরকারি নাজমুল স্মৃতি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স সম্পন্ন করেন।
রুবেলের শিক্ষাজীবনের পথটি ছিল কষ্ট আর সংগ্রামে ভরা। এসএসসি পাসের আগেই হারান মাকে। মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হলেও বাবার সহযোগিতা ও নিজের দৃঢ় মনোবল তাকে এগিয়ে নেয়। শারীরিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি পড়াশোনার খরচ জোগাড় করাও ছিল তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নিজের খরচ চালাতে ছাত্রজীবনেই হাঁস-মুরগি পালন করেছেন। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা দিয়েও পড়াশোনার ব্যয় মেটানোর চেষ্টা করেছেন।
আরও পড়ুন: ‘ওভার নাম্বারিং-আন্ডার নাম্বারিং’ নিয়ে তদন্ত হবে, শিক্ষকদের শাস্তি হতে পারে ৫ বছরের জেল
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার কাছে কখনো স্বপ্নের শেষ হয়ে ওঠেনি। বরং শিক্ষাকেই জীবনের পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছেন রুবেল। দীর্ঘ সংগ্রামের পর অনার্স শেষ করে এখন তার সামনে নতুন স্বপ্ন নিজের পায়ে দাঁড়ানো, পরিবারের পাশে থাকা এবং সমাজের বোঝা না হয়ে একজন স্বাবলম্বী মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা।
কিন্তু শিক্ষাজীবনের এই সাফল্যের পরও অনিশ্চয়তা কাটেনি রুবেলের। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে চাকরি কিংবা উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়া তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাই নিজের যোগ্যতা ও সক্ষমতা অনুযায়ী একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
রুবেলের বিশ্বাস, তার যোগ্যতা ও সক্ষমতার মূল্যায়ন করে একটি সুযোগ দেওয়া হলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে নিজেকে স্বাবলম্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন তিনি।
কলসপাড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, ‘হার না মানা এক যুবক রুবেল। জন্মের পর থেকেই হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করে পড়াশোনা চালিয়ে অনার্স সম্পন্ন করেছেন। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যতটুকু সম্ভব তাকে সহযোগিতা করেছি। জেলা প্রশাসকের কাছে অনুরোধ করব, তার জন্য যেন একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়।’
এ বিষয়ে শেরপুর জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘প্রতিবন্ধী রুবেল সম্পর্কে আমি জেনেছি। তার কম্পিউটার জানা থাকলে তাকে একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা করব।’